cplusbd

নিউজটি শেয়ার করুন

“রাশিয়ার এস-৪০০ কেনার বিরুদ্ধে ভারতকে যুক্তরাষ্ট্রের হুশিয়ারী”

1st Image

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধূরী (২০১৮-১০-২৫ ০৪:১৭:১০)

গত সপ্তাহে লিখেছিলাম, “যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের প্রতিরক্ষা সম্পর্ক সবার শীর্ষে” এক সপ্তাহ না যেতেই রাশিয়ার কাছ থেকে  এস ৪০০ কেনার বিরুদ্ধে ভারতকে কড়া হুশিয়ারী দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। চীন ও পাকিস্তানের এমন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় রয়েছে যা শক্তিশালী যুদ্ধবিমান ও দূর পাল্লার মিসাইলকে ও ভূপাতিত করতে পারে। কাজেই ভারতের সামরিক বাহিনীর জন্যও অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করতে হয়। সে কারণে ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এস-৪০০ ক্রয় করেছে। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট দুই দিনের জন্য  ভারত সফরে এসেছেন এই সংক্রান্ত চুক্তি সই করার জন্য। কারণ বেশ কিছুদিন আগে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার উপর নিষেধাজ্ঞা জারী করেছে এবং সাথে সাথে ঘোষণা করেছে যদি কোন রাষ্ট্র রাশিয়া থেকে অস্ত্র ক্রয় করে সেক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দেশ নিষেধাজ্ঞার আওতায় পড়বে। গত আগস্ট মাসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই আইনে স্বাক্ষর করেন যা সংক্ষেপে “সিএএটিএসএ” নামে খ্যাত। কাজেই ভারত যদি এখন রাশিয়া থেকে অস্ত্র কিনে, সেক্ষেত্রে ভারতকেও এই আইনের আওতায় আসতে হবে। উপরোক্ত আইন পাশ হওয়ার পর চীনও রাশিয়ার কাছ থেকে এস ৪০০ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ক্রয় করেছে এবং যুক্তরাষ্ট্র উপরোক্ত আইন অনুসারে চীনের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। 

    এই ব্যাপারে ভারতের প্রতিরক্ষামন্ত্রী নির্মলা সিতারামনের বক্তব্য হলো ভারত রাশিয়া থেকে দীর্ঘদিন ধরে অস্ত্র কিনছে। ভারতীয় সেনাবাহিনীর অস্ত্রাগারে ৮০ ভাগ সামরিক অস্ত্রই ছিল সোভিয়েট ইউনিয়নের তৈরী। কিন্তু গত  দশকে ভারতের অস্ত্র-আমদানীর সিংহভাগই যুক্তরাষ্ট্র থেকে ক্রয় করা হয়েছে। ভারত যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রায় দেড় হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র ইতিমধ্যেই আমদানী করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের লকহিড্্ মার্টিন ও বোয়িং যুুদ্ধ বিমান বিক্রয়ের শীর্ষে রয়েছে। কোম্পানী দু’টি ভারতের সামরিক বাহিনীর কাছে এই পর্যন্ত শতাধিক যুদ্ধবিমান বিক্রয় করেছে। ভারতের প্রতিরক্ষমন্ত্রীর মতে রাশিয়া থেকে আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এস ৪০০ ক্রয়ের প্রক্রিয়া দীর্ঘদিনের তখন যুক্তরা্েট্রর এই ব্যাপারে কোন নিষেধাজ্ঞা ছিলনা। রাশিয়ার সাথে বহুদিনের পুরানো ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধী অস্ত্রচুক্তিকে ভারত চূড়ান্ত করতে যাচ্ছে। এই অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে মোদী সরকার, ভারত এই প্রতিরক্ষা আনয়নে ট্রাম্প প্রশাসনের অনুমোদন পাওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী।

সোভিয়েট রাশিয়া এবং গণচীন ছিল একই সাম্যবাদী আদর্শের দেশ। বিংশ শতাব্দীর ষাট দশকে সোভিয়েট ইউনিয়নের সাথে গণচীনের সম্পর্ক অত্যন্ত তিক্ত হয়ে উঠে। কারণ ছিল উভয়ের মধ্যে সাম্যবাদী আদর্শের পার্থক্য। তখন গণচীনের অবিসংবাদিত নেতা ছিলেন চেয়ারম্যান মাও সে তুং এবং অত্যন্ত মেধাবী চৌ এন লাই ছিলেন প্রধানমন্ত্রী। অন্যদিকে সোভিয়েট ইউনিয়নের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন নিকিতা ক্রুশ্চেভ। সে সময় তিনি বলেছিলেন, “Mao thought himself as a man sent by God to do God’s bidding. In fact Mao probably thought God, did Mao’s own bidding. He could do no wrong.” অর্থ্যাৎ “মাও মনে করে ইশ^রের আদেশ পালনের জন্য ইশ^র তাঁকে পাঠিয়েছেন। সত্যিকার অর্থে মাও মনে করেন তাঁর আদর্শই ইশ^রের আদর্শ। উনি কোন ভুল করতে পারেননা।” অবশ্য আজকে সোভিয়েট ইউনিয়ন ভেঙ্গে গেছে। আজকের রাশিয়ার সাথে বর্তমান চীনের বিশেষ বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বিরাজ করছে। 
    যাই হউক, শেষ খবর অনুযায়ী গত ৫ই অক্টোবর রাশিয়া  এবং ভারত ৫৪৩ কোটি ডলারের বিনিময়ে পাঁচটি এস ৪০০  আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। নয়দিল্লীতে হায়দারাবাদ হাউেেজ ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিনের মধ্যে এক বৈঠকের সময় এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।  ১৯৬২ সালে চীন-ভারত সীমান্তে যে যুদ্ধ শুরু করেছিল তার এখনও মীমাংসা হয় নাই। এই সেদিনও ডুকলামে চীন ও ভারতের সেনবাহিনী মুখোমুখি অবস্থানে কয়েক মাস ছিল। অন্যদিকে পাকিস্তানের সাথে কাশ্মীর সীমান্তে অহরহ সংঘর্ষ লেগেই আছে, সব সময় পাকিস্তান ও ভারত সীমান্তে উত্তেজনা বিরাজ করছে। সবচাইতে উদ্বেগের বিষয় ভারত, চীন এবং পাকিস্তান, তিনটি দেশই বর্তমানে আণবিক অস্ত্রের অধিকারী। কিন্তু তিনটি দেশের সাথে রাশিয়ার বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। এই অবস্থায় রাশিয়া যদি সমানে তিনটি দেশের কাছে অস্ত্র বিক্রয় করতে থাকে তাহলে এর অর্থ কি দাঁড়ায়? বিশে^র একটি অণ্যতম শক্তিশালী দেশ হিসাবে বিশ^ শান্তি কায়েমের ব্যাপারে এভাবে উদাসীন থাকাটা রাশিয়ার জন্য কি সমীচীন হচ্ছে ? বিশ^ শান্তি কয়েমের ব্যাপারে রাশিয়ার কি কোন নৈতিক দায়িত্ব নেই ? বিশে^র একটি বড় অস্ত্র বিক্রেতা হিসাবে রাশিয়ার ভূমিকা কি মানবজাতি মানতে পারে ? রাশিয়া এই তিনটি দেশের (চীন, পাকিস্তান ও ভারত) শান্তিপূর্ণ সহ অবস্থান চায় Ñ এ কথা কি বলা যাবে ?
    
যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থা ও একই রকম। মাধ্যপ্রাচ্যে সাউদী আরব সহ বিভিন্ন দেশে মিলিয়ন, মিলিয়ন ডলারের অহরহ অস্ত্র বিক্রয় করে চলছে, কিন্তু এসবের শেষ পরিণতি মানবজাতিকে কি ভয়বহ ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাবে তার লেশমাত্র চিন্তা যুক্তরাষ্ট্রের আছে বলে মনে হয়না। 

তাহলে কি বিশে^র বিখ্যাত দার্শনিক রাসেলের কথাই সত্য ? তিনি বলেছিলেন যে আসলে বিশে^র শক্তিশালী দেশগুলির ক্ষমতাসীনদের হাতে বিশে^ শান্তি স্থাপনের কোন ক্ষমতায় নাই। সব ক্ষমতা অস্ত্র লবিং এবং জেনারেলদের হাতেই। যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস (সিনেট এবং প্রতিনিধি পরিষদ) দেশের বিভিন্ন শক্তিশালী লবিকে অবজ্ঞা করতে সক্ষম হয়না। তন্মধ্যে অস্ত্র বিক্রেতা এবং স্থল, নৌ এবং বিমানবাহিনীর কর্মকর্তাদের লবি সবচাইতে শক্তিশালী। অস্ত্রের ব্যাপারে এবং অন্যান্য সামরিক পদক্ষেপের ব্যাপারে এই লবির মতামতের বাইরে যাওয়া অনেকটা কঠিন। বিশ^বিখ্যাত দার্শনিক এবং তখনকার বিশ^-শান্তি আন্দোলনের পুরোধা লর্ড রাসেল বলেছিলেন,  The armament Lobby, which represents both the economic interest of armament firms and war like ardour of the generals and admirals, is exceedingly powerful and it is very doubtful whether the president will be able to stand out against the pressure which it is exerting” অর্থাৎ “অস্ত্রলবি যা অস্ত্র বিক্রেতা ফার্মগুলির অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং সেনাবাহিনীর এবং নৌবাহিনীর এড্মিরালদের যুদ্ধ উদ্দীপনা এত বেশি শক্তিশালী যে, এ চাপের মুখে প্রেসিডেন্ট ও দাঁড়াতে সক্ষম হননা।”
পরিশেষে বিশ^বিখ্যাত  বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের একটি মহামূল্যবান উদ্ধৃতি দিয়ে ইতি টানব। তিনি বলেছিলেন, Striving for peace and preparing for war are incompatible with each other, in our time more so than ever.. অর্থাৎ শান্তির জন্য জোর প্রচেষ্টা এবং অন্যদিকে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি, একটি অন্যটির সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং আমাদের সময়ে সবচাইতে বেশী তাই চলছে।”

shahabuddinkhaled47@gmail.com