নিউজটি শেয়ার করুন

মুসলিমের কাঁধে চড়ে হিন্দু নারীর শেষযাত্রা

সিপ্লাস প্রতিবেদক:  হিন্দু—মুসলিম ভেদাভেদ ভুলে গিয়ে মানবধর্মকে লালন করার কথা বলেছেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম।‘ছুৎমার্গ’ (১৯২২) প্রবন্ধে তিনি লিখেছেন, ‘হিন্দু হিন্দু থাক, মুসলমান মুসলমান থাক, শুধু একবার মহাগগনতলের সীমাহারা মুক্তির মাঝে দাঁড়াইয়া-মানব। তোমার কণ্ঠে সেই সৃষ্টির আদি-বাণী ফুটাও দেখি আমার মানুষ ধর্ম।’ এমন দৃশ্যের অবতারণ হয়েছে করোনা মহামারীর আবির্ভাবে।

করোনায় মৃত্যু যেন অনেক কিছু বুঝিয়ে দিল মানুষকে। পত্রিকার পাতায় নিত্য দেখি, অসুস্থ রোগীকে চরম অবহেলা, পরিবার ভয়ে ফেলে রেখে চলে যায়, রোগীর পরিচয় দিতে চায় না। এ কারণে রোগীকে রোগাতঙ্ক গ্রাস করে, তারা রোগ লুকিয়ে রাখে। এ ছাড়া নানা অবহেলা, নিপীড়নের অসহনীয় সত্য কাহিনি থাকে প্রতিদিনের বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায়।

যে যত বড় শত্রু হোক না কেন, মৃতদেহের সঙ্গে কোনো শত্রুতা নেই। সব ধর্মের মানুষ তাঁর মৃত্যুর পরে সেই রীতি অনুযায়ী পরিপূর্ণ মর্যাদার সঙ্গে দাফন ও সৎকার পাবে। কিন্তু করোনার ব্যাপারটা যেন পুরোই আলাদা। এ রোগে শারীরিক যন্ত্রণার চেয়ে মানসিক যন্ত্রণা কোনো অংশে কম নয়। কারণ, শুধু আক্রান্ত ব্যক্তি নন, তাঁর পরিবারের লোকজন সমান রকম যন্ত্রণা ভোগ করেন। যদি দুর্ভাগ্যক্রমে মারা যান ওই ব্যক্তি, তবে তাঁর দাফন ও সৎকার নিয়ে দুশ্চিন্তার যেন শেষ নেই বাকিদের।

এমনকি পরিবারের পক্ষ থেকে বহু কষ্টে লাশ তাঁর নিজ এলাকায় নেওয়ার পরও কবরের জায়গা হয়নি, স্থানীয় লোকজন বাধা দিয়েছে। শুধু তা–ই নয়, নানা নিগ্রহ-নিপীড়নের সম্মুখীন হতে হচ্ছে ভুক্তভোগী পরিবারকে। এ রকম নয় যে এটা শুধু নিম্নবিত্ত-অশিক্ষিত লোকজনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তা থেকে শুরু করে অনেক শিক্ষিত মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির ক্ষেত্রেও অনেক জায়গাতেই লাশ দাফন করতে দেওয়া হয়নি। প্রশাসনের হস্তক্ষেপে কাজ সমাধা হয়েছে।

তারই ধারাবাহিকতায় চট্টগ্রামে গত শুক্রবার (৭ মে) নিজের ফেসবুক টাইমলাইনে দেয়া ওই পোস্টে নিরুপম দাশ নিজের অনুভূতি তুলে ধরেছেন ঠিক এইভাবে— ‘গতকাল আমার মাকে (পিসিকে তিনি মা সম্বোধন করেছেন) গোসল করাইছে, কাপড় পরাইছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জামে মসজিদের পাশের একটা রুমে খালারা। লাশ বহন করেছে, পুরো দাহ করার সময় উপস্থিত ছিলেন দুই জন হুজুর। সন্ধ্যা থেকে রাত সাড়ে ৩ টা পর্যন্ত সঙ্গে ছিলেন তারা। যেখানে আমাদের আত্মীয়-স্বজন ছিলেন না, সেখানে তারা দুইজন অন্য ধর্মের হয়েও সাথে ছিলেন। আমার সহকারীসহ। আল মানাহিল ফাউন্ডেশনের প্রতি কৃতজ্ঞতা।’

তিনি আরও বলেন, বৃহস্পতিবার বিকালে মা ও শিশু হাসপাতালে করোনা বিভাগে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এরপর থেকে লাশ সৎকার পর্যন্ত কিছু হুজুর আমাদের সাথে ছিলেন। আমাদের পিসিমাকে রাত সাড়ে তিনটায় বোয়ালখালীর উত্তর ভূষিতে আমাদের বাড়িতে সৎকার করেছি।

শুধু আল মানাহিল ফাউন্ডেশন নয় এমন কাজ করেছেন গাউছিয়া কমিটি বাংলাদেশও। পরিবারের কাউকে ছাড়াই এমন অনেক লাশ তারা করোনাকালে দাফন করেছেন। লাশের পরিচয় বা ধর্ম জানলে তারা সেই অনুযায়ী দাফন করেছেন এমন উদাহরণও চট্টগ্রামে দেখিয়েছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আল মানাহিল ও গাউছিয়া কমিটি বাংলাদেশ।

স্বজন ছাড়াই অন্য ধর্মের লাশের শেষকৃত্যে অংশ নিয়েছেন আল মানাহিল সংগঠনের সদস্য আসাদুল্লাহ, ইসমাইল ও আবদুল্লাহ। তারা তিনজনই মাদ্রাসায় পড়ালেখা করছেন। মাদ্রাসা বন্ধ থাকায় এখন আল মানাহিল টিমের স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করছেন তারা।

আল মানাহিল সংগঠনের চেয়ারম্যান হেলাল উদ্দীন সিপ্লাসকে বলেন, ‘করোনার এই দুর্যোগে আমরা মানুষের পাশে আছি। আমরা আজ পর্যন্ত ৯৬ জন হিন্দু, বৌদ্ধ খ্রিষ্ঠানের সৎকার করেছি। তার মধ্যে ২০৯৭ জন মুসলিমের দাফন কাফনের কাজ করেছি।