নিউজটি শেয়ার করুন

চট্টগ্রামের হিজড়ারা শিক্ষা ক্ষেত্রে এখনো বঞ্চনার শিকার: সমাজের মানসিকতা বদলানো জরুরী

স্বরূপ ভট্টাচার্য: বাংলাদেশ সরকার হিজড়াদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিলেও চট্টগ্রামের হিজড়ারা শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রে এখনো বঞ্চনার শিকার হচ্ছে। সমাজের বেশীরভাগ মানুষের মানসিকতা পরিবর্তন না হওয়ায় শিক্ষা ক্ষেত্রে এই অবহেলা বলে মনে করছেন চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় বসবাসকারী হিজড়া এবং তাদের জন্ম দেয়া পিতা মাতারা।

এ প্রসঙ্গে নগরীর আন্দরকিল্লা এলাকায় বসবাসরত এক হিজড়ার(সঙ্গতকারণে নাম গোপন রাখা হলো) মা আলেয়া বেগম বলেন, আমার ছেলে জন্ম নেয়ার ৬/৭ বছর পর তার ভিতরে মেয়েলী আচরণ লক্ষ্য করি। এরপর আমরা তাকে লেখা পড়া করার জন্য নগরীর একটি স্কুলে ভর্তি করাই। কিন্তু স্কুলের সহপাঠি থেকে শুরু করে সহপাঠিদের অভিভাবক এমনকি স্কুলের শিক্ষকরা তাকে কটাক্ষ করে বিভিন্ন রকম মন্তব্য করলে প্রাইমারী স্কুলের লেখাপড়া শেষ না করে সে স্কুল ত্যাগ করে।

পরে তার বয়স ১৩/১৪ হলে পাড়ার লোকজন আর পরিবারের লোকজনের বিভিন্নরকম বিরুপ আচরণে অতীষ্ঠ হয়ে সে বাড়ি থেকে পালায়। চলে যায় এক গুরুমার কাছে। এখন সে ওদের সাথে থাকে বিভিন্ন জনের কাছে হাত পাতে। সন্তানের এই অবস্থা দেখে খারাপ লাগে কিন্তু সবাইতো আর মেনে নেয়না।

আলেয়া বেগম বলেন, সমাজের লোাকজনের মানসিকতা পরিবর্তন হলে আমরা ছেলেকে নিজের কাছে রাখতে পারতাম। পড়ালেখাও করাতে পারতাম। আর লেখাপড়া শিখলে সে আমাদের বোঝা না হয়ে বরং আমাদের সম্পদ হতে পারতো।

এদিকে চট্টগ্রামের সমাজ সেবা অধিদপ্তরের কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা যায়,সমাজে বৈষম্যমূলক আচরণের শিকার এ জনগোষ্ঠীর পারিবারিক, আর্থসামাজিক, শিক্ষা ব্যবস্থা, বাসস্থান, স্বাস্থ্যগত উন্নয়ন এবং সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ সর্বোপরি তাদেরকে সমাজের মূল স্রোতধারায় এনে দেশের সার্বিক উন্নয়নে তাদেরকে সম্পৃক্তকরণের লক্ষ্যে সরকার এ কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, পটুয়াখালী, খুলনা ,বগুড়া এবং সিলেট জেলায় বসবাসরত হিজড়াদের জীবনমান উন্নয়নে ২০১৯-২০ অর্থ বছরে মোট ৫ কোটি ৫৬লাখ টাকা বরাদ্ধ দিয়েছে সরকার। তবে চট্টগ্রামের হিজড়াদের জন্য আলাদাভাবে বরাদ্ধ কত তা জানাতে পারেনি সমাজসেবা অধিদপ্তর। 

তবে লেখাপড়ার জন্য হিজড়াদের অনুদান দেয়া হয় এমন খবর জানেন না বলে জানান মনি, দিয়া, নুপুর, নিপাসহ বেশ কয়েকজন তরুণ হিজড়া। তারা বলেন, সরকার যদি আমাদের লেখাপড়ার জন্য আলাদা স্কুল করতো কিংবা সহায়তা করতো তাহলে আমাদের লেখাপড়া ছাড়তে হতোনা।

তারা আরো বলেন, শুধুমাত্র লেখাপড়া না শেখার কারনেই বেশির ভাগ হিজড়াই কোনো সম্মানজনক জীবিকায় নেই, ভিক্ষা ও তোলা তাদের মূল পেশা। কেউ কেউ আবার যৌনকর্মকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছে।

যদিও তারা এ অবস্থার জন্য সমাজের মানুষের মানসিকতাকেই দায়ী করেছেন। বিভিন্ন কাজে তাদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তোলাসহ সহজ শর্তে ঋণ দিয়ে পুনর্বাসনেরও দাবি জানিয়েছে তারা।

উল্লেখ্য, সরকার ২০১৩ সালে হিজড়াদের ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তাদের ভোটাধিকারও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তারপরও সমাজে তাদের অবস্থানের তেমন কোনো পরিবর্তন ঘটেনি। সমাজে তারা প্রতিনিয়ত তুচ্ছতাচ্ছিল্যের শিকার হয়। নিজ পরিবারেও তারা অচ্ছুত ও অনাদৃত। বাংলাদেশের উত্তরাধিকার আইন এখনো নারী-পুরুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কারণে তারা সম্পত্তির উত্তরাধিকার হতে পারে না।