cplusbd

নিউজটি শেয়ার করুন

“চীনের জিনজিয়াং প্রদেশে মুসলমানদের উপর নির্যাতনের অভিযোগ”

1st Image

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধুরী (২০১৮-১১-১২ ০৮:২১:০৯)

মার্ক্সসবাদ ধর্মকে আফিমের সাথে তুলনা করে। মার্ক্সবাদের ধারণা বুর্জোয়ারা সর্বহারাদের চিন্তা, ধ্যান এবং ধারণায় ধর্মের বাণী এমনভাবে ঢুকিয়ে দেয় তারা তখন আফিমসেবীদের মতো ধর্ম ছাড়া অন্য কিছু চিন্তাই করতে পারেনা। কাজেই মার্ক্সবাদের উপর প্রতিষ্ঠিত চীন সরকারের ইসলাম, খৃষ্টান, বৌদ্ধ ইত্যাদি কোন ধর্মের প্রতিই সহমর্মিতা নেই। চীনের কম্যুনিষ্ট পার্টি তাদের প্রায় ৯০ মিলিয়ন পার্টি সদস্যদের একতার স্বার্থে কোন ধর্মের সাথে একাত্মতা ঘোষণা না করার জন্য কঠোর নির্দ্দেশ দেওয়া আছে। এই নির্দেশ অমান্যকারীদের জন্য কঠোর শস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। বিশ্বের অন্যান্য কম্যুনিষ্ট পার্টির মতো চীনের কম্যুনিষ্ট পার্টিও ধর্মকে মানবতাবিরোধী কাজ মনে করে এবং সর্বহারাদের ঐক্যের পরিপন্থি মনে করে। কিন্তু চীনের শাসনতন্ত্র ধর্মকে নিষিদ্ধ করে কোন  ধারা সংযোজন করা হয় নাই। তবে চীন যে নিরীশ্বরবাদকে উৎসাহিত করে এতে কোন সন্দেহ নাই।

এখন চীন সরকারের সমস্যা হচ্ছে, গত কয়েক দশক ধরে চীন বিভিন্ন ধর্মের চর্চা বাড়তে আরম্ভ করেছে। জাতি সংঘের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন গবেষণা সংস্থার সাম্প্রতিক অনুসন্ধানী রিপোর্টে বলা হয়েছে যে চীনে বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীর সংখ্যা ক্রমবর্ধমান হারে বেড়ে যাচ্ছে। ইতিমধ্যেই নিবন্ধিত বিভিন্ন ধর্মালম্বীর সংখ্যা ১০০ মিলিয়নের উপরে উঠেছে। চীনে দ্রুত অর্থনৈতিক উন্নতির সাথে সাথে ধর্ম-বিশ্বাসীর সংখ্যা জ্যামিতিক  হারে বেড়ে চলেছে।

এই বৎসর (২০১৮) আগষ্ট মাসে জাতিসংঘের  মানবাধিকার কাউন্সিল এর এক নিরীক্ষায় জানা যায়, চীনের বিভিন্ন দীক্ষদান কেন্দ্রে প্রায় ১০ লাখ উইঘুর মুসলমানদেরকে তথাকথিত দীক্ষাদান কেন্দ্রে আটক রাখা হয়েছে। চীনের পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত স্বায়ত্ব শাসিত জিনজিয়াংয়ে এককোটি উইঘুর মুসলিম বাস করে। চীনের সংখ্যালঘুদের মধ্যে মুসলমানদের সংখ্যা হলো ২০ শতাংশ এর মধ্যে ৯০ শতাংশ হুই এবং উইঘুর মুসলিম এর মধ্যে ৫৮ শতাংশ মুসলিম চীনের জিংজিয়াং  প্রদেশে বাস করে। ঐ প্রদেশে তাদের বসবাস প্রায় ১৩০০ বৎসরের পুরানো। আরবের মুসলমান ব্যবসায়ীরা ইসলামের প্রথম যুগ থেকে চীনের এই অঞ্চলে আসতে শুরু করে এবং তখন থেকেই চীনের এই অঞ্চলে ইসলামের প্রচার এবং প্রসার শুরু হয়। ব্যবসা ছাড়াও শুধু ইসলাম প্রচারের জন্য আরবদেশ থেকে নিয়মিতভাবে অনেক দল আসতে থাকে। সে সময় থেকে চীনের এই অঞ্চলে হাজার হাজার মানুষ ইসলাম ধর্মের প্রতি অনুরক্ত হয়ে পড়ে। চীনের এই প্রদেশে এখনও ২৪ হাজারের মত মসজিদ রয়েছে। উইঘুররা হচ্ছেন জিনজিয়াংয়ের আদি বাসিন্দা। ইসলামকে তারা ধর্ম হিসাবে প্রায় ১৩০০ বৎসর আগে থেকেই গ্রহণ করেছে। তারা জাতিগত, ভাষাগত এবং সাংস্কৃতিকভাবে তুর্কি ঘনিষ্ট। চীনে প্রাধান্য বিস্তারকারী হান্্ জাতিগোষ্ঠী থেকে উইঘুররা সম্পূর্ণ আলাদা। শত বাধা ও নির্ম্মম নির্যাতনের পরেও উইঘুরেরা তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য শত শত বৎসর ধরে আকঁড়ে রয়েছে। শত নির্যাতনের পরেও তাদের ধমীং বিশ্বাস অটুট রয়েছে। এমনকি তারা প্রাণের বিনিময়েও আপোষহীন। চীনা কর্তৃপক্ষ যদি মনে করে তাদেরকে স্বধর্ম থেকে ফেরানো যাবে তাতে চীনা কর্তৃপক্ষের বিশ্বব্যাপী অত্যাচারীহিসাবে দুর্নাম বাড়বে। কাজের কাজ কিছুই হবার নয়। জিনজিয়াং, মঙ্গোলিয়া, আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং ভারতের দ্বারা পরিবেষ্টিত।

এখন সম্পদশালী জিনজিয়াং প্রদেশে পুরোধমে উন্নয়ন কাজ চলছে তাতে চীনের সব চাইতে সংখ্যাগরিষ্ট ‘হান্্’ উপজাতি এই অঞ্চলে এসে বসতি স্থাপন শুরু করেছে। ‘হান’ উপজাতি চীনের মোট জনসংখ্যার ৯০শতাংশ হলেও কিন্তু বর্তমানে জিনজিয়াংয়ে তাদের সংখ্যা ৩৭ শতাংশ আদি অধিবাসী উইঘুরদের অভিযোগ বর্তমান এই অঞ্চলে যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের কাজ চলছে তার সমস্ত সুফল থেকে উইঘুরদের পরিকল্পিত উপায়ে বঞ্চিত করা হচ্ছে এই অঞ্চলে সদ্য আগত ‘হান’ উপজাতি এই উন্নয়নের সমুদয় সুফল ভোগ করছে। এর ফলে উইঘুর এবং হানদের মধ্যে ১৯৯০ দশক থেকে উত্তপ্ত সম্পর্ক চলছে। এই জাতি গোষ্ঠীর মধ্যে অহরহ ধাঙ্গা হাঙ্গামা চলছে। উইঘুরদের বক্তব্য হলো সোভিয়েট উইনিয়ন ভাঙ্গনের পর যদি সেন্ট্রাল এশিয়ার দেশগুলি স্বাধীন হতে পারে তাহলে জিনজিয়াং কেন স্বাধীন হতে পারবেনা ?

২০১৮ সালে জাতিসংঘের “Committe on the Elimination of Racial discrimiaion” জাতিগত বৈষম্য নির্মুল কমিটি ” চীনের জিনজিয়াং প্রদেশের উইঘুরদের উপর যে বৈষম্য চলছে তার একটি চিত্র তুলে ধরেন যা জাতিসংঘ আগষ্টের ৩০ তারিখ ২০১৮ সালে প্রকাশ করেন। তাতে কমিটির বক্তব্য হলো উইঘুরুর বসতী অঞ্চলটি একটি বন্দী শিবিরে পরিণত করা হয়েছে।

কমিটির মতে ২০ লক্ষ উইঘুরকে তথাকথিত শিক্ষা শিবিরে বন্দী করে রাখা হয়েছে। অবশ্য অধিকাংশ বন্দীকে কোন অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত করা হয় নাই। যারা ধর্মীয় উগ্রপন্থী তাদেরকে সবার সাথে ঐক্যবদ্ধ থাকার টেনিং দিচ্ছে বলে চীন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন। চীনের আদি অধিবাসী হেনদের (Han) সাথে উইঘুরদের ঐক্য সৃষ্টি করার কাজও চীনা কর্তৃপক্ষ করে যাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন। বর্তমানে চীনের জিংজিয়াং প্রদেশে বিপুল সংখ্যক সেনা মোতায়েন করা হয়েছে যাতে কোন অনাহুত ঘটনা না ঘটে। জাতিসংঘে “জাতিগত বৈষম্য নির্মুল কমিটি” বেইজিংকে কিছু সুপারিশ করেছে  (i) আইণতঃ অপরাধে সংগঠন, বিচার  এবং দোষী সাব্যস্ত হওয়ার আগে কাউকে বন্দী না করা (ii) উপরোক্ত প্রক্রিয়া সম্পাদন ছাড়া যাদেরকে আটক রাখা হয়েছে তাদেরকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া (iii) কতজন লোককে আটক রাখা হয়েছে এবং কি কারণে আটক করা হয়েছে তা জানানোর কথা বলা হয়েছে।

এদিকে “এমনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল” এবং “হিউম্যান রাইটস ওয়াচ” নামে মানবাধিকার সংৃস্থাগুলি এক রিপোর্টে জানিয়েছেন সব ক্যাম্পে উইগুর মুসলিমদেরকে আটক রাখা হয়েছে। সেখানে কারাবন্দীদেরকে চীনের কম্যুনিষ্ট পার্টি এবং চীনের প্রেসিডেন্টের পক্ষে শ্লোগান দিতে বাধ্য করা হয়েছে এবং তাদের উপর শারীরিক অত্যাচর করা হচ্ছে। তাদেরকে জেলে অপরিমিত খাদ্য দেওয়া হচ্ছে যার ফলে কিছু কিছু বন্দী ইতিমধ্যে প্রাণ হারিয়েছে এবং অন্যান্য  নিপীড়নমূলক ব্যবস্থা চীন কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করেছে তার মধ্যে রয়েছে (ক) উইঘুর অল্প বয়স্ক বাচ্চাদের মসজিদে যাওয়ায় নিষেধাজ্ঞা, উইঘুর পুরুষদের দাঁড়ি রাখার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা, মাথায় টুপি দেওয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা এবং তাদের  গতিবিধির উপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হযেছে এবং ২০১৪ সাল থেকে রমজান মাসে রোজা রাখার উপরে নিষেধজ্ঞা জারী করা হয়েছে। উইঘুর মুসলমানদের বিরুদ্ধে এই সব পদক্ষেপের ফলে উইঘুর মুসলমানদের মধ্যে সন্ত্রাসী সৃষ্টি হওয়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে নাকি উইঘুর যুবক সিরিয়াই গিয়ে আই.এস.এর সাথে যুদ্ধ করে আবার ফিরে এসেছে। বর্তমানে বেইজিং আইন করে ইন্টারনেটের সাহায্যে ধর্ম প্রচারের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। চীন সরকার এখন বলছে তারা মুসলিম উগ্রবাদীর হামলার আশংকা করছে। কিন্তু বেইজিং এর নীতি তিব্বতের বৌদ্ধদের প্রতি বা চীনের খৃষ্টানদের প্রতিও উদার নয়। আসলে কম্যুনিষ্ট পার্টি মানবাধিকার বা ধর্মীয় স্বাদীনতার প্রতি উদার হওয়ার মূলনীতিরই বিরুদ্ধে।

কিন্তু ১৯৭০ এর আগের চীন এবং বর্তমান চীনের মধ্যে অনেক পার্থক্য রয়েছৈ। বর্তমান চীন সারা বিশ্বের সাথে একাত্ম হয়ে চলার নীতি গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যেই চীন কয়েক ট্রিলয়ন ডলার বিভিন্ন দেশে বিনিয়োগ করেছে। চীন বিশ্বের প্রায় ৬০টি দেশে বিভিন্ন অর্থনীতিতে একটি বৈপ্লবিক উন্নয়নের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে এই সময়ে চীন যদি এই সব তুচ্ছ বিষয়ে অমানবিক পদক্ষেপ গ্রহণ করে তাহলে বিশ্বের কাছে চীনের হীনতার প্রকাশ পাবে।

ফ্রান্সের মহান নেতা চার্লস ড্যাগলে তাঁর আত্মজীবনীতে লিখেছেন “France can not be France without greatness.” আজকে বলতে হবে “China will never be a great China without greatness.”