cplusbd

নিউজটি শেয়ার করুন

“বিশ্বে গণতন্ত্রের শবযাত্রা কি আসন্ন?”

1st Image

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধুরী (২০১৮-১০-৩১ ০১:৪৭:৩৪)

বিশ্বের প্রখ্যাত লেখক,বার্নড-শ লিখেছিলেন, As the world must be governed whether there are geniuses to govern it or not. When none are available, and it must be governed by the dunderheads, these dunderheads must themselves be governed by a set of rules based on history, experience, and regard for common welfare. Such set of rules are what call constitution. অর্থাৎ “প্রতিভাবান থাক আর না থাক পৃথিবীকে শাসন করতেই হবে, কাজেই প্রতিভাবানের অভাব দেখা দিলে, বোকা লোকদেরকে শাসন ক্ষমতায় বসাতে হয়, তখন এসব স্থুলবুদ্ধি সম্পন্নদেরকে পরিচালনার জন্য ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা ভিত্তিক সাধারনের মঙ্গলার্থে কিছু বিধিবিধান সুনিদির্ষ্ট করে দেওয়া হয়। ঐ সব বিধিবিধানকেই আমরা শাসনতন্ত্ররূপে আখ্যায়িত করি।”

বর্তমানে বিভিন্ন বিশ্ব বিখ্যাত সংস্থা সমুহের জরিপ অনুযায়ী সারা বিশ্বে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ গুলি স্ব স্ব দেশের শাসকদল এবং শাসকদের এমন ভয়াবহ আক্রমণের লক্ষ্য বস্তুতে পরিণত হয়েছে, অচিরেই সে সব দেশে গণতান্ত্রিক মুল্যবোধ গুলি বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। ফ্রিডম হাউস নামে সংস্থা সম্প্রতি তাদের প্রতিবেদনে বলেছেন, বিশ্বের শতকরা ৬৭ ভাগ মানুষ গণতান্ত্রিক অধিকার সমূহে থেকে আংশিক বা সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত। মানবাধিকার সংক্রান্ত এই ভয়াবহ অবস্থা যারা শাসন ক্ষমতায় আছেন তাঁরাই নিজেদের ক্ষমতার মসনদ নিরাপদ করার জন্য পরিকল্পিত উপায়ে সৃষ্টি করেছেন। বিশে^র এক তৃতীয়াংশ মানুষ সম্পূর্ণভাবে স্বৈরচারী শাসকদের দ্বারা অগণতান্ত্রিক পন্থায় শাসিত হচ্ছে। এদের উপর সরাসরি একনায়কতন্ত্রই চলছে এবং তারা মৌলিক মানবিক এবং রাজনৈতিক অধিকার সমূহ থেকে সম্পূর্ণভাবে বঞ্চিত।

এশিয়ার দেশগুলিতে অনেক শাসকদল আপাত:দৃষ্টিতে গণতান্ত্রিক লেবাস পরিধান করলেও কিন্তু লেবাসের আড়ালে প্রশাসনের প্রতি স্তরে নির্ভেজাল স্বৈর শাসন চালিয়ে যাচ্ছেন। দুর্ভাগ্যের বিষয় গণতন্ত্রের পক্ষে দেওয়া তাদের শ্লোগানগুলি ভাষাগতভাবে এত সমৃদ্ধশালী যে তাদের অগণতান্ত্রিক এবং স্বৈরশাসনের প্রত্যক্ষ ভুক্ত ভোগীরা ছাড়া বাইরের কোন লোকের পক্ষে বুঝে উঠা প্রায় দু:সাধ্য। এসব দেশে পার্লামেন্টে আইন পাশ করে এমনকি জাতিসংঘ কর্তৃক স্বীকৃত মৌলিক এবং মানবিক অধিকার খর্ব করার ভুরি ভুরি প্রমাণ রয়েছে।

সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন আইনী প্রক্রিয়ায় এমন সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়, “তারা ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি” বলে রাজনীতিই ত্যাগ করতে হয়। এদের শাসন প্রক্রিয়া  মিলিটারী শাসকদের শাসন থেকেও অনেক  ভয়াবহ। কারণ মিলিটারী শাসকদের স্বৈশাসনে অনকে সময় সুদূর প্রসারী কোন পরিকল্পনা থাকেনা। কিন্তু এই সব তথাকথিত গণতান্ত্রিক শাসনের আড়ালে অত্যন্ত সুকৌশলে শাসনতান্ত্রিক পথে যে স্বৈরাচার কায়েম করা হয় তা অত্যন্ত ভয়াবহ। দেশের যে সকল প্রতিষ্ঠানগুলি শুধু শাসনতন্ত্রের ভিত্তিতেই চালিত হওয়ার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, সেগুলিতেও শাসকশ্রেণী এমন নগ্নভাবে হন্তক্ষেপ করে যে এই প্রতিষ্ঠানগুলির সৃষ্টির আসল উদ্দেশ্যই ধুলিধসাৎ হয়ে যায়। ইতিহাসের শিক্ষা হলো এই স্বৈরচারীরাও একদিন চরম অধঃপতনের স্বীকার হয়। কারণ বিধাতা সত্যের অপলাপ শেষ পর্যন্ত সহ্য করেন না। বিখ্যাত লেখক সেমুয়্যাল জনসন বলেছেন Truth  is a cow which will yield no more milk and so they are now gone to milk the bull. অর্থাৎ সত্য হলো একটা গাভী যখন সে আর দুধ দেয়না, তখন তারা দুধের জন্য ষাঁড়ের কাছে যায়।
    ১৯৭০ এবং ৮০ দশকের দিকে বিশ্বের প্রায় সচেতন মানুষ বিশ্বাস করতেন যে অচিরেই কমুনিস্টদের নেতৃত্বে সারা বিশে^ সর্বহারার রাজত্ব কায়েম হয়ে যাবে। ১৯৭২ এর দিকে আমাদের সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশেও শহরে কোন পরিবারের ৫ কাঁটার বেশি জমিন থাকতে পারবেনা বলে আইন পাশ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সারা বিশ্বে বাম পন্থীদের মধ্যে সাজ সাজ রব উঠেছিল সর্বহারার রাজত্বকে স্বাগত জানানোর। সে বিশ্বাস ভুল প্রমানিত হয়েছে। আজকে বিলিয়ন ডলারের মালিকের সংখ্যা সব চাইতে বেশি হলো চীনে। প্রখ্যাত আন্তর্জাতিক মিডিয়াগুলির খবর অনুযায়ী রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন সাহেব নিজেই বিলিয়ন ডলারের মালিক। আগের মতোই বিশ্বের সর্বত্র বিলিয়ন ডলারের মালিকদের শিল্প কারখানায় বিশ্বের সর্বহারা জনগোষ্ঠী দিন রাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে চলেছে এবং কার্ল মার্কসের ঘোষিত Surplus value of labor. অকাতরে সর্ব হারাদের থেকে লুঠ হয়ে যাচ্ছে।
১৯৬০ এবং ১৯৭০ দশকের দিকে বিশ্বে সেনাবাহিনী বিভিন্ন দেশে বুলেটের মাধ্যমে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল করে দেশে দেশে সামরিক শাসন জারীর হিড়িক পড়েছিল। আজ বিশ্বে তাও থেমে গেছে। অবশ্য মিশর সহ দু’একটা দেশে এখনও সামরিক জান্তারা ক্ষমতায় থাকলেও এদের দিন যে ফুরিয়ে গেছে তা তাঁরা নিজেরাই বুঝতে অক্ষম নন। কিন্তু তাঁরা গাছ থেকে নামতে মই খুঁজে পাচ্ছেনা। আজ কাল সর্বস্ব ত্যাগ করে রাজনীতির বা দেশসেবার লোক পাওয়া যায়না। সারা বিশ্বে দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতির ফলে মানুষের জীবনযাত্রার খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। মানুষ কিছুতেই আয় আর ব্যয়ের মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে পারছেনা। এই পরিস্থিতিই মানব মূল্যবোধের অবক্ষয়ের সৃষ্টির প্রধান কারণ। ইচ্ছা থাকলেও কোন রাজনৈতিক কর্মীর পক্ষে অর্থের সংস্থান ছাড়া রাজনীতি করাটা দুরূহ হয়ে পড়েছে। কাজেই ত্যাগী নেতাদের ক্ষেত্রে রাজনীতি করাটা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। বর্তমানে রাজনৈতিক কর্মীরাই ব্যবসায়ীদের রাজনীতিতে সম্পৃক্ত করার প্রতি সমর্থন জানাচ্ছে। বরং এই ব্যাপারে নিজেরাই উদ্যোগী হচ্ছে। ব্যবসায়ীরাও এক ঢিলে দুই পাখী মারার সুযোগ পেয়ে দলে দলে রাজনীতিতে অংশগ্রহণ শুরু করেছেন। কাজেই রাজনীতি তেজারেত নীতির রুপ ধারণ করেছে। সেদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষক শ্রদ্ধেয় ড. রহমান সোবহান সাহেবের এক লেখায় দেখলাম তিনি বলেছেন- এইকালে যদি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বা তাজুদ্দিন সাহেবকে রাজনীতি আরম্ভ করতে হত তারা চরমভাবে ব্যর্থ হতেন। 

উল্লেখিত কারণ ছাড়াও বিশ্বায়নের ফলে বিশ্বের সম্পদ গুটিকতক মানুষের নিয়ন্ত্রেণে চলে গেছে। শুনলে আপনাদের বিশ্বাস হবেনা, বর্তমানে মাত্র ছয়জন মানুষ বিশ্বের অর্ধেক সম্পদের মালিক।। সারা বিশ্বে বিলিয়নপতিদের প্রভাব, প্রতিপত্তি এমনভাবে বেড়েছে, রাজনৈতিক দলগুলি তাঁদের পরামর্শের বাইরে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। সম্প্রতি ভারতীয় একাধিক সংবাপত্রে খবর বেরিয়েছে যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রী নরেন্দ্র মোদি ভারতের প্রখ্যাত শিল্পপতি অম্বনীর হাতের পুতুলের মতো অম্বনী শিল্প গ্রুপের স্বার্থেই কাজ করে থাকেন। 

গত মে মাসের ২০ তারিখে বিলাতের বহুল প্রারিত সংবাদপত্র “The guardian” How democracy ends Review--Is people politics doomed?  শিরোনামে একটি প্রতিবেদন বের হয়েছে তাতে লিখেছে। In politics the denigration of expertise and the celebration of ignorance; Scorn for consensus builders and pragmatic compromise; the polarization of politics towards venom-spitting extremes are the sign posts of democracy’s decline.. অর্থাৎ “বিশেষজ্ঞ সুলভ জ্ঞানের প্রতি অবজ্ঞা, অজ্ঞতার প্রশ্রয়, ঐক্যমত এবং বাস্তবধর্মী সমাধানের প্রতি নিদারুন অবজ্ঞা, রাজনৈতিক সমীকরণ বিষাক্ত পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া, তাতে রাজনীতিতে যে জীবাণু সৃষ্টি হয়েছে, এতেই গণতন্ত্রের মৃত্যু হচ্ছে।