নিউজটি শেয়ার করুন

কারা কক্ষে মিলল অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার নির্মাতা জন ম্যাকাফির মৃতদেহ

কারা কক্ষে মিলল অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার নির্মাতা জন ম্যাকাফির মৃতদেহ
ছবি: রয়টার্স

সিপ্লাস ডেস্ক: যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণের সিদ্ধান্ত আসার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে কারা কক্ষে মিলল অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার নির্মাতা জন ম্যাকাফির মৃতদেহ।

স্পেনের পুলিশ কর্তৃপক্ষ বলছে, ‘অ্যান্টিভাইরাস গুরু’ নিজেই তার ‘জীবনাবসান ঘটিয়েছেন’। ম্যাকাফির বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর।

কারা চিকিৎসকরা তাকে বাঁচানোর সবরকম চেষ্টা করলেও সফল হননি বলে কাতালান বিচার বিভাগের বারত দিয়ে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে বিবিসি।

বিবৃতিতে বিচার বিভাগ বলেছে, ‘সব আলামত ইঙ্গিত করে’ ম্যাকাফি নিজেই তার জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়েছেন।

তার আইনজীবী হাভিয়ের ভিলালবা’র বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, নয় মাসের করাবাসে অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যারের এই অগ্রদূত হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কারা কক্ষে গলায় ফাঁস দিয়ে জীবনের ইতি টানেন তিনি।

জীবনের বেশিরভাগ সময় বিতর্কের মধ্যে থাকা জন ম্যাকাফি বিশ্বের প্রথম বাণিজ্যিক অ্যান্টি-ভাইরাস সফটওয়্যার উদ্ভাবন করেন। রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে তাকে বর্ণনা করেছে “লার্জার দ্যান লাইফ সফটওয়্যার মুঘল” হিসেবে।

ম্যাকাফির হাত ধরেই বহু বিলিয়ন ডলারের অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার শিল্পের সূচনা হয়। এক পর্যায়ে প্রযুক্তি জায়ান্ট ইনটেলের কাছে ৭৬০ কোটি ডলারের বেশি মূল্যে তিনি ‘ম্যাকাফি অ্যাসোসিয়েটস ইনকর্পোরেটেড’ বিক্রি করে দেন।

গত বছরের অক্টোবর মাসে তুরস্কগামী একটি ফ্লাইটে ওঠার সময় জন ম্যাকাফি স্পেনে গ্রেপ্তার হন। বিভিন্ন কনসালটেন্সি, বক্তৃতা থেকে আয়, ক্রিপ্টোকারেন্সি এবং নিজের জীবন কাহিনীর স্বত্ত বিক্রি থেকে বহু কোটি ডলার আয় করার পরও চার বছরের ট্যাক্স রিটার্ন জমা না দেওয়ার অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ অভিযোগ আনে, ম্যাকাফি বেনামে ব্যাংকে এবং ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ অ্যাকাউন্টে তার আয় জমা রাখার মাধ্যমে কর এড়িয়েছেন। পাশাপাশি, তার বিরুদ্ধে বেনামে একটি ইয়ট এবং স্থাবর সম্পত্তিসহ বিভিন্ন সম্পদ গোপন রাখার অভিযোগ ছিল।

গত মাসে আদালতে শুনানির সময় ম্যাকাফি বলেন, তার যা বয়স, যদি দোষী প্রমাণিত হন, তাহলে সম্ভবত বাকি জীবন তাকে কারাগারেই কাটাতে হবে।

“আমি আশা করি স্পেনের আদালত এ বিষয়টি আমলে নেবে যে, মার্কিন বিচার বিভাগ আমাকে জেলে পুরে একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করতে চাইছে”, আদালতে বলেছিলেন ম্যাকাফি।

শেষ পর্যন্ত স্পেনের শীর্ষ আদালত বুধবার সকালে তাকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রত্যর্পণের অনুমোদন দেয়।

স্প্যানিশ সংবাদপত্র এল পাইস বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ম্যাকাফি বারবার দাবি করেছেন, তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র চলছে। তবে, আদালত বলেছে, রাজনৈতিক বা আদর্শগত কারণে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হচ্ছে এমন কোনো নজির নেই।

ইংল্যান্ডের গ্লস্টারশায়ারে জন্ম নেওয়া এই প্রযুক্তি উদ্যোক্তা খ্যাতির আলোয় আসেন গত শতকের আশির দশকে যখন তিনি ম্যাকাফি ভাইরাসস্ক্যান তৈরি ও প্রকাশ করেন।

কম্পিউটার নিরাপত্তার পথিকৃৎ হলেও বিবিসির সঙ্গে সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেছিলেন যে, তিনি নিজের কম্পিউটারে নিজের বা অন্য কারো তৈরি কোনো অ্যান্টিভাইরাস সফটওয়্যার কখনো ব্যবহার করেননি।

বিবিসির সঙ্গে আলাপে ২০১৩ সালে তিনি বলেন, “আমি ক্রমাগত আমার আইপি (ইন্টারনেট প্রোটোকল) ঠিকানা বদলাই, কোনো ডিভাইস ব্যবহার করলে তার সঙ্গে আমার নাম যুক্ত করি না এবং ভাইরাস আক্রান্ত হওয়ার ভয় আছে এমন সাইটে না গিয়ে নিজেকে রক্ষা করি।”

“ধরা যাক, পর্ন সাইট, আমি এই সাইটগুলোতে কখনোই যাই না।”

তিনি ২০১৬ এবং ২০২০ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে লিবারেটারিয়ান দলের প্রার্থী হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করেন।

খ্যাপাটে চরিত্রের ম্যাকাফি ২০১৯ সালে টুইট করে বলেন, তিনি আট বছর ধরে ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করেননি কারণ, “কর অবৈধ”।

একই বছর তাকে ডোমিনিকান প্রজাতন্ত্রে অস্ত্র আনার অভিযোগে সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য আটক করা হয়েছিল।

জন ম্যাকাফি কিউবাকে সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিলেন ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহারের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য অবরোধ এড়াতে।

নিজেকে ৪৭ সন্তানের জনক দাবি করা ম্যাকাফি বেশ কয়েক বছর বেলিজেও বসবাস করেন। ২০১২ সালে একজন প্রতিবেশীকে খুনের অভিযোগে পুলিশ তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে চাইলে সেখান থেকে তিনি পালিয়ে যান। অবশ্য পুলিশ পরে জানিয়েছিল, তিনি সন্দেহভাজন ছিলেন না।

স্ত্রী জেনিস ম্যাকাফির সঙ্গে তার পরিচয় যখন হল, তখন তিনি পলাতক জীবন যাপন করছেন। জেনিস একজন দেহ পসারিণী হিসেবে তার সঙ্গী হন- এমনটাই জানিয়েছিলেন ম্যাকাফি।

এক টুইটে জেনিস ম্যাকাফি রোববার লিখেছিলেন, “এখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসন সিদ্ধান্ত নিয়েছে কারাবন্দি থেকেই জনকে মৃত্যুবরণ করতে হবে। তাদের সরকারি সংস্থাগুলোর ভেতরের দুর্নীতি নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার পরিণাম কী হতে পারে, সে বিষয়ে উদাহরণ সৃষ্টি করতেই এমন পদক্ষেপ নিয়েছে তারা… আমেরিকায় কখনোই একটি নিরপেক্ষ বিচার পাওয়ার কোনো আশা তার নেই।”

ম্যাকাফি টুইটারে ছিলেন নিয়মিত, সেখানে তার ১০ লাখ অনুসারী ছিল। অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তাকে অনেকে অনুসরণ করতেন।

২০১৩ সালে তিনি একটি ভিডিও পোস্ট করেন ইউটিউবে, যেখানে তার নামযুক্ত সফটওয়্যারটি কম্পিউটার থেকে মুছে ফেলার কঠিন প্রক্রিয়া নিয়ে পরিহাস করা হয়।

১৮ জুন টুইটারে পোস্ট করা তার সবশেষ বার্তায় ম্যাকাফি লেখেন: “সব ক্ষমতাই দুর্নীতিযুক্ত। একটি গণতন্ত্রকে যে ক্ষমতা পরিচালনা করার অনুমতি দেবেন, সেটার যত্ন নিন।”

বিশ্বে ক্রিপ্টোকারেন্সির পক্ষে সমর্থন যুগিয়ে যাচ্ছেন এমন অনেকেই বুধবার ম্যাকাফির মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করে টুইট করেছেন।