নিউজটি শেয়ার করুন

১৪৪ ঘণ্টার দীর্ঘ রজনী

হাসান আকবর: আমার প্রায়শ একটি কথা মনে হয়। শুধু মনে হয় না, বিশ্বাসই করি যে, আমার জীবনটি পরিপূর্ণ। কোন অতৃপ্তি নেই এই এক জীবনে। প্রত্যাশা এবং প্রাপ্তির সুনিপুণ সমন্বয় আমাকে সবসময়ই আচ্ছাদিত করে রাখে। বিভিন্ন সময় প্রকাশ্যে বলতাম যে, আমার প্রতি পরম করুণাময়ের এত বেশি কৃপা এই এক জীবনে বর্ষিত হয়েছে যে আমি বাকি জীবন সেজদায় পড়ে থাকলেও তার শোকরানা শেষ হবে না।

কিন্তু একেবারে ভয়াল এক সময়ে হঠাৎই সামনে এসে দাঁড়ালো অচিন এক পৃথিবী। নিজের তিন অসহায় কন্যার সজল চোখের ছবি যখন চোখের সামনে ভেসে উঠলো, তখন হু হু করে উঠলো অন্তর। হে আমার রব, হে দয়াময়, দয়া করে আমাকে আর কিছুদিন অন্তত সময় দাও।

ব্যাপারটি একেবারে হঠাৎই ঘটে গেল। কোনো প্রস্তুতি নেয়ারই সুযোগ দিল না। হয়তো এভাবেই সব ঘটে। প্রস্তুতি নিয়ে আসলে কিছু হয়ওনা।

গত এক বছরেরও বেশি সময়ের ভয়াল করোনাকালে একদিনও ঘরবন্দি ছিলাম না। স্বাভাবিক সময়ে দিনে একবার অফিসে যেতাম, বের হতাম। কিন্তু করোনাকালে সকাল এবং রাতে দুইবেলাই অফিস করেছি। স্বাভাবিক দিনগুলোতে শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটি কাটাতাম, কিন্তু করোনাকালে তাও করিনি। হোম অফিস একদিনও করিনি। মাথার উপর শতবর্ষী মা থাকায় বুকে অন্যরকমের একটি সাহস পেতাম। তাছাড়া ব্যক্তিগত সুরক্ষা, নিয়মিত মাস্ক পরা এবং ভিড় এড়িয়ে চলার ব্যাপারে শতভাগ সচেষ্ট থাকতাম। গণপরিবহন ব্যবহার করতে হতো না বিধায় এবং বাসায় বাইরের লোকজনের আনাগোনা না থাকা, কলেজ শিক্ষক স্ত্রী এবং শিক্ষার্থী সন্তানদের বাইরে যেতে না হওয়ার পরিস্থিতি সাহসের পারদকে প্রতিদিনই কেবলই উপরে উঠাতো।

সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছাড়ার সময়

এরমধ্যে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ যখনএকটি টিকার জন্য হাহাকার করছিলেন তখন আমি অতি সহজে টিকাও পেয়ে গেলাম।

এর মাঝে গত ৬ মার্চ আমি হারিয়ে ফেললাম আমার শতবর্ষী মাকে। আর মাস ঘুরার আগেই ভয়াল করোনায় আক্রান্ত হয়ে গেলাম। সন্তানের মাথার উপর থেকে মায়ের ছায়া সরে যাওয়া প্রথম যেন টের পেতে শুরু করলাম।

ব্যাপারটি একদম সিরিয়াস ছিল না। হাল্কা জ্বর এবং হাল্কা কাশি ছিল শরীরে। করোনার অন্য উপসর্গ নেই। তাই পাত্তা দেয়ারও কিছু ছিল বলে মনে হয়নি। তীব্র গরমের জন্য এমনটি হচ্ছে বলে মনে হচ্ছিল। তবুও নিজেকে গুটিয়ে নিলাম। অফিসে স্বাভাবিকভাবে প্রতিদিনই মিটিং করতে হয় আমার প্রিয় এডিটর, ৮১ বছর বয়সী দৈনিক আজাদী সম্পাদক এম এ মালেক স্যারের সাথে। হাল্কাজ্বরসহ অফিসে গেলেও স্যারের রুমে ঢুকলাম না। বসলাম না মিটিং এ। সহযোগী সম্পাদক কবি রাশেদরউফ ভাই এবং শিফট ইনচার্জ দিবাকর দার সাথে দূর থেকে কথা বলেই অফিস থেকে বাসায় ফিরলাম। স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং পবিত্র শবে বরাতের ছুটি থাকায় অফিসে কাজের বাড়তি চাপ ছিল না। মোটামুটিসামলে নিচ্ছিলাম।

এরমধ্যে আমার জ্বর এবং কাশির খবর শুনে দৈনিক আজাদীর পরিচালনা সম্পাদক ওয়াহিদ মালেক ভাই এবং পারিহা ভাবী কোভিড টেস্ট করানোর জন্য চাপ দিতে লাগলেন। প্রতি ঘণ্টায় ফোন করছিলেন তারা। বাসায় নমুনা নিতে লোক পাঠাবেন কিনা তাও জানতে চাইলেন। আমি বরাবরই বলি, ‘দেখি।’ কারণ আমার বদ্ধমূল ধারণা ছিল করোনা হয়নি। হতে পারে না। এটা স্রেফ ঠাণ্ডা গরমের ঝামেলা।

আমার এডিটর স্যার বারে বারে ফোন করেছিলেন। কিন্তু প্রতিবারই কাশির ধমকগোপন করে গলা ভরা হাসি দিয়ে বলছিলাম, ‘স্যার, কিচ্ছু নয়, ফ্লু’। আমি আমার ভিতরে বিন্দুমাত্র ভয়ও টের পাচ্ছিলাম না। আবার বহুদিন ধরে বাবার মতো জানা আমার ৮১ বছরের অভিভাবককেও কোন ভয় দেখাতে চাচ্ছিলাম না। তবে নিজ বেডরুমে আইসোলেশন শুরু করি। শুধু জোর নয়, অনেকটা বকাঝকা করেই স্ত্রীকে রুম থেকে বের করে দিই। তার কথা, রুম থেকে বের হবো না। করোনা হলে একসাথে হবে। আটাশ বছর একসাথে পথ চলেছি, ছন্দপতন হলেও এক সাথে হোক।

আমি চিকিৎসা নিচ্ছিলাম ডাক্তার আহসান ফুয়াদ অয়নের। আমার বন্ধু, বড় ভাই ডাক্তার আমজাদ হোসেন এবং আমার স্ত্রীর সহকর্মী অধ্যাপিকা সেলিনা আমজাদের বড় পুত্র। তার বাবা ডাক্তার আমজাদ এবং আমার মাঝে সে কোনোদিন একপারসেন্টও পার্থক্য করেনি। আমার যে যেকোনো প্রয়োজনে অয়ন। নাপা নাকি অ্যান্টিবায়োটিক খাবো সেই সিদ্ধান্ত ডাক্তার অয়নের। ভীষণ ব্যস্ত ডাক্তার সে। তবুও আমার ফোন পেলে সে অস্থির হয়ে ওঠে। হাল্কা জ্বর শুরু হওয়ার পর অয়ন কোনো রিস্ক না নিয়ে অ্যান্টিবায়োটিক শুরু করে দিল, সাথে কাঁশির ট্যাবলেট ও সিরাপ। তবে আমার কথা বলার ধরণ এবং স্টাইলে অয়নও কিছুটা বিভ্রান্ত হচ্ছিল।

ফ্লু সন্দেহ নিয়েই অগ্রসর হচ্ছিলাম আমি। কিন্তু পারিহা ভাবী সকাল দুপুর সন্ধ্যায় কোভিড টেস্ট করানোর জন্য চাপ দিচ্ছিলেন। কিন্তু হাসপাতালে গিয়ে টেস্ট করাতে ইচ্ছে করছিল না, আবার ফ্ল্যাট বাড়িতে পিপিই পরিহিত লোকজন এসে নমুনা নিয়ে সবার মাঝে আতংক ছড়াক তাও চাচ্ছিলাম না।

শরণাপন্ন হলাম প্রিয় সহকর্মী, চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবের যুগ্ম সম্পাদক নজরুল ইসলামের। সে বললো, ‘কোনো সমস্যা নেই। সকালেই প্রেস ক্লাবে করে ফেলবো।’ সর্বোচ্চ সতর্কতাবস্থায় ড্রাইভারকে নিয়ে সকালে হাজির হলাম প্রেস ক্লাবে। নজরুলের নির্দেশনায় সবার আগে আমারই নমুনা নেয়া হলো। দেখা হলো করোনাজয়ী মানবাধিকার নেতা এবং দৈনিক আজাদীর আইনজীবী এডভোকেট জিয়া হাবীব আহসান ভাই এবং সাংবাদিক সজীবের সাথে। তারা আমাকে অভয় দিলেন, আশ্বাস দিলেন।

যথারীতি বাসায় ফিরে আইসোলেশন। রিপোর্ট পাবো একদিন পরে। এটি একটি প্রক্রিয়া। ইচ্ছে করলেও জোরাজুরির কিছু নেই। তবে কারো কারো রিপোর্ট পেতে তিনদিনও নাকি লেগে যায়। সেটি যাতে না হয়, একটু বিশেষ কেয়ারে যাতে দ্রুত রিপোর্ট পাই সেজন্য ফোন করলাম বন্ধু , চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাক্তার সেলিম আক্তার ভাইকে। উনি আশ্বস্ত করলেন। ফোন করলেন চমেক হাসপাতালের ল্যাব প্রধানকে। ফোন করলাম আমাদের মেডিকেল বিটের রিপোর্টার প্রিয় সহকর্মী রতন বড়ুয়াকে। কিন্তু সন্ধ্যায় জানা গেল, বিদেশগামীদের টেস্টের প্রেসারে চমেকে সাধারণ রোগীদের কোভিড টেস্টের সুযোগ নেই, সব টেস্ট ভ্যাটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে। কিন্তু রাতে জানা গেল, অতিরিক্ত সতর্কতার সুফলে আমার নমুনাই ভ্যাটেরিনারিতে যায়নি। মানে আজও রিপোর্ট হচ্ছে না।

ফোন করলাম প্রিয় বন্ধু, আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালের ট্রেজারার রেজাউল করিম আজাদ ভাইকে। বললাম, বাসা থেকে নমুনা সংগ্রহের ব্যবস্থা করলে উপকৃত হবো। আজাদ ভাই মা ও শিশু হাসপাতালের সহকারী রেজিস্টার ডা: ফাহিম রেজাকে সব বলে দিলেন। ডা: ফাহিম সকালেই লোক পাঠিয়ে দিলেন বাসায়। ফাহিম জানালো, চারটার মধ্যে রিপোর্ট পেয়ে যাবো।
এদিকে বেলা আড়াইটার দিকে সাংবাদিক রতন বড়ুয়া আমাকে ফোন করে জানালো, সে ভ্যাটেরিনারিতে করা আমার রিপোর্টটি পেয়েছে। ওরা বলেছেন আমার রিপোর্ট ‘পজেটিভ।’ ১৫ মিনিটের মধ্যে রেজাউলকরিম আজাদ ভাই মা ও শিশু হাসপাতালে করা আমার টেস্টের কপি হোয়াটসআপে পাঠালেন- ‘পজেটিভ’।

মিনিট পাঁচেক ঝিম মেরে থাকলাম। কি করবো বুঝতে পারছিলাম না। বিশ্বে ১০ কোটি লোক করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন। আরো হবেন। আমিও হয়েছি। ৯ কোটি ৭০ লাখ মানুষ সুস্থ হয়েছেন। আমিও হবো ইনশাআল্লাহ। সুতরাং ভয়ের কিছু নেই। স্ত্রীকে বললাম। বেচারীর মুখটা মুহূর্তেই কেমন বিবর্ণ হয়ে গেল। ফোন করলাম, দৈনিক আজাদীর পরিচালনা সম্পাদক ওয়াহিদ মালেক ভাইকে। সুদীর্ঘদিনের দারুন এক সম্পর্ক। যে কোনো কথা আগে এই মানুষটিকে বলতে ইচ্ছে করে। গলায় যথেষ্ট সাহসের রেশ টেনে বললাম, ‘পজেটিভ হয়ে গেলাম ওয়াহিদ ভাই। ভাবীকে বলবেন।’ ওয়াহিদ ভাই আশ্বস্ত করলেন-‘কিচ্ছু হবে না। সব ঠিক হয়ে যাবে।’ পারিহা ভাবী ফোন ব্যাক করলেন এক মিনিটের মাথায়। ‘গরম ভাঁপ নেন ভাইয়া। গরম পানি খান। আইসোলেশনে থাকেন। কিচ্ছু হবে না ভাইয়া।’

ঘরে আর কাউকে কিছু বলার আগে ফোন করলাম, ডাক্তার অয়নকে। অয়ন যেন একটু ঢোক গিললো- ‘কি বলেন আংকেল’। বললো, তাহলে আর এঙরে নয়, সিটি স্ক্যান করে ফেলেন। রিপোর্ট পেতে তিনদিনের মতো লাগে। কালও যদি পান তবুও উপকার হবে। দ্রুত সবকিছু শুরু করতে পারবো। অয়ন ম্যাসেঞ্জারে রক্ত এবং ফুসফুসের টেস্টের ডিটেইলস লিখে দিল-‘এইচআরসিটি চেস্ট।’

অল্পক্ষণের মধ্যে ভালোবাসার প্রথম ধাক্কাটা খেলাম আমি। ওয়াহিদ মালেকের ফোন। কণ্ঠ ভাবীর। বললেন, আপনার ভাই গাড়ি চালাচ্ছেন। আমরা কিছু লেবু আর মাল্টা দারোয়ানকে দিয়ে গেলাম। আপনি শুধু খেতে থাকেন ভাইয়া। খলিফাপট্টির বাসা থেকে ঝড়ের বেগে এসে খুলশীতে এভাবে লেবুআর মাল্টা দেয়ার ঘটনাটি প্রথম আমার চোখ ভিজিয়ে দিল। আমি করোনার ভয়ে নয়, ভালোবাসার প্রশ্রয়ে কান্না করলাম। আমার বউ হাত ধরলো। বললো, তোমার কিচ্ছু হবে না। অনেক মানুষের দোয়া আছে।

বেলা তিনটার দিকে কাউকে ফোন করা যায় না। সবাই একটু রেস্টে থাকেন। তবুও ফোন করলাম লায়ন গভর্নর ডাক্তার সুকান্ত ভট্টাচার্যকে। তিনি শেভরণ ডায়াগনস্টিকের অন্যতম কর্ণধার। বললেন, আপনি শুধু শেভরণে পৌঁছান। বাকিটা আমি করছি। সহযাত্রী স্ত্রী। তীব্র যানজটে গাড়ি চলছিল না। তীব্র যানজট। আমার থেকে সন্তানতুল্য ড্রাইভার নজরুলকে বেশ অস্থির মনে হচ্ছিল।

শেভরণের বারান্দায় গাড়ি থেকে নামতেই ছুটে আসলেন মোহাম্মদ লিটন। আমি হাসান আকবর কিনা নিশ্চিত হলেন। পরে হুইল চেয়ারে লবিতে নিয়ে বেশ যত্ন করে এক পাশে বসালেন। এবার ছুটে আসলেন কামরুন্নাহার নামের অপর একজন কর্মকর্তা। তিনি এবং লিটন ভাই আমার মোবাইলে দেয়া ডাক্তার অয়নের টেস্টগুলো লিখে নিলেন। ফাইল তৈরি, টাকা জমা দেয়া থেকে শুরু করে সব কাজই এত অল্পসময়ে দুজনে করে দিলেন যে আমি বুঝতে পারলাম না কখন কি হলো। শুধু অনুরোধ করলাম, সিটি স্ক্যানের রিপোর্টটি বড় জরুরি। এটার উপর অনেক কিছু নির্ভর করছে। তিনদিন লাগলে বিপদে পড়ে যাবো।

ঘন্টা দুয়েকের মধ্যে শেভরণ থেকে মিসেস কামরুন্নাহার হোয়াটসআপে আমার সিটি স্ক্যান রিপোর্ট দিয়ে দিলেন। কি করে কোত্থেকে কিভাবে ম্যানেজ করলেন জানি না। বললেন, ড্রাইভার পাঠিয়ে মূল কপি কালেক্ট করে নিন।

হোয়াটসআপে রিপোর্ট দেখে যতটুকু বুঝলাম তাতে আমার বুক শুকিয়ে গেল। আমার ফুসফুসের আপারলেভেলের দুই পাশই ৫০ শতাংশ কাজ করছে না। ফুসফুসের ৫০ পারসেন্ট ডেমেজড! নিজেকে প্রশ্ন করলাম। বাকি ৫০ শতাংশ দিয়ে কি বেঁচে থাকা যায়? এতক্ষণ যে কাশি চেপে চেপে রাখছিলাম এখন তা যেন বাধভাঙ্গা স্রোতের মতো আছড়াতে শুরু করেছে। চোখের সামনে আমার অসহায় স্ত্রী, একটু দূরে সজল চোখে আমার তিন অসহায় কন্যা। যাদের কারো কোন কুলকিনারা আমি করতে পারিনি। আমার সাজানো গোছানো স্বপ্নের সংসারটি মাত্র কদিনের ব্যবধানে মায়ের অবর্তমানে কোন পথে ছুটছে!

ডাক্তার অয়নকে হোয়াটসআপে সিটি স্ক্যান রিপোর্ট পাঠালাম। সে যেন বিশ্বাস করতে পারছিল না।এখনি এবং এখনিই হসপিটাইলসড করতে হবে। বুকের ভিতরটা কেমন কেমন করতে লাগলো।

খুব ইচ্ছে করছিল আমার প্রিয় এডিটর স্যারের সাথে একটু কথা বলতে।একটু স্যারের কণ্ঠ শুনতে। ইচ্ছে করছিল সদ্য প্রাক্তন লায়ন গভর্নর আমার ম্যাডাম মিসেস কামরুন মালেকের কাছে একটু দোয়া চাইতে। যিনি লায়ন্সসহ বিভিন্ন সভা সমাবেশে প্রকাশ্যে আমাকে সন্তানের মতো জানেন বলে অসংখ্যবার ঘোষণা দিয়েছেন। আজ মনে হলো, আমিও তো ঠিক মায়ের মতো জানি। কত স্মৃতি আমার স্যার ম্যাডামের সাথে। পুরো পৃথিবীজুড়ে আমরা একসাথে এঁকেছি কতপদচিহ্ন। আজ কী সবই নিচিহ্ন হয়ে যাবে!

ফোন করলাম স্যারকে। বললাম, স্যার আমার করোনা হয়েছে। ফুসফুসের অবস্থা ভালো নয়। এখনি হাসপাতালে ভর্তি হতে বলেছে। স্যার কেমন যেন হু হু করে উঠলেন। বললেন, ভয় পেও না। কিচ্ছু হবে না। বললাম, স্যার, আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে যাই। অনেকেই পরিচিত। হেল্প পাবো। স্যার বললেন, ‘হ্যাঁ, সেটা ভালো হবে। আমি আজাদের সাথে কথা বলছি।’
আমি বললাম, স্যার আপনি সাবধানে থাকবেন। জোর করে হাসতে চাচ্ছিলাম। কিন্তু পারছিলাম না। গলা কেমন যেন বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। লাইন কেটে দিলাম।

স্যার ফোন করলেন রেজাউল করিম আজাদ ভাইকে। ওয়াহিদ মালেক ভাই ফোন করলেন উনার ভাইপো ডা: ফাহিম আলী রেজাকে। অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার ফোন করে কোত্থেকে আমাকে তুলে আনতে হবে জানতে চাইলো। সবই ঘটে যাচ্ছিল চোখের পলকে। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্সকে না করে দিলাম। বললাম, আমি গাড়ি নিয়ে চলে আসছি। এখন পথে। ডাক্তার ফাহিম ফোন করে বললো, আংকেল চলে আসেন। নতুন বিল্ডিংয়ে। সব রেডি আছে।

ও হ্যাঁ, বাসা থেকে বের হওয়ার আগ দিয়ে বি ফ্রেশের কর্ণধার বন্ধু শামসুল আলম খসরু একটি অঙিজেন কনসেনট্রেটর এবং নেবোলাইজার মেশিন বাসায় পাঠিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, আমার ফ্যামিলির জন্য কিনেছিলাম। এখন আপনার কাছে থাক। রাতে লাগতে পারে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সুবাদে অনেকে জেনে গেছেন। ক্রমাগত বাজছিল আমার দুইটি ফোন। নানাজন নানাভাবে দোয়া করছিলেন, খবর নিচ্ছিলেন। নিজেদের আকুতি জানাচ্ছিলেন। পরম করুণাময়ের কাছে শতশত আবেদন এবং আকুতির পাহাড় জমছিল। মা ও শিশু হাসপাতালের কেবিনে আমি। হাতটি হাতে নিয়ে বসে আছে আমার স্ত্রী।

কন্যাদের হাসপাতালে আনিনি। তাই হাসপাতালে ঢুকেই রেজাউল করিম আজাদ ভাইকে বলেছিলাম, ভাই স্লিপ থেকে ওষুধপথ্য কেনা পর্যন্ত কোনো কিছু করার মতো লোকই আমার নেই। আজাদ ভাই বললেন, আপনি কোন চিন্তা করবেন না। সব আমরা দেখছি। তিনি বললেন, ‘মালেক স্যার নাকি উনাকে বলেছেন -আমার আকবরকে সিঙ্গাপুর নেয়ার জন্য রেডি করে দাও। যে কোনোকিছুর বিনিময়ে।’ আমি থ হয়ে গেলাম। হাত হাতেনিয়ে বসে থাকা স্ত্রীকে কথাটি বলতে গিয়ে হু হু করে কেঁদে ফেললাম।
কেবিনে চিকিৎসা শুরু হলো। ডাক্তার নার্স ওয়ার্ডবয় আয়া যে যেভাবে পারছিলেন আমার চিকিৎসায় হাত লাগাচ্ছিলেন। তিন লিটার করে অক্সিজেন এবং অনেকগুলো ট্যাবলেট, ইনজেকশন মিলে শুরুহলো আমার চিকিৎসা। বাসায় যেসব অ্যান্টিবোয়োটিক মুখে খাচ্ছিলাম সেগুলোও ইনজেকশন ফর্মে দেয়া শুরু হলো। সাথে নাভিসহ শরীরের নানাস্থানে যন্ত্রনাদায়ক সূচ ফুটোফুটি। বুঝতে পারছিলাম অনিশ্চিত এক মহাযাত্রা শুরু হয়ে গেছে। আমরা স্বামী স্ত্রী হাসপাতালে, বাসার দুই মহিলা সহকারীর কাছে আমার তিন অসহায় কন্যা। পুরো পরিবারের সবার মাঝেই টুকটাক উপসর্গ, পুরো পরিবারই সমস্যায়। কে যে কাকে দেখবে!! হায় আমার রব, কি হবে আমার!

ডাক্তার আমজাদ চেম্বার করেন সীতাকুণ্ডে, পুত্র ডা: অয়ন চেম্বার করেন কুমিরায়। পিতাপুত্র দুজনেই ছুটে আসলেন মা ও শিশু হাসপাতালের কোভিড ওয়ার্ডে। ফাইলপত্র দেখলেন। চিকিৎসার খোঁজখবর করলেন। যাওয়ার সময়, অয়ন আমার হাতটি দুহাতে নিজের মুঠো ভর্তি করে আমার বুকে নিজের মাথা লাগিয়ে বললো, আংকেল , আমি করোনা টরোনা ভয় পাইনা। আপনিও পাবেন না। আমরা আপনার সাথে আছি। যা করতে হয় তা আমরা একসাথে করবো। আপনার জন্য সবাই দোয়া করছে। আমার চোখে জ্বালা বাড়তে থাকে।

নানা শংকা, উদ্বেগ এবং উৎকণ্ঠার মাঝেও একমাত্র শান্তনা ছিল, চিকিৎসা নেটওয়ার্কে যুক্ত হয়েছি। ডাক্তার ওষুধ সেবা কোনো কিছুরই অভাব হচ্ছিল না। করোনা আক্রান্ত মাকে ফেলে যখন সন্তান পালায়, ভাইকে ফেলে দিয়ে ভাই পালানোর নজির রয়েছে সেখানে হাসপাতালের কাছে হালিশহরে বসবাসকারী আমার দুই যুগেরও বেশী সময়ের বন্ধু শেখ আবদুল্লাহ বাবুল তার চিকিৎসক পুত্র ডা: ফয়সল আবদুল্লাহকে নিয়ে চার ক্যারিয়ারের টিফিন বঙ নিয়ে হাজির হলেন হাসপাতালে। লিফট নেই, চারতলা পর্যন্ত এত বড় কেরিয়ার পিতাপুত্র টেনে তুলে আনলেন। কেবিনে ঢুকে একেবারে সামনের চেয়ারটিতে বসলেন। হুকুম দিলেন, যতদিন এখানে চিকিৎসা ততদিন খাবার আসবে বাসা থেকে। এর পরিবর্তন চাইলে দুই যুগের সম্পর্ক শেষ করতে হবে।

বিভিন্ন সময় অসুখ বিসুখে আমি বাড়িতে চিকিৎসা নিয়েছি, কোনোদিনই রোগী হয়ে হাসপাতালে থাকিনি। তাই রোগী হিসেবে হাসপাতালে কাটানো প্রথম রাতটা কিছু বুঝে উঠার আগেই ফুরিয়ে গেল। সকাল ছয়টায় নার্স ঘুম থেকে তুলে কি কি সব ওষুধ খাওয়ালেন, ক্যানোলায় ইনজেকশন দিলেন। ডায়াবেটিসপ্রেসার মাপলেন, নাস্তা শেষ করে তাকে আবার ডাকতে বললেন। নাস্তার পরেও নাকি আরো ঔষুধআছে। ইনজেকশন আছে।

সবকিছু কেমন চলছে জানতে ফোন করলেন মা ও শিশু হাসপাতালের ট্রেজারার রেজাউল করিম আজাদ ভাই। এত সকালে আজাদ ভাইর ফোন? আপ্লুত হই। না, আমি অসহায় নই। বেশ খুশি হয়ে বললাম, সবই ঠিক আছে। হাসপাতালের লোকজন সব করে দিচ্ছেন। রেজাউল করিম আজাদ ভাই পরক্ষণে বললেন, আমাদের করোনা চিকিৎসা কার্যক্রমের পুরোধা , ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ ডাক্তার শেফাতুজ্জাহান আপনাকে দেখতে আসবেন। উনার হাত দিয়ে আমরা করোনা চিকিৎসার শুরু করেছিলাম। করোনার তাবৎ বিশ্বের সর্বশেষ আপডেট উনার কাছে আছে। কোথায় কি চিকিৎসা চলছে তা উনি জানেন। উনাকে বলেছি, কি করতে হবে করুন, বই কিনতে হলে কিনুন, কিছু ডাউনলোড করতে হলে করুন, যন্ত্রপাতি কিনতে চান,আপত্তি নেই। যা লাগে সবই করুন, কিন্তু কোনক্রমেই হাসান আকবর ভাইয়ের মতো মানুষটিকে হারাতে পারবো না। আজাদ ভাই বলতে থাকেন, আমার চোখ ভিজে যায়।

সত্যি সত্যি অল্পক্ষণের মধ্যে হাজির হলেন ডাক্তার শেফাতুজ্জাহান। সাথে করোনা ওয়ার্ড এবং আইসিইউর ডাক্তারের বিশাল টিম। নার্স, ওয়ার্ড বয়। আমার কেবিন পুরোটাই ভর্তি। ডাক্তার শেফাতুজ্জাহান নানাভাবে পরীক্ষা করলেন আমাকে। হাত বুলিয়ে দিলেন মাথায়। কপালের তাপ দেখলেন। প্রেসার এবং পার্লস দেখলেন। ফাইল দেখলেন। কিছু ওষুধ রাখলেন, কিছু পাল্টালেন। অতপর সবাইকে সামনে নিয়ে উনি মিনিট দশেকের একটি বক্তব্য রাখলেন। বললেন, ‘আমরা সবার জন্য সেরাটা করি, করার চেষ্টা করি। কিন্তু উনার জন্য চেষ্টা নয়, যাতে সেরাটা হয়। পৃথিবীর সেরা চিকিৎসা সেবা এখানে হয়তো হবে না, তবে আমরা উনাকে এখানেই দেশের সেরা চিকিৎসাটা দেবো। কোনো অজুহাত, কোনো গাফিলতি বা কোনো কিছুর অভাবে উনার চিকিৎসায় বিন্দুমাত্র আপোষ করা যাবে না। যা করতে হয় ঠিক তাই করবেন, এঙ্যাক্টলি তাই।’

আমার বুক থেকে পাথর সরতে থাকে। আমার মনোবল বাড়তে থাকে। ওষুধ পথ্য সেবা সবই চলতে থাকে। আমার কল্যাণকামনা এবং দ্রুত সুস্থ হয়ে যাওয়ার আশ্বাস দেন ডাক্তার শেফাতুজ্জাহান। তিনি আমাকে মনোবল বাড়াতে এবং বেশী বেশী খাওয়ার পরামর্শ দিলেন। আবার আসবেন বলে বিদায় নিলেন। ঘন্টায় তিন লিটার অক্সিজেন চলতে থাকে।

ওয়াহিদ মালেক ভাই ফোন করলেন। খোঁজখবর নিলেন। বললেন, কোনো চিন্তা করবেন না। তিনি জানালেন, আম্মা খাসি সদকা করে দিয়েছেন। সবাই দোয়া করছেন। আপনি মনোবল শক্ত রাখুন। করোনা কিচ্ছু করতে পারবে না।’ অসংখ্য লোক ফোন করছেন। আমার স্ত্রী ফোন ধরছেন। ম্যাডামের নাম করে কে কে যেন বললেন, উনি সবার কাছে আপনার জন্য অকাতরে দোয়া চাচ্ছেন।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমার করোনা আক্রান্ত হওয়া এবং হাসপাতালে ভর্তির ব্যাপারটি ব্যাপক ভাবে জানাজানি হয়।

গ্রামে ভাই বোন ভাইপো ভাইঝি এবং ভাগ্নে ভাগিনীরা যে যেখানে পারছে জীবন ভিক্ষা চাচ্ছে। বড় আপা দুইটি খাসি সদকা করার কথা জানালেন। বন্ধু বান্ধব স্বজন সবাই দোয়া করছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ফোনে খবরাখবরগুলো জানিয়ে আমাকে চাঙ্গা রাখার চেষ্টা করছিল স্ত্রী।

নাকে অক্সিজেন নল, হাতে মনিটর, শরীর জুড়ে ইনজেকশন, মুঠো মুঠো ট্যাবলেট, সিরাপসহ নানা ওষুধ নিয়ে পার করছিলাম সময়। হঠাৎ কেমন যেন ব্যস্ততা দেখা গেল। ছুটে এলেন কোভিড আইসিইউ ইনচার্জ এবং হাসপাতালের ইন্টার্নাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাঃ মাহাদি হাসান। সাথে আরো কয়েকজনডাক্তার, নার্স। অক্সিজেন নলের নব ঘুরাতে লাগলেন তারা। ৬-৮-১০-১৫ লিটার। অক্সিজেন বাড়ছিল। স্যাচুরেশন কমছিল। বিগড়ে যাওয়া ফুসফুস কাজ করতে পারছিল না। কাশির তীব্রতায় মনে হচ্ছিল জীবনমৃত্যুর মহাক্ষণে দাঁড়িয়ে আমি। স্ত্রীর হাতটি আমার হাতে, ডাক্তার নার্স আমার চারপাশে, অসহায় তিন কন্যার সজল চোখ, ভাই বোন স্বজন প্রিয়জন, সহকর্মী, বন্ধু একে একে সবার চেহারা ভাসছিল চোখে। আমার দুনিয়াটা কেমন যেন ঘুরতে লাগলো, সবই অসাড় ঠেকছিল। ডাক্তার বললেন, ‘না, আর এখানে নয়, দ্রুত আইসিইউতে শিফট করতে হবে। বেড রেডি করেন।’
আইসিইউ! আহা, আর বুঝি দেখা হবে না কারো সাথে। ডাক্তার মাহাদি আমাকে ভাইয়ের মমতায় একেবারে আগলিয়ে ধরলেন। বললেন, ‘ভয় পাচ্ছেন কেন? কিচ্ছু হবে না। আমরা ম্যানেজ করবো ইনশাআল্লাহ। শুধু বেটার ট্রিটমেন্টের জন্য বেড পাল্টে একটু ক্লোজ মনিটরিংয়ে নিচ্ছি।’ মুখে অক্সিজেন বিশাল বেলুনওয়ালা নল, মনিটরিং এর নানা তারে পেছানো শরীর, ইসিজি মেশিন- সবইসতর্কতা ডা: মাহাদি ভাই? আমাকে আর কত মূল্য দিয়ে আসল অবস্থা বুঝতে হবে? ভিতরে ভাংচুর চলছিল।

ভীষণ রকমের যত্ন এবং উত্তেজনায় আমাকে আইসিইউতে শিফট করা হলো। হিমশীতল পরিবেশ। চারদিকে নানা শব্দ, ভীতিকর। অনেক মানুষ, কষ্টে কষ্টে বিবর্ণ সকলে। দুইপাশে দুই নারী রোগীর মাঝে একটি বেড আমাকে দেয়া হলো। আর সিট খালি নেই। এই বেডে একটু আগে যিনি ছিলেন তার অবস্থা নাকি কিছুটা ভালো হওয়ায় তাকে পুরাতন ভবনের আইসিইউতে স্থানান্তর করে আমাকে এখানে দেয়া হচ্ছে।

আমার অবস্থা যে ভালো নয় সেটা বেশ বুঝতে পারছিলাম। ২০ লিটার করে অঙিজেন চলছিল। বুকের উপর অঙিজিনের বেলুন পাইপ। মাঝে মাঝে জিহ্বার নিচে দেয়া হচ্ছে ইনহেলার স্প্রে। নানা তার পেছানো শরীরে। গায়ে সবুজ এপ্রোন, কালো চাদরে ঢাকা বুক। যেন মহাযাত্রার মহাপ্রস্তুতি আসন্ন!

পাশের দুই মহিলার একজনের বয়স অনেক। সারাক্ষণই কষ্ট করছেন। অপরজনের বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। কিন্তু কষ্ট অনেক বেশী। সারাক্ষণই যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছিলেন। আরো কয়েকজন রোগী আছেন। সবাই কোভিড। সবারই ভয়াবহ কষ্ট। আমি যেন চারদিকে মৃত্যুপথযাত্রীর কাফেলা দেখতে পারছিলাম!

একদিন হঠাৎ আইসিইউতে বেশ কিছু লোকজন। ক্যামেরা, মাইক্রোফোন। বুঝতে পারছিলাম কোন সাংবাদিক এসেছেন। মাথায় আলতো করে হাত দিলেন কেউ একজন। মাস্কের জন্য চিনছিলাম না, ইমন পরিচয় দিল। বললো, ‘ভাইয়া আমি সি প্লাস টিভির ইমন। আইসিইউ সংকট নিয়ে রিপোর্ট করতে এসেছি। আপনি ভর্তি হয়েছেন শুনে দেখতে আসলাম।’ আইসিইউর শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত হিমশীতল পরিবেশে কোভিড ভাইরাস। তাকে দ্রুত সরে যেতে হাত ইশারা করলাম। সে আমার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে অন্যপাশে চলে গেল।

আমার আকুলি বিকুলি বাড়ছিল। কেউ একজন কানের কাছে এসে বললো, আপনি শান্ত হোন। অস্থির হবেন না। ভয় পাবেন না। আপনার চিকিৎসার সর্বাধুনিক ব্যবস্থা হচ্ছে। আপনার জন্য দেড় লাখ টাকা দামের জার্মানির ইনজেকশনের অর্ডার দেয়া হয়ে গেছে। একটা ইনজেকশন দেড় লাখ টাকা! আমি মনে হয় একটি হার্টবিট মিস করলাম। তিনি বললেন, আপনার ওজন বেশি। আরো বেশি লাগবে। এক লাখ আশি হাজার টাকার মতোও লাগতে পারে। তিনি বললেন, সব ঔষুধের দাম বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। নাভিতে যে ইনজেকশন দেয়া হচ্ছে সেটারও তো অনেক দাম। এক একজনকে অনেকগুলো করে দিতে হয়। আমার হার্টবিট মিসের ঘটনা মনে হয় ঘটেই চলছিল।

কোনকিছু না ভেবে, কোনরূপ চিন্তাভাবনা না করে আমি সাংবাদিক সাহেবকে একটু ডেকে দেয়ার জন্য ভদ্রলোককে অনুরোধ করলাম। মনে হলো, জীবনের তিন যুগেরও বেশি সময়ের সাংবাদিকতায় মানুষকেসচেতন করার নিরন্তর একটি চেষ্টা ছিল আমার। গত এক বছরের করোনাকালেও সেই চেষ্টার কমতি ছিল না। সবসময়ই কল্যাণকামী সাংবাদিকতায় বিশ্বাসী ছিলাম। তাই জীবনের শেষমুহূর্তেও অন্তত প্রিয় চট্টগ্রামের মানুষকে সচেতন করে গেলে মরেও শান্তি পাবো।

সি প্লাস টিভির সাংবাদিক জিয়াউল হক ইমন বেশ দ্রুত ছুটে আসলো আমার কাছে। তাকে বললাম, ‘এই করোনা যে কত ভয়াবহ তা চট্টগ্রামের মানুষ বুঝতে পারছে না। শুধু জীবনঘাতীই নয়, চিকিৎসাও যে কত কষ্টকর এবং ব্যয়বহুল তা মানুষ মনে হয় জানে না। তুমি আলমগীর অপুকে একটু বলে দিও যাতে বেশি বেশি এসব প্রচার করে।’ ইমন বললো, ভাইয়া, ‘আপনিই এক লাইন বলে দিন না।’ জাস্ট বলে দিলাম। কঠিন এবং ব্যয়বহুল এক কষ্টকর চিকিৎসার কথাই মানুষকে বলে যেতে চাইলাম। সাংবাদিক হিসেবে নয়, একজন সাধারণ করোনা আক্রান্ত রোগী হিসেবে চট্টগ্রামের মানুষকে কথাগুলো বলতে পেরে অপারএক শান্তি পেয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল, আমি তো চলে যাচ্ছি। যদি একজনও তার অসহায় কন্যাদের জন্য বেঁচে থাকেন!

আইসিইউতে আমার বেড ঘিরে বিশেষ তোড়জোড় শুরু হলো। ছবি আঁকার স্ট্যান্ডের মতো বিশেষ ধরণের একটি স্ট্যান্ড এনে লাগানো হলো বেডের পাশে। তার সাথে দুইটি বিশেষ ধরণের মেশিন। মেশিন দুইটির সাথে বৈদ্যুতিক সংযোগ। এই দুই মেশিন দিয়েই একই সাথে টানা একঘন্টা ধরে অতি দামী এভাসটিন ইনজেকশন পুশ করা হবে আমার শরীরে। এক ঘন্টা ধরে ইনজেকশন পুশ কোনো মানুষের পক্ষে সম্ভব নয় বিধায় নাকি আবিষ্কৃত হয়েছে মেশিন। স্বাভাবিক ওজনের মানুষকে একডোজ দিতে হয়, আমাকে বেশি। তাই দুইটি মেশিন।

সন্ধ্যার অন্ধকার নামার সাথে সাথে তোড়জোড় বাড়লো। বাতি বন্ধ করে অন্ধকার করে দেয়া হলো আইসিইউ। কালো চাদরে মুড়িয়ে বিশেষ যত্নে আনা হলো এভাসটিন ইনজেকশন। মেশিনে সেট করে পুশ করে দেয়া হলো শরীরে। টানা এক ঘন্টা ধরে চলবে এ মহাযজ্ঞ। মেশিন, স্ট্যান্ড, ইনজেকশন, পাইপ সবই মুড়িয়ে রাখা হলো কালো কাপড়ে। অন্ধকার চারদিকে। মুখে অঙিজেন বেলুন লাগিয়ে অতি অসহায়ভাবে আমি তাকিয়ে আছি কুচকুচে কালো কাপড়ের দিকে। বুকে মাথায় শুধু মায়ার পরশ বিলি কাটছিল। আহা, বেচারি, পাশে বসে আছে।

মন ভেঙ্গে দেয়ার মতো আরো একটি খারাপ খবর পেলাম। গ্রামের প্রতিবেশী ছোটভাই লায়ন জুযেলকে দেখতে পেলাম আইসিইউতে। জুয়েল আমাকে দেখতে এসেছে মনে করে কিছুটা রাগও করলাম। পরে সে যা জানালো তাতে আমার অন্তর হু হু করে উঠলো। আমার স্কুল জীবনের বাংলার স্যার, যিনি আমাকে বাংলা শিখিয়েছিলেন, মুখস্ত না করে কিভাবে কল্পনায় লিখতে হয়, কিভাবে বাংলা ভালো হয়, খাই যাই এবং খায় যায় কখন হয় ইত্যাদি, যে বাংলা লিখে আমি জীবন পার করে দিলাম সেই জহুরুল হক স্যার আমার মাত্র এক বেড দূরে, আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। আরো দুইদিন আগ থেকে স্যারের চিকিৎসা চলছে। মাঝে ছোট্ট একটি দেয়াল থাকায় আমি স্যারকে দেখছি না, স্যারও দেখছেন না আমাকে। চিরকুমার স্যার আমার। স্ত্রী সন্তান পুত্র কন্যা কেউ নেই। ভাইপো ভাইজিরা জীবনপণ করে সেবা করছে।

আইসিইউতেই দিনরাত কাটছে আমার। আধোঘুম আধো জাগরণে সময় পার হচ্ছে। কষ্টের নানা শব্দ ভেসে আসছে সেই সাত সমুদ্দর দূর থেকে, মানুষের কণ্ঠ থেকে। কি কষ্ট, কি কষ্ট! আহা, মানুষ যদি এমন কষ্টের কথা জানতো! বেডের পাশে একটি প্লাস্টিকের টুলে বসে আমার হাতটি হাতে নিয়ে বসে থাকেপ্রিয়তমা স্ত্রী। তাকে বাইরে যেতে যত জোর করি ততই সে হাতটি শক্ত করে ধরে। একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত আইসিইউতে দর্শনার্থী এ্যালাউ করে। ততক্ষণ নাকি সে এভাবেই থাকবে। সে ডাক্তার নার্স থেকে অনুমতি নিয়েছে। সে জানালো, আত্মীয় স্বজন বন্ধু বান্ধব অনেকেই খবর নিয়েছেন। আসতে চাচ্ছেন। তবে সে সবাইকে না করে দিয়েছে। শুধু কাউকে কিছু আগাম না জানিয়ে বড় বোনের ছেলে সাগর নিজে এসে হাসপাতালে ঢুকেছে। সে বলেছে, মামা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত সে হাসপাতালেই থাকবে। সন্তানতুল্য ড্রাইভার নজরুলই যথারীতি বাসা এবং হাসপাতাল করছে।

আইসিইউতে কখন সকাল হচ্ছে, কখনইবা সন্ধ্যা নামছে তা টের পাচ্ছিলাম না। আগ্রহও ছিল না। শুধু কষ্টকর কিছু অচিন সময় অতি ক্ষীণলয়ে পার করছিলাম। মাথার ভিতরে সারাক্ষণই কি কি যন্ত্রের শব্দ। শরীরে পেছানো তার, বুকে সেঁটে রাখা ধাতব পাত, হাত দুয়েকের মধ্যে অপর বেড। সেখানেও কষ্ট, কান্না চিৎকার গোঙানি। মেশিনে নানা শব্দ। কখনো মুরগী ডাকে, কখনো মনে হয় হাঁস। কখনো বা কুকুরের ডাক, কখনো হায়েনা। কি যে ভয়াবহ রকমের এক একটি শব্দ আসছিল এক একটি মেশিন থেকে। নাকি আমারই কেবল এসব মনে হচ্ছে!!

ঘুম উবে গেছে। দুই মিনিট ঘুমালে দশ মিনিট চোখ খোলা। আবার একটু তন্দ্রা, একটু স্বপ্ন, দুঃস্বপ্ন। কতক্ষণ মনে হচ্ছে মাথার উপর বিশাল লম্বা একজন মানুষ দাঁড়িয়ে রয়েছেন। আবার কখনো মনে হচ্ছে মা এসে মাথায় হাত বুলাচ্ছেন। কখনো মনে হচ্ছে ডাক্তার এসেছেন, কখনো মনে হচ্ছে নার্স সুঁই ফুটাচ্ছেন। অথচ কোথাও কেউ নেই। শুধু বিবর্ণ এক পাথর সময় আইসিইউতে আমার বুকটি চেপে আছে। আর কতক্ষণ! কতক্ষণ এভাবে? আর কতকাল!!!

আইসিইউর নার্স ইনচার্জ রুপনা বড়ুয়া, নার্স টিংকু , শাহজাহান, শাহাদাত, কাকলী ক্লিনার সুজন এরা কোনটি আমার বোন, কোনটি সন্তান হয়ে এমনভাবে সেবা করছিল যে কোনদিনই ভুলতে পারবো না। আমার কন্যার মতো কাকলী তো বাসা থেকে তরকারি রান্না করে নিয়ে এসেছিল। স্বল্পপরিচিত হলেও একভাবী বাচ্চার অলিভ অয়েল দিয়ে চিকেন রান্না করে পাঠান আমার জন্য। আমি আপ্লুত হই, আমার চোখ জ্বালা করে।

চট্টগ্রামের করোনা চিকিৎসায় ফিল্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে দেবতুল্য হয়ে ওঠা মানবিক ডাক্তার বিদ্যুৎ বড়ুয়া দাদা আইসিইউতে হাজির হলেন আমাকে দেখতে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খবর পেয়ে ছুটে এসেছেন তিনি। খোঁজখবর নিলেন চিকিৎসার। সব ঠিকপথে এগুচ্ছে বলে আশ্বস্ত করলেন। তবে অক্সিজেন ছাড়া স্বাভাবিকভাবে দুইদিন না দেখে হাসপাতাল না ছাড়ার পরার্মশ দিয়ে গেলেন। মাথায় হাত দিয়ে আদর বুলিয়ে গেলেন দাদা। লায়ন মাহমুদুর রহমান শাওনের স্ত্রী ডাক্তার আফরোজা, আমার বন্ধুপুত্র ডাক্তার ফয়সল আবদুল্লাহর নিয়মিত ডিউটি হয়ে উঠেছিল আমাকে প্রতিদিনই এক দুইবার দেখে যাওয়া।

আইসিইউর হিমশীতল পরিবেশে এভাবেই চলছিল। কত দিন কত ঘন্টা কে জানে! কতদিন হলো আইসিইউতে? মনে করতে পারছিলাম না। গভীর রাত। কিছুক্ষণ আগে মনে হয় ঘুমিয়েছিলাম। হঠাৎতীব্র চিৎকারে বুকের ভিতরটা ধড়ফড় করে উঠলো। চোখ খুললাম। আলোর বান যেন আইসিইউতে। আমার সামনের বেডের একজন মহিলা মারা গেছেন। কোভিড রোগী। পাশের দুজনের একজন সমস্বরে কাতরাচ্ছেন। বয়স্কজন একে ওকে ডাকছেন। আরো দুইজন রোগীর অবস্থা নাকি খুবই খারাপ। যখন তখন অবস্থা। মনে হচ্ছিল পুরো আইসিইউজুড়ে ভয়াল এক জগদ্দল পাথর বসে আছে। অঙিজেন চলছে। বিভিন্ন মেশিন থেকে নানা আওয়াজ ভেসে আসছে সমস্বরে।

আমার ফুটফুটে তিন অসহায় কন্যা। যাদেরকে একদিন না দেখলে আমি বুকের পাঁজর ভাঙ্গারশব্দ শুনি আমার কলজের টুকরোগুলো কেমন আছে? হাসপাতালে ছুটে আসতে আকুলি বিকুলি করছেতারা। কিন্তু কোভিড আইসিইউতে বাচ্চাদের আনার বচ্যাপারে কড়া নিষেধাজ্ঞা আমার। ভিডিও কল করে বাচ্চাদের দেখা যায়, কিন্তু হু হু করে কান্না আসে। ফুসফুস চাপ নিতে পারে না। তাই তাতেও নিষেধাজ্ঞা। আমার জীবন শুধু ভয়াবহ নয়, কঠিন হয়ে উঠেছিল। পরিবারের একজন মাত্র মানুষের করোনার কারণে জীবন এমন হতে পারে তা আমার ধারণাতেই ছিল না।

নতুন সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিশ লিটার অক্সিজেন আমার ফুসফুসে স্যাচুরেশন ঠিক রাখছে। কিন্তু ফুসফুস থেকে ব্লাডে অঙিজেন ঠিকভাবে যাচ্ছে না। ডাক্তার শেফাতুজ্জাহান এবং ডাক্তার মাহাদি মাথার ঘাম পায়ে ফেলছেন। কতবার যে আসলেন, কতভাবে যে আমাকে দেখলেন, সাহস দিলেন। আহা, মানুষের ঋণ কিভাবে শোধ করা যায়! আবারো নতুন ইনজেকশন, নতুন ট্যাবলেট। সাথে নতুন পরীক্ষা। ভেইন থেকে নয়, আর্টারি থেকে রক্ত নিয়ে করতে হবে এবিজি। দিনে দুইবার। কোন কোন দিন চারবারও। আর আর্টারি থেকে রক্ত নেয়া যে এক টুকরো কলজে ছিঁড়ে নেয়ার মতো কষ্টের তা আগে কে জানতো! তবে এত কষ্টের মাঝেও প্রায়ই আপ্লুত হতাম। নোনাজলের সাথে কিছু কিছু মিষ্টিজলও বুঝি আসতো মিশে। স্ত্রী যখন কাছে থাকতো তখন কিছুক্ষণের জন্য নেটসুবিধায় ফোন পেতাম। নেড়ে ছেড়ে দেখতাম। আমার স্যার এম এ মালেক, ম্যাডাম কামরুন মালেক, ওয়াহিদ মালেক ভাই, পারিহা ভাবী, শিহাব ভাই, রেজাউল করিম আজাদ ভাই একেবারে নিয়ম করেই ফোন করতেন। খবর নিতেন। কি কি লাগবে যোগান দিতেন। এডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান ভাই নিয়মিত চাঙ্গা করতেন। আর আমারএকটি বোন যেসব ছবি দেখলে আমার ভালো লাগবে সেগুলো একেবারে নিয়ম করে পাঠাতেন।

হাসপাতালের বিল থেকে ওষুধ সবই পোস্টপেইড করে দেয়া হয়েছে। আমার এডিটর স্যার ফোন করে দিয়েছেন। সবই চলছে। এক টাকার ওষুধ নিয়েও মাথা ঘামাতে হচ্ছিল না। তবে যে হারে ওষুধ ইনজেকশন টেস্ট চলছিল তাতে বেশ বুঝতে পারছিলাম যে স্রোতের মতো বিল বাড়ছে। আজাদ ভাইফোন করলেই প্রথমেই বিলের কথাটি জানতে চাইতাম। তিনি এড়িয়ে যেতেন। আমার বুকে চাপ কেবলই বাড়তে থাকে। হায় হায় মানুষ কি করে চিকিৎসা করবে! কি করে বাঁচবে?

টানা ছয়দিন পর আইসিইউ থেকে বের করা হলো আমাকে। যেন ১৪৪ ঘন্টার এক দীর্ঘ রজনী পার করে এলাম। তবে আরো দুইদিন অঙিজেন দিয়ে আমাকে রাখা হলো কেবিনে। পরবর্তী চারদিন স্বাভাবিক রুম এয়ারে। অঙিজেন ছাড়া। বিদায় দেয়ার সময় সিঙ্গাপুরসহ নানা দেশে আইসিইউতে কাজ করা বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, মা ও শিশু হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ এবং ইটার্নাল মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার মাহাদি হাসান বললেন, আপনার ফেরাটা মিরাকল। যেখানে আপনি গিয়েছিলেন সেখান থেকে ফেরাটা ছিল অতি কঠিন। ইঞ্জিনিয়ার আলী আশরাফ ভাই এবং আপনি একই অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিলেন। ইঞ্জিনিয়ার আলী আশরাফ ফিরেননি, আপনি ফিরেছেন। সাবধানে থাকবেন।

হায় হায় তাহলে কিভাবে ফিরলাম আমি? মিরাকল? মায়ের দোয়ায়? মানুষের দোয়ায়?? অতি নগন্য একজন সাধারণ সংবাদকর্মী আমি। কিন্তু জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ প্রার্থনা করেছেন আমার জন্য। দোয়া করেছেন। বিধাতার কাছে আকুতি জানিয়েছেন। মসজিদে মাজারে দোয়া হয়েছে, খতমে কোরআন, খতমে তাহলীল হয়েছে। হযরত আমানত শাহ (র:) হুজুরের মাজারে খতমে কোরান, মিলাদ মাহফিল এবং মিসকিন খাওয়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। দান খয়রাত সদকা চলেছে। হযরত গরীবুল্লাহ (সা:), বদনা শাহ (র:), মিসকিন শাহ (র:), মাইজভান্ডার শরীফে দোয়া হয়েছে। লায়ন্স ক্লাবে দোয়া মাহফিল হয়েছে। মন্দির, প্যাগোডা এবং গীর্জায় প্রার্থনা হয়েছে। জানানো হয়েছে আকুতি। পরম করুনাময়ের নিকট অঝোরে কেঁদেছে আমার আত্মীয়-অনাত্মীয়, স্বজনপ্রিয়জন। সবাই প্রার্থনা করেছেন আমার কল্যানের জন্য, আমাকে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য। আমার সামর্থ খুবই সীমিত, ক্ষমতাহীন একজন সংবাদকর্মী। কিন্তু যখনি সুযোগ পেতাম মানুষের জন্য কোনোরূপ বিনিময়ের আশা ছাড়া কিছু একটা করার নিরন্তর চেষ্টা করতাম। কিন্তু সেই নগন্য ছোট ছোট কাজগুলোযে মহাসাগরের ঢেউয়ের মতো ফিরে আসে তা আমার জানা ছিল না।

এটি কোনো পরিকল্পিত লেখা নয়। গুছিয়েও নয়। হাসপাতালের বেড়ে কখনো দুই লাইন, কখনো পাঁচলাইন কখনো বা দশ বিশ লাইন করে মোবাইলে লেখা। তবে এই লেখাটার বিশ্বাসে কোন খাদ নেই, একরত্তি ভেজাল নেই। জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে প্রতিবারই মনে হতো লেখাটি শেষ করতে পারবো তো? আমি বিশ্বাস করেছি, পরম করুণাময় বড় যত্নে মানুষ গড়েছেন। মানুষকেই উনি সবার চেয়ে বড় করেছেন। সেই মানুষের দোয়া এবং ভালোবাসাই তিনি এক অসীম শক্তি দিয়েছেন।

হে আমার রব, হে আমার বিধাতা-তুমি যদি মানুষের দোয়ায় আমাকে ফিরিয়ে দাও তাহলে আমার বাকি জীবনটাও মানুষের কল্যাণে নিবেদিত করে নাও।

 

লেখক: প্রধান প্রতিবেদক, দৈনিক আজাদী।