cplusbd

নিউজটি শেয়ার করুন

রাশিয়ার সাথে পারমাণবিক চুক্তি বাতিলের আমেরিকার প্রেসিডেন্টের হুমকি।”

1st Image

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধুরী (২০১৮-১১-০৭ ১১:৩৭:১৩)

১৯৮৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ছিলেন রোনাল্ড রিগান এবং সোভিয়েট রাশিয়ার প্রধান ছিলেন মিখাইল গর্ভাচেভ। তখন দুই পরাশক্তির মধ্যে ঠান্ডা যুদ্ধ চরমে। বিশ্বের তখনকার পরিস্থিতিতে উভয়ের মধ্যে কোন ব্যাপারে চুক্তি হওয়া কত কঠিন ছিল তা যাঁরা সে সময়ের বিশ্বের পরিস্তিতি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান রাখতেন তাঁরাই শুধু উপলদ্ধি করতে পারবেন। সে সময়ে সোভিয়েট ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কেমন তিক্ত সম্পর্ক ছিল মিখাইল গর্ভাচেভের আমেরিকার বিখ্যাত ম্যাগাজিন “টাইম” কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের সামান্য অংশ উদ্ধৃত করলে বুঝতে কষ্ট হবেনা। তিনি টাইমের রিপোর্টারকে বলেছিলেন “U.S. will go on developing space weapons system. So here you see how certain` people in the U.S. are driving nails into this structure of our relationship, then cutting off the heads. So the soviets must use their teeth to pull them out.”  অর্থ্যাৎ “ যুক্তরাষ্ট্র মহাশূন্যে অস্ত্র তৈরীর পদ্ধতি চালাবেই। কাজেই আপনারা দেখছেন, কেমন করে আমেরিকার কিছু লোক আমাদের উভয়ের সম্পর্কের কাঠামোতে নখ চালাচ্ছে এবং পরে মাথা কাটবে। কাজেই সোভিয়েট ইউনিয়ন এদেরকে ধ্বংস করার জন্য দাঁত ব্যবহার করবেই।” কাজেই বুঝা যায় উভয় পক্ষই স্ব স্ব দেশের শক্তিশালী নেতিবাচক লবি মোকাবেলা করে তদানীন্তন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েট ইউনিয়ন নেতারা এই সব চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। তাতে বিশ্বের স্নায়ু যুদ্ধ অনেকটা থেমে গিয়েছিল। যাই হউক, অনেক চেষ্টার ফলে ১৯৮৭ সালে আমেরিকা এবং সোভিয়েট রাশিয়া “ইন্টারমিডিয়েট রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস (আই,এন,এফ) নামে একটি পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। তৎকালীন সোভিয়েট ইউনিয়নের প্রধান মিকাইল গর্ভাচেভ এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট রোনল্ড রিগ্যান স্ব-স্ব দেশের পক্ষে ঐ চুক্তিতে সই করেছিলেন। ঐ চুক্তিতে ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ৫০০ থেকে সাড়ে ৫০০০ হাজার যে সব ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার কথা উল্লেখ রয়েছে, যা দিয়ে এক কাপ চা পানের সময়ের মধ্যে শত্রু নিশানা ধ্বংস করা এবং অসংখ্য বেসামরিক লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস সাধন করা সম্ভব ছিল। কাজেই এই চুক্তি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি এবং বিশ্বের শান্তি স্থাপনের জন্য অতীব একটি জরুরী চুক্তি। এই চুক্তি মারাত্মক পরমাণু অস্ত্রের সম্পূর্ণ একটি শ্রেণীকেই নিষিদ্ধ করেছে। বর্তমানে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের অভিযোগ, রাশিয়া অনেকদিন থেকেই চুক্তিটি লঙ্ঘন করে আসছে, কাজেই তিনি ৩১ বৎসরের এই পুরানো চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াকে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে দূরে রাখার জন্য ১৯৭২ সালে আন্টি ব্যালেস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বিরোধী চুক্তি করা হয়েছিল। ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্র নিজেকে চুক্তিটি থেকে প্রত্যাহার করে নেয়। ২০১৫ সালে “জয়েন্ট কম্প্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন” নামে আরেকটি চুক্তি করা হয়েছিল। যেটা হয়েছিল ইরানের সাথে, যাতে ইরান পরমাণু অস্ত্র তৈরী থেকে বিরত থাকে। এই চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ছাড়াও রাশিয়া, চীন, ফ্রান্স বৃটেন এবং জার্মানী সংশ্লিষ্ট ছিল। অথচ সম্প্রতি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বহুপাক্ষিক এই চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে সরিয়ে নিয়েছেন।

 অবশ্য ২০১৪ সালে আমেরিকার তদানীনন্তন প্রেসিডেন্ট ওবামাও ভূমি থেকে নিক্ষেপযোগ্য ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা চালিয়েছে বলে অভিযোগ এনেছিলেন রাশিয়ার বিরুদ্ধে এবং চুক্তিটি থেকে সরে আসতে ইউরোপের নেতারা সে সময় ওবামাকে চাপ দিয়েছিলেন কিন্তু অস্ত্র প্রতিযোগীতা পুণরায় শুরু হওয়ার আশংকায় ওবামা এ প্রস্তাবে সায় দেননি। রাশিয়ার বক্তব্য হলো যুক্তরাষ্ট্র এই চুক্তি থেকে বের হয়ে যাওয়ার চেষ্টার মূল কারণ হলো যুক্তরাষ্ট্রের এক-কেন্দ্রিক বিশ্ব গড়ার স্বপ্ন। রাশিয়ার মতে আমেরিকা বহুদিন ধরেই এই চুক্তির ভিত্তি নষ্ট করার প্রচেষ্টা চালিয়ে আসছে এবং রাশিয়া বহুবার এর প্রতিবাদ জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মতে রাশিয়া আই.এন.এফ. চুক্তি অমান্য করে নোভাতর ৯ম ২৯ নামে নুতন একটি মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈয়ার করেছে। ন্যাটোর কাছে ক্ষেপণাস্ত্রটি এস. এস. টি. ৮ নামে পরিচিত। ওয়াশিংটনের মতে স্বল্প সময়ের নোটিশে রাশিয়া নাটোভুক্ত দেশগুলিকে এই ক্ষেপণাস্ত্র দিয়ে আক্রমণ করতে পারবে। আমেরিকার প্রখ্যাত সংবাদপত্র নিউইর্য়ক টাইমসের মতে আই.এন.এফ. থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে আসার মূল লক্ষ্য রাশিয়া নয় বরং চীন। পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর অঞ্চলে চীনের সামরিক উপস্থিতির কারণেই আমেরিকা এই চুক্তি থেকে সরে এসেছে। যেহেতু চীন আই.এন.এফ চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী নয় কাজেই চীনের মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র তৈয়ার করতে কোন বাধা নেই।

ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিরাপত্তা উপদেষ্টা মি. বল্টন দু’দিনের সফরে মস্কো পৌঁছেছেন। ইতিমধ্যেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের সাথে এ ব্যাপারে দীর্ঘ আলোচনা করেছেন। এ দিকে চীন কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রকে গভীরভাবে এ ব্যাপারে চিন্তা করার অনুরোধ করেছেন। চীনের মুখপাত্র বলেছেন এই চুক্তি বিশ্বের নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়ায় বিরাট অবদান রেখেছে। চীনা পর-রাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মিঃ হুয়া বলেছেন আমরা এই চুক্তি প্রত্যাহারের বিরোধী। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ইনামুয়েল ম্যাক্রো বলেছেন এই চুক্তি ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সোভিয়েট ইউনিয়নের প্রাক্তণ নেতা গর্ভাচেভ যিনি এই চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী বলেছেন, ১৯৮৭ সালের পরমাণু চুক্তি বাতিলের যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিকল্পনা পরমাণু অস্ত্র নিরস্ত্রীকরণ অর্জনের প্রচেষ্টার সম্পূর্ণ বিপরীত।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বল্টন ইতিমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন রাশিয়া এবং কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের আপত্তি সত্ত্বেও চুক্তিটি থেকে বের হয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র কাজ শুরু করেছে।

চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্র বেরিয়ে গেলে রাশিয়া কি করবে এমন প্রশ্নের উত্তরে ইটালীর সফরত প্রধানমন্ত্রীর সাথে বৈঠকের পর এক সাংবাদিক সম্মেলনে পুতিন বলেছেন আমেরিকার আই,এন,এফ নামের পারমাণবিক চুক্তি ত্যাগ করার এই বিপজ্জ্বনক সিদ্ধান্তের ব্যাপারে তিনি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সরাসরি আলোচনা করতে আগ্রহী। আশা করা যায়, ১১ তারিখে প্যারিসে নির্ধারিত বৈঠকে এই ব্যাপারে ট্রাম্পের সাথে তিনি বিস্তারিত আলোচনা করবেন। তিনি বলেন বিশ্ব আরেকটি অস্ত্র প্রতিযোগীতার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে।

সত্যিই যদি আমেরিকা আই. এন এফ চুক্তি থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেয়- তাহলে রূশ-মার্কিন সম্পর্ক ভয়াবহ এক অধ্যায়ে প্রবেশ করবে। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার অস্ত্র প্রতিযোগীতা নতুন মাত্রা লাভ করবে। যখন নতুন প্রজন্মের স্বল্প এবং মধ্যম মাত্রার ভূমি থেকে নিক্ষেপণযোগ্য পারমাণবিক অস্ত্র প্রস্তুত করা হবে, তখন ইউরোপ জুড়ে আবার ঐগুলি মোতায়নের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যখন রাশিয়া ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করবে, তখন আমেরিকা এবং ইউরোপিয়নরা বাধ্য হয়ে মধ্য মাত্রার পরমাণু অস্ত্র মোতায়েন করবে। এতে ১৯৮০ দশকের পরিস্থিতির আবার উদ্ভব হবে এবং আবার ইউরোপিয়ান দেশগুলি যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়ার মধ্যকার পারমাণবিক অস্ত্র খেলার লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত হবে। ২০১০ সালে রাশিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কৌশলগত অস্ত্র হ্রাস চুক্তি হয়েছিল। এতে অসংখ্য স্বল্প ও মধ্যমাত্রার ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা নিয়ন্ত্রণে এসেছিল। এই চুক্তিটি প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সময়ে করা হয়েছিল। ইতিমধ্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই চুক্তি নিয়েও সন্দেহের মধ্যে রয়েছেন এবং যে কোন সময় উক্ত চুক্তিও তাঁর টার্গেট হতে পারে।

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উপদেষ্টা বল্টন রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের সাথে মস্কোয় ৯0 মিনিট আলোচনার পর সাংবাদিকদের সাথে আলোচনার সময় একটি কথা বলেছেন যা প্রণিধান যোগ্য। তিনি বলেছেন এই ব্যাপারে চুক্তিতে চীন সহ অন্যান্য পারমাণবিক অস্ত্র সমৃদ্ধ দেশগুলি যদি পক্ষ না হয় তাহলে আই. এন. এফের মতো চুক্তি অর্থহীন হয়ে পড়বে।

এতে বুঝা যায় যদি  আই. এন. এফের মতো চুক্তিতে রাশিয়ার সাথে চীনকে অন্তর্ভূক্ত করা যায়, সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আই.এন.এফের মতো চুক্তির প্রতি যে আগ্রহ বেড়ে যাবে তাতে কোন সন্দেহ নেই কিন্তু চীনের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের যে বাণিজ্য যুদ্ধ তাও এখন এখন চলমান। যেভাবেই হউক না কেন, চীনকে সহ নিয়ে যদি যুক্তরাষ্ট্র এবং রাশিয়া আই.এন.এফ. চুক্তি করতে পারে তাহলে বিশ্বের ইতিহাসে ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভ্লাদিমির পুতিন এবং শি. জিন. পিং এর নাম যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া এবং চীনের প্রেসিডেন্ট হিসাবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।