cplusbd

নিউজটি শেয়ার করুন

“আমেরিকা ফার্স্ট”

2018-06-30 07:05:40
1st Image

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধুরী: গত আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিবার্চনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শ্লোগান ছিল "America First" এই বৎসরের প্রথম থেকে এই শ্লোগান তিনি কঠিনভাবে বাস্তবায়িত করতে আমেরিকাকে বিশ্ব ব্যাপী বাণিজ্য যুদ্ধ শুরু করতে হয় এবং তাই ট্রাম্প সাহেব আরম্ভ করেছেন। এই যুদ্ধের হাল তিনি নিজেই ধরেছেন। চীনের সাথে এই যুদ্ধ আরম্ভ করতে গিয়ে যে অসুবিধাগুলির সম্মুখীন হয়েছেন তা আমি আমার গত প্রবন্ধে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছি। আমি লিখেছিলাম “চীন ২০১৮ সালের জানুয়ারী পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১.১৭ ট্রিলিয়ন ডলারের ট্রেজারী বন্ড ক্রয় করেছে। ইহা দ্বারা চীন আমেরিকার ব্যাংকের সুদের হার কম রাখার ব্যাপারে বিরাট অবদান রেখেছে। চীন যদি ট্রেজারী বন্ড ক্রয় না করত তাহলে আমেরিকার ফেডারেল সরকার বাজেটের জন্য ব্যাংক থেকে এই টাকা নিতে হত, তাতে আমেরিকার ব্যাংকের সুদের হার অনেক বেড়ে যেত। ফলে আমেরিকা সহ অন্যান্য দেশে এতদিনে অর্থনৈতিক মন্দার ফলে বিশে^ বিশেষ করে আমেরিকা ও চীনের উৎপাদিত দ্রব্যের চাহিদাও কমে যেত। এসব চিন্তা ভাবনা করে ট্রাম্প সাহেব চীনের সাথে বাস্তব সম্মত আলাপ আলোচনা শুরু করেছেন বলে মনে হয়।” সম্প্রতি আমেরিকা ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, মেক্সিকো ও কানাডা থেকে আমদানী করা ইস্পাতের ওপর ২৫ শতাংশ এবং অ্যালুমিনিয়মের উপর ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। ইহা দ্রুত কার্যকর করা হবে বলে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের এই সিন্ধান্তের বিরুদ্ধে কানাডার প্রেসিডেন্ট, জার্মান চ্যান্সেলর মার্কেল এবং ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছেন, বৃটেন ও গভীর হতাশা প্রকাশ করেছে। ইইউ এর বাণিজ্য বিষয়ক কমিশনার ম্যালস্ট্রম বলেছেন, “বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য ইহা এক কালো দিন,” ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট জ্যা ফ্লদে জ্যাঙ্কার বলেছেন, “এই পদক্ষেপ কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায়না।” বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় বিষয়টি জরুরীভাবে তোলা হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানী পণ্যের উপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করা ছাড়া ইইউ আর কোন বিকল্প পথ নেই। ইইউ পাল্টা কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করলে পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকে যাবে বলে এক মার্কিন কর্মকর্তা ইতি মধ্যেই হুমকি দিয়েছেন।
ফ্রান্সের অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘ইইউ বাণিজ্য যুদ্ধ চায়না” কিন্তু ওয়াশিংটন শুল্ক আরোপ করলে ইইউ পাল্টা জবাব দেবে বলে তিনি হুশিয়ারী উচ্চারণ করেন। যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক আরোপিত ইস্পাত, ইয়োগহার্ট, হুইস্কি ও রোস্টেড কপির মতো ভোগ্য পণ্যের উপর পাল্টা শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছে কানাডা। মেক্সিকো সরকার ও ঘোষণা দিয়েছে তারাও যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানী করা ইস্পাতের উপর শুল্ক ধার্য করার চিন্তা করছে। শূকরের মাংস, আপেল, আঙ্গুর এবং পনিরও এই তালিকায় থাকবে বলে জানিয়েছেন মেক্সিকোর সরকার। জানা যায় ফরাসী প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল ম্যাক্রো মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাথে সরাসরি ফোনে আলাপ করেছেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপগুলোকে অবৈধ আখ্যা দিয়েছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়ন আমেরিকার এসব পদক্ষেপগুলোর উপযুক্ত জবাব দিবে বলে উনি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে পরিষ্কাভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার দীর্ঘদিনের এই দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যযুদ্ধ আরম্ভ হয়েছে এবং অল্প সময়ে চরম পর্যায়ে পৌছে গেছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সমস্ত দেশগুলি, কানাডা এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলিসহ বিশ্ব বাণিজ্যের সাথে সম্পৃক্ত, প্রায় দেশ একমত যে বিশ্ব বাণিজ্যের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র যে সব পদক্ষেপ নিচ্ছে তা বিশ্ব বাণিজ্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সমতুল্য। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট ম্যাক্রোন সাংবাদিকদের সাথে আলাপে এ ব্যাপারে বলেছেন, "A mistake in many ways because it responds to existing international imbalance in the worst way by breaking up and creating economic nationalism." অর্থ্যাৎ “ইহা বহুদিক দিয়ে এক ভুলপদক্ষেপ, এই পদক্ষেপ অর্থনৈতিক জাতীয়তাবাদ সৃষ্টি করে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ভারসাম্য নষ্ট করে দিবে। ”
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প শপথ নেওয়ার পর পরই ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং জাপানের প্রধানমন্ত্রী যেভাবে ঘন ঘন আমেরিকা সফরে যাচ্ছিলেন তখন বলা হয়েছিল যে, আমেরিকার নেতৃত্বে ভারত, জাপান, অষ্ট্রেলিয়া ইত্যাদি দেশগুলিকে নিয়ে একটি অর্থনৈতিক জোট করবে। তাতেও গুঁড়ে বালি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনে হয় বুঝতে পেরেছেন আমেরিকার উপর নির্ভর করা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। কারণ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সাহেব, বিশ্বের সেরা কূটনীতিবিদদের মতে "A Dangerous Prisoner of indecision" অর্থ্যাৎ “ আমেকিার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সিদ্ধান্তহীনতার একজন ভয়ংকর কয়েদী,” এই পরিস্থিতি ভারতকে চীনের কাছাকাছি এনে ফেলেছে। নরেন্দ্র মোদী আগে যে অবস্থানে থাকুক না কেন, এখন মনে হচ্ছে চীনের সাথে সহযোগীতামূলক অবস্থান সৃষ্টির জোর প্রয়াস আরম্ভ করেছেন। চীনের শহর য়ুহানে, যেখানে চীনের মহান নেতা ম্যাং সেতুং জীবিতকালে অবসর যাপন করতেন, সে শহরেই সম্প্রতি চীনের প্রেসিডেন্ট শিং জিন পিং এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর মধ্যে আনুষ্ঠানিক দীর্ঘ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিন্তু ইহা যে সাম্প্রতিক বিশ্বে বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতির আলোকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার তা কেহ অস্বীকার করতে পারবেন না। আসলে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের গৃহীত "America First" নীতির ফলে, আমেরিকার বর্তমানে গৃহীত বাণিজ্যক্ষেত্রে সমস্ত ব্যবস্থাগুলি, বিশ্বের সব চাইতে জনপ্রিয় “বিশ্বায়ন নীতির” বিরুদ্ধে চলে গেছে। অথচ বর্তমান বিশ্বে প্রায় ৮০ ভাগ লোক বিশ্বায়নের পক্ষে সোচ্চার । এই পরিস্থিতিতে আমেরিকা সমস্ত বিশ্ব জনমত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
ভারতকে আরেকটি বিষয় গভীর চিন্তিত করেছে তা হলো তার নিকটতম প্রতিবেশী দেশগুলি চীনের সাথে যৌথভাবে কাজ শুরু করেছে। বাংলাদেশ, মালদ্বীপ, মিয়ানমার, পাকিস্তান, নেপাল ও শ্রীলংকা এসব দেশে চীন প্রায় দেড়শ বিলিয়ন ডলার ইতিমধ্যে বিনিয়োগ করেছে এবং আরও নুতন নুতন প্রকল্পের বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুতি চলছে।
ইতিমধ্যে এক খবরে জানা গেছে মোদী ও শিং এক আলোচনায় বি. সি. আই. এম. প্রকল্প এখন শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
অবশ্য নরেন্দ্র মোদী ক্ষমতায় আসার পর যুক্তরাষ্ট্রের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা মিলে, উভয়েই ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে সব সামরিক ও আধাসামরিক চুক্তিগুলি সই করেছেন তার থেকে ভারতের বের হয়ে যাওয়ার কোন সহজসাধ্য পথ আছে বলে মনে হয় না। এমনকি প্রয়োজনে ভারতীয় সেনাঘাঁটি যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবহারের অনুমতি দিয়ে উভয়দের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
তবে চীন ও ভারতের সাথে যতই সম্পর্ক দৃঢ় হউক না কেন কতগুলো ব্যাপারে চীনকে কোন অবস্থাতেই নিজের অবস্থান থেকে সরানো সম্ভব হবে না। যেমন-
ক. কোন অবস্থাতেই চীন পাকিস্তানের সাথে বন্ধুত্ব শিথিল করবেনা।
খ. জাতিসংঘের কোন উচ্চাসনে ভারতের প্রার্থিতা চীন সমর্থন করতে পারেনা এবং প্রয়োজনে বাধার সৃষ্টি করবে।
গ. নিউক্লিয়ার সাপ্লার্য়স গ্রুপের সদস্য হিসাবে ভারতের অন্তর্ভুক্তি মেনে নেবেনা এবং প্রয়োজনীয় বাধার সৃষ্টি অবশ্যই করবে।
ঘ. ভারতের বাজারে চীনা পণ্যের প্রায় অবাধে প্রবেশ থাকলেও চীনের বাাজারে ভারতীয় পণ্যের প্রবেশাধিকার ব্যাপারে চীন খুব একটা ছাড় দেবে বলে মনে হয়না।
ঙ. ভারতের সাথে যে সীমান্ত বিরোধ রয়েছে এবং চীন ভারতীয় ভূ-খন্ডের যে সব অংশগুলি দাবী করে তাতেও চীন উল্লেখযোগ্য ছাড় দিবে বলে মনে হয় না।

আসলে বিশ্বে উদার "Free Trade" বাণিজ্য নীতির নামে যা চলছে এবং পরাশক্তির ভূমিকা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত লেখক এবং গবেষক নোয়াম চমস্কি লিখেছেন, "In brief, what we have we keep, closing the door to others, what we do not have, must be open to free competition. This is incidentally, the way "Free Trade" and the "open door" commonly function in practice.
অর্থ্যাৎ “সংক্ষেপে, আমাদের যা আছে তা আমাদেরই থাকবে এবং অন্যদের জন্য এর দরজাবন্ধ থাকবে, যেগুলো আমাদের কাছে নাই, তা সবার প্রতিযোগীতার জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। বাস্তবে এভাবেই মুক্ত বাণিজ্য এবং মৃক্ত দ্বার বিশ্বে বিারজ করছে।”
যে যত কথাই বলুক, বিশ্বে বর্তমান পরাশক্তি দুটি, ১। যুক্তরাষ্ট্র এবং ২। চীন। চমস্কির কথা বর্তমান বিশ্বে উভয়ের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য।
shahabuddinkhaled47@gmail.com