নিউজটি শেয়ার করুন

ওয়াসার পানি নিয়ে বাণিজ্য; ওয়াসার লস, ‘সিন্ডিকেটের’ পকেট ভারি

শাহরুখ সায়েল: নগরীর ইপিজেড এলাকায় ওয়াসার আবাসিক পানির সংযোগ নিয়ে বাণিজ্যিকভাবে পানি বিক্রির অবৈধ ব্যবসা করছেন ইপিজেড এলাকার কিছু ওয়াসার গ্রাহক। শুধু তাই নয়, এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে খোদ ওয়াসার কর্মচারী। ওয়াসার কর্মচারির সহযোগিতায় সেখান থেকে প্রতিমাসে চট্টগ্রাম ওয়াসার লস হচ্ছে কয়েক লাখ টাকা।
বাসাবাড়ির ওয়াসার লাইন থেকে রাস্তার পাশে অবৈধ সংযোগ টেনে বা মিনারেল ওয়াটারের জন্য অনুমোদন নিয়ে সহজেই চালানো হচ্ছে এ ব্যবসা। আর এ ব্যবসা পরিচালনার জন্যে ওয়াসার অসাধু কর্মচারিদের ম্যানেজ করতে পারলেই মেলে এ অবৈধ ব্যবসার অনুমোদন!
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইপিজেড এলাকার নিউমুরিং তক্তারপোল, তিন রাস্তার মোড়, মাইলের মাথা, ব্যারিস্টার কলেজ, আবদুল মাবুদ সওদাগরের বাড়ির পাশে, বন্দরটিলা জালাল প্লাজা, চক্ষু হাসপাতালের পাশে, সিটি ব্যাংকের পাশে, নেভী হাসপাতাল গেইট, আকমল আলি রোড, রেইনবো কমিউনিটি সেন্টার, নারিকেল তলা, এস আলম ও বি আলম গলিসহ আরও ১০-১২ স্পটে চলে এ অবৈধ পানি বিক্রির ব্যবসা।
স্থানীয়রা জানান, অসাধু কিছু গ্রাহক ওয়াসার আবাসিক সংযোগ নিয়ে ড্রাম প্রতি ১৫-২০ টাকা করে বিক্রি করে দেয় ভ্যানগাড়ির পানি ব্যবসায়ীদের কাছে। আর সেই পানিই বিভিন্ন এলাকার বাসা-বাড়িতে বিক্রি হয় ২৫-৩০ টাকা ড্রাম দরে।
বন্দরটিলা এলাকার পানি বিক্রির সাথে জড়িত সাত্তার বলেন, ‘প্রতি ছোট ড্রাম পানি ১৫ টাকা করে নেয়া হয়। একটি ভ্যানে ১৫টি ড্রাম রাখা যায়। অনেক ভ্যানে ধরে ২০টি। দৈনিক ৮০ থেকে ১০০টি ভ্যানে বিক্রি হয় পানি। কখনো কখনো দেড় শ’ বা দুই শ’ ভ্যানও বিক্রি হয়।’
ড্রামপ্রতি ১৫ টাকা হিসেবে একজন বিক্রেতা প্রতিদিন বিক্রি করে অন্তত ২২ হাজার ৫০০ টাকার পানি। এ হিসাবে প্রতিদিন এ এলাকায় বিক্রি হয় অন্তত ২২ লাখ ৫০ হাজার টাকার পানি। মাসে টাকার অঙ্ক হিসেব করলে দাঁড়ায় ৬ কোটি ৭৫ লাখে। আবার, প্রতি জারে ২০ লিটার হিসেবে একজন বিক্রেতাই প্রতিদিন বিক্রি করে অন্তত ৩০ হাজার লিটার পানি। এক স্পটে একশ’ ভ্যানগাড়ির কাছে পানি বিক্রি করলে পনেরোটি স্পটের হিসেবে দৈনিক বিক্রি হয় চার লাখ ৪৫ হাজার লিটার পানি। মাসে যার পরিমাণ দাঁড়ায় এক কোটি ৩৫ লক্ষ লিটারে।
পানি বিক্রির সাথে জড়িত আরেক ব্যবসায়ী বলেন, ‘আমরা জানি এটা অন্যায়। কিন্তু করা যাচ্ছে বিধায় করছি। বলতে হলে ওয়াসাকে বলেন। আমাদের বলে লাভ আছে কোন?’
ওয়াসা সূত্র বলছে, ওয়াসার আবাসিক লাইনের প্রতি হাজার লিটার (এক ইউনিট) পানির বিল প্রায় বারো টাকা ৪০ পয়সা এবং বাণিজ্যিক লাইনের ইউনিট প্রতি পানির বিল ত্রিশ টাকা ৪০ পয়সা। আবাসিক সংযোগ নিয়ে বাণিজ্যিক কার্যক্রম চালানো সম্পূর্ণ অবৈধ। এর ফলে সরকার বছরে হারাচ্ছে কোটি কোটি টাকার রাজস্ব।
ইপিজেড এলাকায় এ অবৈধ ব্যবসা যেন এখন ‘ওপেন সিক্রেট ’। সবাই সবকিছু জেনেও কোনো প্রকার ব্যবস্থা নিচ্ছে না। একদিকে ওয়াসার পানির জন্য হাহাকার এলাকাজুড়ে, অন্যদিকে এরা পানি অবৈধভাবে বিক্রির ব্যবসা করছে দীর্ঘদিন ধরে।— এমন অভিযোগ করেন স্থানীয়রা।
এ ব্যপারে চট্টগ্রাম ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ কে এম ফজলুল্লাহ সিপ্লাসকে বলেন, ওয়াসা সংযোগ আবাসিক কিংবা অনাবাসিকভাবে নিয়েও পানি বিক্রি সম্পূর্ণ অবৈধ এবং গুরুতর অপরাধ।
ইপিজেড-পতেঙ্গার ওদিকে পানি সংকট থাকায় অনেকেই এই অবৈধভাবে পানি বিক্রির ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন, যা আমরা জানতে পেরেছি। প্রায়ই ওদিকে অভিযান চালানো হয়।
তিনি বলেন, ‘পানি বিক্রির জন্য কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আলাদা পারমিশন নিতে হবে। বিভিন্ন সময়ে আমাদের ম্যাজিস্ট্রেট অভিযান পরিচালনা করছে।। কিন্তু ম্যাজিস্ট্রেট অভিযানে গেলে দেখা যায় এগুলোর অস্তিত্ব থাকেনা।’
পানি বিক্রির বিষয়টি স্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমি অভিযোগ পেয়েছি যে ওখানে ড্রামে করে ওয়াসার পানি বিক্রি হয়। আমাদের প্লান আছে ওদিকে পানির সরবারাহ বাড়াবো, বেশিদিন লাগবে না। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রমাণ পেলে আমরা আইনগত ব্যবস্থা নিব। অবৈধ ব্যবসা বন্ধে সর্বোচ্চ চেষ্টা করবো। আমি ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়মিত অভিযান চালানোর জন্য বলবো। প্রমাণ পেলে মামলা করবে।