নিউজটি শেয়ার করুন

মেয়র আসে মেয়র যায়, জলাবদ্ধতা থেকে যায়

মেয়র আসে মেয়র যায় জলাবদ্ধতা থেকে যায়

সিপ্লাস প্রতিবেদক: বর্ষা এলেই বন্দরনগরী হাঁটু থেকে কোমরসমান পানিতে ডুবছে। বাসা-বাড়ি, বাজারঘাট, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান-সর্বত্র পানি ঢুকছে। মানবসৃষ্ট এ দুর্ভোগ মাথায় নিয়ে প্রায় ৭০ লাখ চট্টলাবাসীকে বর্ষা মৌসুম পার করতে হয়। জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে ১৪ বছরে ৩২৪ কোটি টাকা খরচ হলেও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। চট্টগ্রাম মহানগরীর জলাবদ্ধতা যেন নিয়তি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নগরী জলাবদ্ধতামুক্ত হয়নি। উলটো প্রতি বর্ষায় নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার চিত্র ভেসে ওঠে। অথচ সিটি করপোরেশন নির্বাচন এলেই মেয়রপ্রার্থীদের ইশতাহারে ‘জলাবদ্ধতামুক্ত নগর উপহার দেওয়ার’ প্রতিশ্রুতি প্রাধান্য পায়। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয় না। নির্বাচন আসে নির্বাচন যায়, মেয়র আসে মেয়র যায়; নগরীর জলাবদ্ধতা আর যায় না। এক দশকে জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রামে ব্যবসায়িক ক্ষতি আড়াই হাজার কোটি টাকা হয়েছে বলে জরিপে উঠে এসেছে।

চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী, মনজুর আলম ও আ জ ম নাছির উদ্দীনের নির্বাচনি ইশতাহারে এক নম্বর প্রতিশ্রুতি ছিল নগরীকে জলাবদ্ধতামুক্ত করা। নির্বাচিত হয়ে তারা এ লক্ষ্যে চাকতাই খাল খননসহ বিভিন্ন খাল খননে কাঁড়ি কাঁড়ি অর্থও খরচ করেন। কিন্তু জলাবদ্ধতামুক্ত নগরীর প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হয়নি।

এ তিন মেয়রের আমলেই ১৪ বছরে খাল খনন খাতে ৩২৪ কোটি টাকা ব্যয় করা হয়। প্রকৌশল বিভাগের এক হিসাবে দেখা গেছে, চট্টগ্রামের দুঃখ চাকতাই খালসহ নগরীর শাখা-প্রশাখা ও খাল খননে ৩২৪ কোটি টাকা খরচ হয়েছে। এ হিসাবে প্রতিবছর গড়ে ২৩ কোটি টাকা খরচ করেছে সিটি করপোরেশন।

চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে ৫ হাজার ৬১৭ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার। তিন বছর পার হলেও এ প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়নি। দুই দফায় মেয়াদ বাড়ানো হলেও অর্থ সংকটসহ নানা কারণে প্রকল্পের গতিও মন্থর। এ কারণে জলাবদ্ধতা থেকে নগরবাসী শিগগিরই মুক্তি পাবেন কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। এ প্রকল্পের নতুন মেয়াদ ২০২৩ সাল পর্যন্ত।

পরিবেশকর্মীদের অভিমত, ১৯৬৮ সালের ‘চট্টগ্রাম বন্যা নিয়ন্ত্রণ মহা পরিকল্পনা’য় ৭১টি খাল চিহ্নিত আছে। এসব খালের দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও গভীরতা নির্ধারণ করা আছে। কালুরঘাট সেতু থেকে সীতাকুণ্ডের কুমিরা রেল স্টেশন পর্যন্ত নগরীর ভেতরে-বাইরের এসব খাল উদ্ধার করা গেলে চট্টগ্রাম জলাবদ্ধতামুক্ত হবে।

তিনি বলেন, বর্তমানে জলাবদ্ধতা প্রকল্পের আওতায় ৩৬টি খাল খনন করা হচ্ছে। এসব খাল খননের পর রক্ষণাবেক্ষণ করতে হবে। পলিমাটিতে খাল ভরাট হওয়ার উৎস চিহ্নিত করে তা বন্ধ করতে হবে। তবেই খাল খনন প্রকল্পের সুফল মিলবে। চট্টগ্রামের দুঃখ চাকতাই খাল : সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন জলাবদ্ধতা নিরসনে ১৪ বছরে যে ৩২৪ কোটি টাকা খরচ করেছে, এর সিংহভাগ খরচ হয়েছে চাকতাই খাল খননে।

প্রকৌশল বিভাগ জানায়, মহিউদ্দিন চৌধুরীর সময় চাকতাই খালের তলা পাকাকরণ করা হয়। ২০০৩-০৪ অর্থবছরে ৯ থেকে ১২ ফুট গভীরতা রেখে চাকতাই খালের বেশির ভাগ অংশের তলদেশ পাকা করা হয়। কয়েক বছর পর দেখা গেছে, পাহাড়ের বালু-মাটি, পলিথিন ও আবর্জনা জমে খাল আবার ভরাট হয়ে গেছে।

খালের গভীরতা কমে তিন থেকে চার ফুটে দাঁড়িয়েছে। অথচ ১৫-২০ বছর আগেও এ খাল দিয়ে চলত পণ্যবাহী নৌকা। ছয় কিলোমিটার দীর্ঘ এ খালের সর্বনিম্ন ২০ ফুট থেকে সর্বোচ্চ ৭০ ফুট প্রশস্ত রয়েছে। কোথাও কোথাও বেদখল হওয়ায় সব জায়গায় প্রশস্ত একই রকম নেই। খালের বিভিন্ন স্থান দখল করে অন্তত ৪৮ জন স্থাপনা গড়ে তুলেছে।

এক দশকে ক্ষতি আড়াই হাজার কোটি টাকা : এক দশকের জলাবদ্ধতায় চট্টগ্রামের ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি হয়েছে ২ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা। চট্টগ্রাম চেম্বারের সহায়তায় পরিকল্পনা কমিশনের ন্যাশনাল রিলিজিয়াস প্রোগ্রাম (এনআরপি) ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) যৌথ উদ্যোগে জলাবদ্ধতার ক্ষতি নিয়ে জরিপ পরিচালনা করে।

বিশেষ করে চট্টগ্রামের বৃহৎ ব্যবসাকেন্দ্র খাতুনগঞ্জ-চাকতাই-কোরবানিগঞ্জের ব্যবসার ক্ষতি নিরূপণে জরিপ করা হয়। এতে বলা হয়, এ তিন ব্যবসাকেন্দ্রের পাঁচ হাজার প্রতিষ্ঠান জলাবদ্ধতায় সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

চট্টগ্রাম চেম্বার সভাপতি মাহবুবুল আলম বলেন, জরিপে ব্যবসায়িক ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে। জলাবদ্ধতার কবল থেকে এ ব্যবসাকেন্দ্রের ব্যবসায়ীদের রক্ষা করতে তারা বিভিন্ন সময় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন। কিন্তু কোনো কাজই হয়নি।

৫ হাজার ৬১৭ কোটি টাকার প্রকল্পের গতিও মন্থর :

নগরবাসীকে জলাবদ্ধতার হাত থেকে রক্ষা করতে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক) মেগা প্রকল্প গ্রহণ করে। ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’ শীর্ষক ৫ হাজার ৬১৭ কোটি টাকার প্রকল্পটি ২০১৭ সালে অনুমোদন দেয় জাতীয় অর্থনৈতিক কমিটি (একনেক)। সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত ছিল এ প্রকল্পের মেয়াদ। ২০১৮ সালে প্রকল্পের বাস্তবায়ন শুরু হয়। নির্দিষ্ট মেয়াদে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রকল্পের মেয়াদ দুই দফায় বাড়িয়ে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়েছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, এরই মধ্যে প্রকল্পের ৫০ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। চাকতাই খালসহ বিভিন্ন খালের মুখে চলছে স্লুইচ গেট বা জলকপাট নির্মাণের কাজ। প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন খালে ১৭৬ কিলোমিটার প্রতিরোধ দেওয়াল নির্মাণ করা হবে, খালের দুই পাড়ে ৮৫ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ, ৪২টি সিলট্র্যাপার (পাহাড়ি বালু আটকানোর ফাঁদ) নির্মাণ, ৫৪টি ব্রিজ-কালভার্ট নির্মাণ হবে।

অভিযোগ-পর্যাপ্ত টাকা বরাদ্দ না পাওয়া, বরাদ্দ কাটছাঁট করাসহ নানা কারণেও প্রকল্পের কাজে ধীরগতি হচ্ছে। প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে গণমাধ্যমের কাছে নানা সীমাবদ্ধতার কথা তুলে ধরেছেন সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেডের লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. শাহ আলী। তিনি বলেন, প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নে চউককে অর্থ বরাদ্দের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।