cplusbd

নিউজটি শেয়ার করুন

“বাংলাদেশ ব্যাংকের অক্ষমতা, দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার ধসের মূল কারণ”

1st Image

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধুরী (২০১৮-১১-২১ ০২:১১:২৭)

ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপে কিছুদিন আগে বিশ্ব ব্যাংক এবং আই.এম.এফ এর বার্ষিক সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সে সভায় বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী মোহিত সাহেব যোগ দিয়েছিলেন। সেখানে আমাদের অণ্যতম প্রধান আন্তর্জাতিক ও গুরুত্বপূর্ণ সাহায্যদাতা আই.এম.এফ. বাংলাদেশের ব্যাংকিং সেক্টরে বিরাজমান বিশৃংখলা এবং উদ্বেগজনক পরিস্থিতি নিয়ে অর্থমন্ত্রীর কাছে গভীর উদ্বেগ ও উৎকন্ঠা প্রকাশ করেছেন। ইহা শুধু দেশের জন্য নয়, বিশাল অভিজ্ঞতা সম্পন্ন এবং রেকর্ড সময় ধরে অর্থমন্ত্রীর পদ অলংকৃত করার সৌভাগ্য হওয়ার পরও আই.এম.এফের মতো বিশে^র একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক সংস্থার সরাসরি অভিযোগের সম্মুখীন হওয়া নিশ্চয় তাঁর জন্য এবং বাংলাদেশের জন্য অপমানজনকই বটে। আমাদের অর্থমন্ত্রী বলেছেন, “আই.এম.এফের সাথে আমাদের সম্পর্ক খুবই ভাল। তাঁদের প্রতিনিধি ঢাকা গিয়ে বলেছেন, বাংলাদেশের আর্থিকখাত দুর্বল হয়ে পড়েছে এর প্রধান কারণ ব্যাংকখাত।” মন্ত্রী মহোদয় এই ব্যাপারে একমত এবং তাঁর কোন দ্বিমত নাই বলেও আই.এম.এফকে জানিয়েছে। ব্যাংকিংখাত নিয়ে আগামী একমাসের মধ্যে সাহেব বলেছেন। মন্ত্রীমহোদয় আরও সু-স্পষ্টভাবে বলেছেন। “বাংলাদেশের ব্যাংকগুলিতে খেলাপী ঋণ বেড়েছে এবং তারা প্রভিশনি ঠিক রাখতে পারছেনা। আই.এম.এফ. এদিকে মনোযোগ দিতে বলেছেন।” আসলে মন্ত্রী মহোদয় এবং আই.এম.এফ এর মধ্যে অনুষ্ঠিত আলোচনা সম্পর্কে দেওয়া অন্য প্রতিবেদনে দেখা যায় মন্ত্রী মহোদয়কে আই.এম.এফ এর তরফ থেকে তিনটি প্রশ্ন করা হয়েছে ১. হঠাৎ করে বাংলাদেশের আমদানী বাণিজ্য এত বাড়ল কেন ? ২. ব্যাংকগুলি এ ঋণের বিপরীতে প্রভিশন রাখতে পারছেনা কেন ? ৩. খেলাপী ঋণের নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছেনা কেন ?

এদিকে ইন্দোনেশিয়া থেকে ফিরে মাননীয় অর্থমন্ত্রী এক বিবৃতির মাধ্যমে দেশবাসীকে অবহিত করলেন দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষের নির্দ্দেশে আর ও চারটি নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স ইস্যু করা হচ্ছে। অর্থাৎ আরও চারটি নতুন ব্যাংক বর্তমান ব্যাংকের মিছিলেরসাথে যোগ হতে যাচ্ছে। তিনি বিবৃতিতে যেভাবে ঘোষণাটি দিয়েছেন তাতে পরিস্কার বুঝতে কষ্ট হয়না যে তিনি এই সিদ্ধান্তে গভীরভাবে মর্মাহত। কেননা এই বিবৃতির কয়েকদিন আগেও তিনি বলেছিলেন ব্যাংকের সংখ্যা অতিরিক্ত হয়ে গেছে সেহেতু ব্যাংকগৃলি একীভূত করে সংখ্যা কমানোর দ্রæত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কিন্তু উনাকেই আরও আরও চারটি নতুন ব্যাংককে স্বাগত জানাতে হচ্ছে।

কিছুদিন আগেও অর্থমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের আপত্তি সত্তে¡ও প্রায় 9টি নতুন ব্যাংকের লাইসেন্স রাজনৈতিক বিবেচনায় ইস্যু হয়েছিল। কিন্তু সে সব ব্যাংক এখন চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে এর মধ্যে দু’একটা ব্যাংক এমন কর্মকান্ড করেছে যাতে আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের ব্যাংকের উপর বিদেশী ব্যাংকেরও আস্থার সংকট সৃষ্টি হওয়ার উপক্রম হয়েছে। তন্মধ্যে ফার্মাস ব্যাংককে সরকারের উদ্যোগে অর্থযোগান দিয়ে ঠিকিয়ে শাখার আপ্রাণ চেষ্টা চলছে। কিন্তু অর্থমন্ত্রী একটা বিবৃতি দিয়ে তাঁর দায়িত্ব এড়াতে পারবেন বলে যদি মনে করেন তা অত্যন্ত দুভার্গ্যজনক। কারণ দু’একটা ব্যাংকের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে তন্মধ্যে মানি লন্ডারিং এর অভিযোগও রয়েছে। এসব ব্যাংক আমাদের বর্তমান খেলাপী ঋণের স্তুপকে আরও অতি দক্ষতার সহিত বাড়িয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশ ব্যাংক কেন্দ্রীয় ব্যাংক হিসাবে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে নাই। কারণ, যাঁরা এসব বেসরকারী বাণিজ্যিক ব্যাংকের পরিচালক তাঁরা খুবই প্রভাবশীল বা তাদের মধ্যে অনেকেই নিজেরাই প্রভাবসম্পন্ন রাজনীতিবিদ। তাঁদের মধ্যে অনেকেই প্রত্যক্ষভাবে ব্যাংকিং রীতিনীতি লংঘনের সাথে সরাসরি জড়িত। আসলে ব্যাংক বা ইনসুরন্স কোম্পানী ব্যবসা অণ্য সাধারণ ব্যবসার মত নয়। দেশের অর্থনীতির সাইজ অনুসারে কতটা ব্যাংক বা ইনসুরেন্স কোম্পানীর প্রয়োজন তার থেকে বেশী যদি অনুমোদন দেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে অর্থনীতিতে একটা মারাত্মক ভারসাম্য হীনতা সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন যাবৎ আমাদের অর্থমন্ত্রণালয় বাংলাদেশ ব্যাংককে সরারসি নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। মধ্যে মধ্যে মনে হয় বাংলাদেশে কোন কেন্দ্রীয় ব্যাংকই নাই। বর্তমান অর্থমন্ত্রণালয় শুরু থেকেই পরিবারিকভাবে নিয়ন্ত্রিত ব্যাংকের অনুমোদন উৎসাহিত করে আসছে। শুরু থেকেই বাংলাদেশ ব্যাংকের সুপারিশগুলি অর্থমন্ত্রণালয়ে আমলে নেয় নাই। সব সময় বর্তমান অর্থমন্ত্রণালয় রাজনৈতিক  দৃষ্টিকোণ থেকে ব্যাংকের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত দিয়েছে। পরবর্তী  কালে নানা চাপরে মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক তার স্বাধীনতা এবং স্বকীয়তা হারিয়ে অর্থমন্ত্রণালয়ের আজ্ঞাবহ সংস্থায় পরিণত হয়েছে এবং দেশের মুদ্রানীতি ও দেশের অর্থনীতির স্বার্থে নিয়ন্ত্রণ করতে চরমভাবে ব্যর্থ হয় এবয় পরিবারভিত্তি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলির কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করতেও ব্যর্থ হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশের ৫৭টি বাণিজ্যিক ব্যাংক রয়েছে যা আমাদের  অর্থনীতির জন্য অতিরিক্তই হয়েছে। এব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই। সামগ্রিকভাবে বাংলাদেলেশ অর্থনীতির অনেক উন্নতি হয়েছে। কিন্তু অর্থনীতির এই পর্যন্ত যে প্রবৃদ্ধি হয়েছে তার বন্টনটা কিভাবে হয়েছে তা না বুঝলে অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে ভুল হওযার সম্ভাবনাই রয়েছে। বর্তমান অর্থনৈতিক অবস্থা ব্যাখ্যা করলে দেখা যায় দেশের  ধনিক শ্রেণীই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সিংগভাগই ভোগ করছে। ২০১০ সালে আমাদের জনসংখ্যার নি¤œ আয়ের শতকরা ২ জন জাতীয় সম্পদের শতকরা ২ভাগ ভোগ করত কিন্তু ২০১৬  সালে এই সম্পদ কমে হয়েছে মাত্র ১.০১ শতাংশ। আর বাংলাদেশের শতকরা ১০জন ২০১০ সালে জাতীয় সম্পদের ৩৫.৮৪ শতাংশ ভোগ করত কিন্তু তা ২০১৬ এসে দাড়িঁয়েছে ৩৬.১৬ শতাংশে। বর্তমানে আরও বাড়ছে।

অল্প সংখ্যক মানুষের কাছে সম্পদ পুঞ্জুীভূত হওয়ার কারণে ব্যাংক ঋণের চাহিদা বেড়ে যায় অথচ ঋণ গ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধ করার ক্ষমতা কমে যায়। এই পরিস্থিতিতে ব্যাংকেরও এই সব দুর্বল ঋণ গহীতাদের ঋণ না দিয়ে উপায় থাকেনা। কারণ ব্যাংকেরও বঞ্চিত অর্থের উপর আমানতকারীদেরকে সুদ দিতে হয়। অর্থাৎ সম্পদ যত বেশী অল্প সংখ্যক লোকের কাছে জমা হবে তত বেশী ব্যাংকিং ব্যবস্থার ঋণ খেলাপীর সৃষ্টি হবে। ইহা শুধু আমাদের দেশের জন্য প্রযোজ্য নহে। যে দেশেই সম্পদ বন্টনে যত বেশী বৈষম্যের সৃষ্টি হবে তত বেশী সে দেশে ঋণ খেলাপীর সৃষ্টি হবে।

এই ব্যাপারে দেশের গুরুত্বপূর্ণ সংবাদপত্রগুলি অনেক প্রতিবেদন লিখেছেন যাতে বলা হয়েছে অনেক বড় বড় ঋণ খেলাপী সরকারী দলের লোক হওয়ার কারণে বাংলাদেশের পক্ষে তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়না। কাজেই ক্রমশ দেশের সম্পূর্ণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা ভেঙ্গে পড়ার অবস্থা সৃষ্টি হচ্ছে। একারণেই দেশের অর্থনীতিতে মন্দা চলছে। অর্থনীতির এই অবস্থা বেশী দিন চলতে দিলে ব্যাংকিং ব্যবস্থাই ভেঙ্ড়ে পড়বে। একবার যদি অর্থনীতি মহা-মন্দা অবস্থার সৃষ্টি হয় বা উপনিত হয় তাহলে দেশের অর্জিত উন্নয়ন ভেস্তে যাবে।

২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত খেলাপী ঋণ ১০.৪৩ শতাংশ হারে বেড়ে ৮৯,৩৪০কোটি টাকা দাড়িয়েছে বা ২০১৭ সালে জুন  পর্যন্ত  ৯.৩১ শতাংশ হারে বেড়েছিল। একটি ব্যাপারে কোন দেশেরই কোন বিকল্প নাই তা হলো সমস্ত ব্যাংক পরিচলাকদের ব্যাংকিং ব্যবস্থার উপর জ্ঞান থাকতে হবে। কারণ ব্যাংকিং ব্যবস্থা আধুনিক যুগে প্রত্যেকদেশের অর্থনীতির চালিকা শক্তি। অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তিটাই যদি অজ্ঞ লোকেরা পরিচালনা করে সেক্ষেত্রে জগাখিড়–ড়ি ছাড়া কিইবা সৃষ্টি হবে। যে হারে প্রতিবৎসর বাংলাদেশে ঋণ খেলাপী বাড়ছে তার কারণ নির্ধারণ করা এবং তা সামাধানের ব্যবস্থা নেওয়া অবশ্যই বাংলাদেশের ব্যাংকেরই দায়িত্ব। বাংলাদেশ ব্যাংকই এই ভয়াহ অবস্থার কারণ এবং তা সামাধানের জন্য কি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে তা দেশবাসীদের জানানো উচিত এবং এই পর্যন্ত তাদের ব্যর্থতার কারণগুলিও বলার প্রয়োজন। সরকার সঞ্চয়পত্রের উপর অস্বাভাবিক হারে যে সুদ দিচ্ছে তার প্রতিবাদ করাও বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে। যতক্ষণ পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক স্বাধীন ক্ষমতা নিয়ে এবং অর্থমন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করতে অক্ষম হবে ততক্ষণ পর্যন্ত ব্যাংকিং, ব্যবসায়ী এবং রাজনীতিবিদের নিয়ে যে ত্রিত্ববাদ (Trinity) সৃষ্টি হয়েছে তার অবশ্যই অবসান হতে হবে। প্রত্যেক বৎসর দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের হার বাড়ছে অথচ ব্যাংকিং ব্যবস্থার ধ্বংসের দিকে যাচ্ছে এই অবস্থা চলদে দেওয়া যায়না।

shahabuddinkhaled47@gmail.com