cplusbd

নিউজটি শেয়ার করুন

মিয়ানমারের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের প্রহসন

1st Image

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধুরী (২০১৮-১২-০৪ ০৮:০৭:৪০)

১০ জন রোহিঙ্গা মুসলমানকে রোহিঙ্গা স্থানীয় বৌদ্ধরা এবং মিয়ানমারের সৈন্যরা হত্যা করে একই কবরে দাফন করেছিল, দাফনের সময় তখনও একজন জীবিত ছিল তাকেও কবরে মাটির নিচে দাফন চাপা দেওয়া হয়। এই ঘটনা ২০১৭ সালে দুইজন বার্মার অধিবাসী যাঁরা বিখ্যাত সংবাদ সংস্থা রয়টারের সাংবাদিক ছিলেন পুংখানুপুংখরূপে তদন্ত করে সংবাদটি প্রকাশ করেন। মিয়ানমার সরকার “রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ভঙ্গের দায়ে তাদেরকে গ্রেপ্তার করে। আদালত বিচার করে।“রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা” ভঙ্গের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে ৭ বৎসরের সশ্রম কারাদন্ড দিয়েছিলেন। এই সত্য ঘটনাটি যদি মিয়ানমারের “রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা” হয় তাহলে বর্তমান বিশ্বে ‘মানবাধিকারের’ কি বেহাল অবস্থা চলছে তা সহজেই অনুমেয়।মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী দন্ডিত করার জন্য  এই একটি ঘটনা কি যথেষ্ট নয়? অথচ বাস্তবতা হলো এর থেকে আরও জঘন্য ঘটনা সংগঠিত হলেও মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব নয়। কারণ একটা নয়, বিশ্বের দু’টো পরাশক্তি এর থেকে আরও জঘন্য ঘটনা ঘটলেও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগ করে মিয়ানমারকে রক্ষা করবে। বিশ্বে দু’টি ভেটো ক্ষমতা সম্পন্ন দেশ যদি মিয়ানমারের পক্ষে কাজ করে সমস্ত রোহিঙ্গা মুসলমানদেরকে এক সাথে হত্যা করলেও এই জাতিসংঘ মিয়ানমারের কেশাগ্র স্পর্শ করতে পারবেনা। এই যদি অবস্থা হয় জাতিসংঘ নামের এই সংস্থার কি বা প্রয়োজন আছে? যে দেশের আদালত ১০ জন জ্যান্ত মানুষকে হত্যা করে একই কবরে দাফন করার ঘটনাটিকে “রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা” বলে আখ্যায়িত করতে পারে এবং বিশ্বের দু’টি পরাশক্তি এই দেশকে রক্ষা করার জন্য জাতিসংঘে ভেটো প্রয়োগ করার জন্য প্রস্তুত থাকতে পারে, সে বিশ্বে সভ্য মানুষের বসবাস করার কোন পরিবেশ থাকতে পারে কিনা কা ভাববার বিষয়।

 গত ১৫ই নভেম্বর রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার অংশ হিসাবে ১৫০ জনের প্রথম দলটি মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তাহীনতার আশংকায় রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে অস্বীকার করে। সে জন্য রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কর্মসূচী স্থগিত করা হযেছে। বাংলাদেশ সরকার এবং জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা শত চেষ্টা করেও রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরৎ যেতে রাজি করানো  সম্ভব হয় নাই। সরকারের উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তা রোহিঙ্গাদের আনতে ক্যাম্পে গেলে ‘ন যাইয়ুম, ন যাইয়ুম’ বলে তারা শ্লোগান দিতে থাকে। গত বৎসরের আগস্ট মাস থেকে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্যাতনে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা। এছাড়া আগে পালিয়ে আসা ও বর্তমান আসা উখিয়া, টেকনাফের ৩০ টি ক্যাম্পে অবস্থান করছে প্রায় ১১ লাখের বেশী রোহিঙ্গা শরণার্থী। ২০১৮ সালে ফেব্রুয়ারীতে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে মিয়ানমার বাংলাদেশের মধ্যে জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ  নামে সমঝোতা স্মারক সই হয়। এরপর প্রথম ধাপে 8 হাজার জনের তালিকা থেকে ৫ হাজার ৫০০ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ছাড়পত্র দেওয়া হয়। সে তালিকা থেকেই গত বৃহস্পতিবারে ১৫০ জন ফিরে যাওয়ায় যে ব্যবস্থা করা হয়েছিল তার একজনও যেতে রাজী হয় নাই। এখন রোহিঙ্গারা শ্লোগান দিচ্ছে “এখন আমর ফিরব না, স্বদেশে জায়গা জমি ফেরৎ চাই” ইত্যাদি।

    মিয়ানমার  কর্তৃপক্ষ  রোহিঙ্গাদের ফেরৎ যেতে যে পরিবেশ সৃষ্টি করা দরকার  তার কিছুই করে নাই। বরং যেসব মিয়ানমারের জেনারেল এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা রোহিঙ্গাদের উপর বিভিন্ন অমাণবিক নির্যাতন চালিয়েছে তারা এখনও বহাল তবিয়তে নিজ নিজ পদ অলংকৃত করে আছে। পর্যবেক্ষণে বিন্দুও  কমে নাই বরং কোন কোন ক্ষেত্রে বেড়েছে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বের ব্যাপারে কোন ব্যবস্থারই গ্রহণ করা হয় নাই। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের মতে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক নয়, তাই যদি হয় তাহলে তারা মিয়ানমারে যাবেই বা কেন ? সে জন্য সব কিছুর আগে বিশ্বের পরাশক্তিরা জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের বৈঠকে ডেকে মিয়ানমারের সরাসরি বক্তব্য নেওয়া উচিত যে রোহিঙ্গারা কেন মিয়ানমারের নাগরিক নয় ? যদি বৈঠকে সাব্যস্ত হয় যে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিক তাহলে নাগরিকত্বের সমস্ত প্রাপ্য সুযোগ সৃষ্টি দিয়ে মিয়ানমারে তাদেরকে ফেরৎ নিতে হবে। আর যদি সাব্যস্ত হয় যে তারা মিয়ানমারের নাগরিক নয় তাহেল বিশ্বের নেতৃত্বেযারা আছেন তারা অন্যভাবে সিদ্ধান্ত নিবেন। কিন্তু একটি মানবিক সমস্যা নিয়ে বিশ্বের পরাশক্তিদের মধ্যে ভূ-রাজনীতি শুরু হবে, একটা মানবিক ব্যাপারেও সুষ্ঠু একটি সামাধানে না পৌঁছে পরাশক্তিগুলি নোংরা রাজনীতি শুরু করবে। এই দুঃসহ অবস্থা সমস্ত মানবজাতির জন্য কলংকস্বরূপ। বিশ্বের কোন দেশ একথা অস্বীকার করতে পারবেনা, মিয়ানমারে রোহিঙ্গা মুসলমানদের উপর এমন কোন জঘন্য অত্যাচার নাই যা করা হয় নাই এবং প্রত্যেকটা অপরাধে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ অফিসারেরা জড়িত ছিল। আজকে বিশ্বের পরাশক্তিগুলি যদি একতাবদ্ধ হয়ে শুধু একটি ঘোষণা দেন যে বিশ্বের মানবতা যেখানেই বিপন্ন হবে, সেখানেই বিশ্বের পরাশক্তিগুলি ঐক্যবদ্ধভাবে ব্যবস্থা নিবে। শুধু এরকম একটি বিশ্বাসযোগ্য ঘোষণা সারা বিশ্বে শান্তির সু-বাতাস বইতে আরম্ভ করবে। আজকে উগ্রবৌদ্ধ বাদীরা মিয়ানমারের সর্বত্র রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সভা সমাবেশ  করে যে উত্তেজনা , হিংসা, বিদ্বেষ প্রকাশ্যে ছড়াচ্ছে তা মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এই পর্যন্ত বন্ধ করেন নাই। জাতিসংঘের প্রাক্তণ সেক্রেটারী জেনারেল কপি আনান অক্লান্ত পরিশ্রম করে রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করার জন্য যে পরিকল্পনা দিয়েছিলেন তা বাস্তবায়ন করা দূরে থাক মিয়ানমার আনান কমিশনের পরিকল্পনার কপিটা সংরক্ষণ করেছে কিনা তাতেও সন্দেহ আছে।অনেক্য স্থায়ী করারই প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

গত ৮ ই নভেম্বর মিয়ানমার বৈদেশিক মন্ত্রণালয়ের দাবী বাংলাদেশ যে ৬৪৭২ জন রোহিঙ্গা স্মরণার্থীর লিষ্ট পাটিয়েছেন তাতে ৫৪ জন সন্ত্রাসিী রয়েছে। কিন্তু তিনি ঐসব সন্ত্রাসীরা কোন ধরণের সন্ত্রাস করেছে বা কোথায় সন্ত্রাস করেছে এসবের কোন বর্ণনা দেন নাই। এইভাবে মিয়ানমার সরকার সমস্ত পত্যাবাসন কর্মসূচীটাই বানচালের চেষ্টা করছে। বিভিন্ন  গবেষণা সংস্থার নামে অহরহ আলোচনা সভার আয়োজন করে রোহিঙ্গাদের সন্ত্রাসী হিসাবে চিহ্নিত করার প্রচেষ্টা চালাচ্ছে।

গত ৭ই নভেম্বর আরাকানের রাজধানী আকিয়াবে বৌদ্ধ ধর্মালম্বীরা এক বিরাট জনসভা করে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের বিরোধীতা করেছে। ইয়াঙ্গুনে অক্টোবর মাসের ১৪ তারিথ বিখ্যাত বৌদ্ধ ভিক্ষুকরা বিরাট সমাবেশে জানিয়ে দিয়েছৈ যে রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের জায়গা মিয়ানমারে হবেনা। মিয়ানমার সরকার যদি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ব্যাপারে আন্তরিক হত তাহলে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে এভাবে জনমত সৃষ্টি করতে দিতনা।

গত ৬ বৎসর ধরে ১২৮০০০ রোহিঙ্গা এবং মিয়ানমারবাসী অন্যান্য মুসলিমদেরকে আরকান অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এশিয়ার দু’একটি দেশ নিজেদের স্বার্থে মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক চাপ থেকে রক্ষা করার জন্য মিয়ানমারকে দিয়ে বাংলাদেশ থেকে এই প্রত্যাবাসনের প্রহসন শুরু করেছে। তারা মিয়ানমারকে গণহত্যার জন্য আন্তর্জাতিক আদালতে বিচার থেকে রক্ষা করতে চায়। কাজেই কয়েক হাজার রোহিঙ্গা যদি মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন করানো যায় তাহলে মিয়ানমারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ কমানো যাবে।

কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেপ্টেম্বরের ২৫ তারিখ ২০১৮ সাল জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সভায় ঘোষণা করেছেন বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদেরকে মিয়ানমারে ফেরৎ পাঠাবেনা যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের নিরাপত্তা এবং অন্যান্য মানবিক অধিকার বিশেষ করে নাগরিকত্ব নিশ্চিত না হবে। এদিকে গত শুক্রবার, ১৬ই নভেম্বর জাতিসংঘের তৃতীয় কমিটিতে গ্রহীত এক প্রস্তাবে রোহিঙ্গা নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য মিয়ানমারের নিন্দা জানানো হয়েছে। এই প্রস্তাবে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছা, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন এবং প্রত্যাবাসনের পত তাদের নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে বসবাসের উপর গুরুত্ব  আরোপ করা হয়। ইইউ ও আইসির যৌথভাবে আনীত প্রস্তাবটি উন্মুক্ত ভোটের মাধ্যমে গৃহীত হয়। ১৪২-২৬ ভোটে প্রস্তাবটি পাশ হয়। চীন, রাশিয়া ও কম্বোডিয়াসহ ১০ টি দেশ এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে ভোট দানে বিরত থাকে। ওআইসিও ইইউ  সব সদস্য রাষ্ট্র এবং যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অষ্ট্রেলিয়া ও মেক্সিকোসহ ১০৩ দেশ প্রস্তাবটি কো-স্পন্সার ও (Co-Sponsor) করে। এই প্রস্তাবে মিয়ানমারকে নিন্দা জানানো হয় এবং পাশাপাশি রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নাগরিকত্ব দেয়ার পথ তৈয়ার করতে মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।