cplusbd

নিউজটি শেয়ার করুন

“২৫ সেপ্টেম্বর ট্রাম্পের জাতিসংঘের বক্তৃতা আমেরিকার পূর্ব গৃহীত নীতি পরিপন্থী”

1st Image

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধূরী (২০১৮-১০-২৪ ০৩:৪৮:৫৭)

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের চীনের বিরুদ্ধে ঘোষিত বাণিজ্য যুদ্ধের উপর চীনের স্বার্থ, যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ এবং বিশে^র অন্যান্য দেশ সমূহর স্বার্থ কতটুকু জড়িত তার বিশত ব্যাখ্যা দিয়ে চীন এক শে^তপত্র প্রকাশ করেছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের পারষ্পরিক বাণিজ্যিক সুসম্পর্ক উভয়ের জন্য এবং বিশে^র অন্যান্য দেশগুলির জন্য কতুটুকু প্রয়োজনীয় তারও বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। চীন পরিসংখ্যানের মাধ্যমে দেখিয়েছে যে চীনের সাথে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ক্ষেত্রে ঘাটতি থাকলেও, সেবা বা সার্ভিসের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র অনেক এগিয়ে আছে এবং চীনে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও এগিয়ে আছে। বর্তমানে চীন যুক্তরাষ্ট্রের ১.১৮ ট্রিলিয়ন ডলারের ট্রেজারী বন্ড দীর্ঘ মেয়াদের জন্য ধারণ করেছে। চীন যদি এই বিপুল অংকের ট্রেজারী বন্ড ধারণ না করত তাহলে ইহার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের দেশের ব্যাংকগুলি থেকে ঋণ নিতে হত, সে অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাংে কর সুদের হার বেড়ে যেত যাতে যুক্তরাষ্ট্রের সমগ্র অর্থনীতি উচ্চসুদের কারণে চাপে থাকত। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যে ব্যাপক অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিরাজ করছে তাতে কোন দেশ কিভাবে লাভবান হচ্ছে বা ক্ষদিগ্রস্থ হচ্ছে তা এত সহজে বুঝার বিষয় নয়। যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় বিনিয়োগকারীরা চীনে বিশাল অংকের পুঁজি বিনিয়োগ করছেন, নিশ্চয় তাঁরা বিশাল অংকের লভ্যাংশও পাচ্ছেন। কিন্তু প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত ২৫ই সেপ্টেম্বর তারিখে জাতিসংঘের সাধরণ পরিষদে যে বক্তৃতা দিয়েছেন তাতে চীনের সাথে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ফলে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে তার কোন ব্যাপক ব্যাখ্যা বা বিশ্লেষণ ছিলনা। তিনি টুইটারে যেভাবে সবসময় সাদামাটা বার্তা পাঠান, সাধারণ পরিষদে তাঁর বক্তৃতা অনেকটা সে রকমই ছিল। তাঁর জাতিসংঘের বক্তৃতা যে আমেরিকার পূর্ব-গৃহীত বাণিজ্যনীতি পরিপন্থি হচ্ছে তাও তিনি বুঝতে পেরেছেন বলে মনে হয়না। তিনি বলেছেন সারা বিশে^র দেশগুলির থেকে যেভাবে যুক্তরাষ্ট্র আমদানী করে তাতে যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক বাণিজ্যে ৮০০ বিলিয়ন ডলারের ঘাটতি হয়।কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রকে সে সব দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যে অনুপ্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। এই বক্তৃতার পরিপ্রেক্ষিতে চীন  "The facts on U.S.-China Trade Frictions " নামে  এক শে^তপত্র  বের করেছে। চীন এই শে^তপত্রের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে কোন ভাবেই যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনভাবেই যুক্তরাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছেনা বরং লাভবানই হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে যে ব্যাাপক ভিত্তিক অর্থনৈতিক সম্পর্ক গড়ে উঠেছে তার সব বাদ দিয়ে শুধু চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে আমদানী ও রপ্তানীর হিসাব দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বললে তা সত্যের অপলাপ ছাড়া আর কিছু নয়। চীন শে^ত পত্রে যে হিসাব দিয়েছেন এবং অর্থনীতির আলোকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন তা বিশে^র অর্থনীতিবিদেরা মেনে নিচ্ছেন। কিন্তু ট্রাম্প সাহেব তো অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই বক্তৃতা দেন নাই, তাঁর একটি মাত্র উদ্দেশ্য হলো তাঁর ভোটারদের সন্তুষ্ট করা। কাজেই তিনি বিশ^ায়নের কথা বলতেই পারেন না। তাঁকে বলতে হবে “America First” এই শ্লোগানের ফলে আমেরিকা থার্ড হয়ে গেলেও তাঁকে ফার্ষ্টই বলতে হবে। সে  জন্য তিনি জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বক্তৃতায় বলেছেন, “Reject the ideology of globalism and accept the doctrine of patriotism.” অর্থাৎ “বিশ^ায়নের আদর্শ প্রত্যাখান করুন এবং দেশপ্রেমের নীতি গ্রহণ করুন।” অথচ দ্বিতীয় বিশ^ যুদ্ধের শেষ সময়ে তদানীন্তন বিশে^র সেরা শক্তিশালী যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন এবং রাশিয়ার মধ্যে ১৯৪৫ সালে “পোটস্্ডামে” যে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান বলেছিলেন, “We believe that all states which are accepted in the society of nations should have access on the equal terms to the trade and raw-materials of the world.” “অর্থ্যাৎ আমরা বিশ^াস করি যে সব রাষ্ট্র আজ পরষ্পরের মধ্যে সামাজিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। তারা সবাই সমভাবে বিশে^র কাঁচামাল এবং ব্যবসার সমান সুযোগ ভোগ করবে।’ 

বর্তমান বিশে^র যে সব সমস্যাবলী বিশ^-বাসীকে গ্রাস করতে চলছে তা সমস্ত বিশ^বাসীর ঐক্যবদ্ধ এবং সামগ্রিক প্রয়াস ছাড়া সামাধান হওয়ার কোন সুযোগ নেই। মানবজাতির অস্থিত্ব রক্ষার্থে আজ বিশে^র সমস্ত দেশের ঐক্যের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। সে জন্য বর্তমান বিশে^ শুধু দেশপ্রেম (Patriotism) দিয়ে বৈশি^ক সমস্যার সামাধন হবেনা। বিশ^ তথা মানবজাতির প্রেম ছাড়া এসব সমস্যার সামাধান হওয়ার নয়। কাজেই ট্রাম্প সাহেব দ্বিতীয়বারের জন্য প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার জন্য যতই নাটক করেন না কেন আমেরিকানবাসী তা মানতে পারে না। কারণ এখনও আমেরিকাবাসী মানবতার কল্যাণে উৎসর্গিত অসংখ্য আমেরিকার মহান নেতাদের বাণী ভুলেন নাই। শে^তপত্রে চীন যেভাবে সমস্ত বিষয়টা পরিসংখ্যানের মাধ্যমে ব্যাখ্যা করেছেন তাতে  চীনের বক্তব্য গ্রহণযোগ্য না হওয়ার কোন কারণই  থাকতে পারেনা। আসলে বিশ^বাসী এক জোট হয়ে মানবাজতির ধ্বংসকারী বৈশি^ক  সমস্যাগুলির সামাধান হউক তা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চাননা। 

দ্বিতীয় বিশ^যুদ্ধের পর বহুজাতিক ব্যবসা চালু করার জন্য যে সব অবকাঠামো তৈয়ার করেছেন তাতে যুক্তরাষ্ট্রের অবদানই সবচাইতে বেশী। বিশ^ বাণিজ্যের সুবিধার্থে তখন যে সব চুক্তিগুলো করা হয়েছিল প্রায় খসড়াগুলি যুক্তরাষ্ট্রেরই তৈয়ারী। ১৯৪৭ সালে বিশ^ বাণিজ্য পরিচালনার্থে যে  GATT (General Agreement on tariff and Trade) তৈয়ার করা হয়েছিল তাতেও যুক্তরষ্ট্রের অগ্রণী ভূমিকাই ছিল। ১৯৯৫ ইংরেজী পর্যন্ত এই চুক্তির ভিত্তিতেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চলেছিল। পরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আরও সুশৃংখল এবং পারষ্পরিক সুবিধাজনক পর্যায়ে নেওয়ার জন্য ১৯৯৫ সালে World Trade Organization (WTO) সৃষ্টি করা হয়। এই সংস্থার সব সদস্যই বিশেষ সুবিধা লাভের অধিকারী। যাকে সংক্ষেপে বলা হয় (MFN) Most Favored Nation’s Treatment. বিশ^ বাণিজ্য সুবিধার্থে বিশ^ বাণিজ্য সংক্রান্ত সমস্ত আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলি যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগে এবং বিশেষ পৃষ্ঠপোষকতায় সৃষ্টি হয়েছিল। অথচ আজকে প্রেসিডেন্ট বলছেনFair Trade (নায্য বাণিজ্য),  “America First” (আমেরিকা প্রথম) ইত্যাদি।

    অবশ্য ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত ট্রাম্পের বর্তমান শ্লোগানগুলি যুক্তরাষ্ট্রেরই শ্লোগান ছিল। কিন্তু আমেরিকার তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট রুজভেল্ট “Reciprocal Trade Agreement Act” সই করার পর তা আইনে পরিণত হয়। তখন থেকে আমেরিকার বাণিজ্য নীতিতে রক্ষণশীলতা চিরতরে বিদায় করা হয়। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় যুক্তরাষ্ট্রকে ট্রাম্প সাহেব ১৯৩৪ সালের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে চান। অথচ WTO বা বিশ^ বাণিজ্য সংস্থা বলবৎ থাকতে ট্রাম্প সাহেব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নীতি নির্ধারণে যে সব পদক্ষেপ নিচ্ছেন তা আন্তর্জাতিক চুক্তির সরাসরি লংঘন যা একটি অত্যন্ত গণতান্ত্রিক দেশের পক্ষে বেমানান হচ্ছে এবং বিশ^বাণিজ্য সংস্থা সম্পর্কে যে সব অহেতুক মন্তব্য করছেন তাও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের জন্য মর্যাদাপূর্ণ হচ্ছেনা। 

    বর্তমানে চীন এই ব্যাপারে শে^তপত্র প্রকাশ করতে গিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থার প্রতি যে আনুগত্য দেখিয়েছেন তা অবশ্যই প্রশংসার যোগ্য এবং বিশ^বাণিজ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা অত্যন্ত জরুরী হয়ে পড়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের এসব আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সংস্থাগুলির সৃষ্টির পেছনে অতীতে মূল্যবান সক্রিয় সহযোগীতা থাকলেও বর্তমানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সংকীর্ণতার ফলে আমেরিকার দীর্ঘদিনের অবদান ম্লান হতে বসেছে। 

    যুক্তরাষ্ট্র একের পর এক চীনা পণ্যের উপর শুল্ক আরোপ করে চলেছে, চীনকে অর্থনৈতিক চাপে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলছে অথচ সর্বশেষে চীনের যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানীর পরিমাণ দেখলে, আমেরিকার ব্যর্থতায় ফুটে উঠে। গত সেপ্টেম্বর মাস (২০১৮) পর্যন্ত আমেরিকার সাথে চীনের উদ্ধৃত্ত দাঁড়িয়েছে ৩৪.১ বিলিয়ন ডলার, যা নতুন রেকর্ড বলে চীনের বাণিজ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।

    ট্রাম্পের বক্তব্য হলো চীনা পণ্যে সয়লাব হয়ে যাচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজার। চাকরি হারাচ্ছেন শ্রমিকেরা এবং বাণিজ্য ঘাটতি দেখা দিচ্ছে। একজন্যই চীনের বিভিন্ন পণ্য আমদানীর উপর শুল্কহার বাড়ানোর ঘোষণা দেন। তারপরও উপরোল্লিখিত হিসাব মতে  আমেরিকায় চীনের রপ্তানী এখনো বৃদ্ধি পাচ্ছে।

shahabuddinkhaled47@gmail.com