cplusbd

নিউজটি শেয়ার করুন

ফিলিস্তিনিদের উপর ইসরাইলী বর্বরতা

2018-06-25 09:53:55
1st Image

শাহাবুদ্দীন খালেদ চেীধুরী: গত সোমবার ১৪ই মে, ২০১৮ তেল আবিব থেকে জেরুজলেমে ইসরাইলের, রাজধানী স্থানান্তর ও একই সাথে ইসরাইল রাষ্ট্রের ৭০ বৎসর পূর্তি উদযাপন উপলক্ষে জমকালো অনুষ্ঠান হয়েছে। এই উপলক্ষে ইসরাইল নতুন মুদ্রা চালু করেছে। ধাতব মুদ্রায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের চেহারাও দেওয়া হয়েছে। গাজার ফিলিস্তিনিরা বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ করেছে। পূর্ব জেরুজালেমে স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের রাজধানী করার কথা রয়েছে। ১৯৬৭ সালের ৬ দিনের যুদ্ধের সময় ইসরাইল পুরো গাজা ভূখন্ড দখল করে নেয়। গাজার ফিলিস্তিনিরা প্রতিবাদ ও বিক্ষোভ করেছে। তাদের উপর নেমে আসা নির্বিচারে গুলি এর প্রতিবাদ জানিয়েছে কয়েকটি দেশ। গত ৭০ বৎসর ধরে এভাবে নির্মম নির্যাতন ফিলিস্তিনিদের উপর চলছে। আজ পর্যন্ত এই অত্যাচার এবং অমানবিক নির্যাতনের জন্য একজন ইহুদিকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয় নাই। এইবারে এই পর্যন্ত মৃতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০০। ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় ৭লাখ ফিলিস্তিনি বস্তুহারা হয়েছে। ৫০০ বাড়িঘর নিশ্চিহ্ন হয়েছে। ইহুদি রাষ্ট্রটি সৃষ্টি হওয়ার পর থেকে এই পর্যন্ত ৫১ লাখ মানুষ ইহুদিরা হত্যা করেছে।
জেরুজালেমে রাজধানী স্থানান্তর আনন্দের না হয়ে রক্তাক্ত হওয়ার কারণে খোদ আমেরিকার ইহুদি আমেরিকানরা মিছিল ও বিক্ষোভ করেছে। আমেরিকার সংবাদ মাধ্যম এবং অন্যান্য মিডিয়া এব্যাপারে সরগরম। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এই অবস্থায় আইন জারি করেছে, ইসরাইলের বিরুদ্ধে কোন সমালোচনা করা যাবেনা। এমন হলে তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে।
জেরুজালেমে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত অফিস উদ্বোধন অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেয়ের জামাতা কুশনার উপস্থিত ছিলেন। ঐ অনুষ্ঠানে তিনি ঘোষাণা করেন, “আমি আজ খুব গর্বিত জেরুজালেমে উপস্থিত হতে পেরে, এই স্থানটি অনন্তকাল ইহুদিদের হৃদয়ে রয়েছে।” এখানে উল্লেখ্য যে, কুশনার একজন ইহুদী ধর্মালম্বী এবং শুনা যায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কন্যা যিনি কুশনারের স্ত্রী, ইভাংকাও ইহুদী ধর্ম গ্রহণ করেছেন।
সম্প্রতি পশ্চিম তীরের শহর “সুফিয়াকে” ধ্বংস না করার জন্য চিঠি লিখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ডেমোক্রেটিক পার্টির ৬৬ জন কংগ্রেসম্যান। ইসরাইলী দৈনিক “হারেৎজ” এই খবর জানিয়েছে। চিঠিতে মার্কিন আইন প্রণেতারা বলেছেন, পশ্চিম তীরে শুধু ইহুদিদের জন্য বসতি সম্পসারণ এবং সেখান থেকে প্যালেষ্টাইনিদের উৎখাত সাধারণ মূল্যবোধ এবং মানবাধিকারের লঙ্ঘন। এতে বলা হয় এই রকম এক তরফাভাবে ভূমির পরিবর্তন করছে এবং প্রত্যাশিত দুই রাষ্ট্র সামাধারের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্থ করছে। কংগ্রেসম্যানদের এই চিঠিকে স্বাগত জানিয়েছে “জেষ্টিক” নামে ইহুদিদের এক সংগঠন। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিকসংগঠনটি ফিলিস্তিন-ইসরাইল সংঘর্ষের শান্তিপূর্ণ সামাধানের জন্য কাজ করে যাচ্ছে।
১৫ই মে ১৯৪৮ ইংরেজীতে ফিলিস্তিনী ভূমি দখল করে ইসরাইল রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এবারের কর্মসূচীর শেষ ২ দিনে জেরুজালেমে মার্কিন দূতাবাস স্থানান্তরকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভ জোরালো হয়ে উঠলে ৬০ ফিলিস্তিনীকে হত্যা করে ইসরাইলী বাহিনী। আর ইসরাইলের সবোর্চ্চ আদালতের কাছে সেনাবহিনীর গুলির বৈধতা জানতে চেয়ে আবেদন করেছিলেন মানবাধিকার সংস্থাগুলি। তাজা গুলি চালানোর সেনাবাহিনী নীতিকে সমর্থন জানিয়েছেন ইসরাইলের সুপ্রিমকোর্র্ট। গত ২৫ মে (২০১৮) সুপ্রিমকোর্টের তিন বিচারপতির মানবাধিকার কর্মীদের দায়ের করা দু’টি পিটিশন সর্বসম্মতিক্রমে খারিজ করে দেন। এর ফলে ফিলিস্তিনি বিক্ষোভকারীদের উপর ইসরালী সেনাবাহিনী গুলি বর্ষন আইনতঃ সিদ্ধ হয়ে গেল।
১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার সময় যে নীতি গ্রহণ করা হয়েছিল, সে নীতিই ছিল ভ্রান্তিপূর্ণ, নীতিহীন এবং অবাস্তব। এই নীতিই হল সমস্ত বিভাদের কারণ। যতক্ষণ ইসরাইল এ নীতির থেকে বের হয়ে না আসবে এবং মূল্যবোধের উপর ভিত্তি করে এ সমস্ত সমস্যার সামাধানের চেষ্টা না করবে ততদিন এভাবে চলতেই থাকবে। ইসরাইল প্রত্যেক যুদ্ধে জিততে পারে কিন্তু শান্তির দেখা পাওয়ার কোন সম্ভবনা থাকবেনা। ইসরাইলের প্রাক্তণ প্রধানমন্ত্রী এবং ইসরাইল রাষ্ট্রের সস্থপতিদের অণ্যতম “গোল্ডামেয়ার” এর একটি উক্তি বিশ্লেষণ করলে আমার উক্ত বক্তব্যের সারবত্তা পরিষ্কার হবে বলে আশা করি। তিনি বলেছেন, মনে করা যাক প্যালেসতিনে ফিলিস্তিনরা ছিলনা, আমরা আসলাম এবং আমরা তাদেরকে ফিলিস্তিনি মনে করে তাড়িয়ে দিলাম এবং তাদের দেশ দখল করে নিলাম। তাদের অস্থিত্ব আর রইলনা। যে রাষ্ট্রের স্থপতিদের মুখ দিয়ে উপরোক্ত বক্তব্য বের হতে পারে যার মধ্যে নূন্যতম নৈতিকতা নেই। উপরোক্ত বক্তব্য যাঁরা দিতে পারেন, তাঁদের গড়া রাষ্ট্র শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও, নৈতিক ভিত্তির অভাবে এ রাষ্ট্র যে একদিন বিলীন হয়ে যাবে তাতে কোন সন্দেহের কারণ থাকতে পারেনা।
ইসরাইলী কোর্ট ১৯৬৯ সালে এইভাবে রায় দিয়েছিল যে ইসরাইলের সাথে আরব রাষ্ট্রগুলোর সমস্যাবলীতে ফিলিস্তিনিরা কোন পক্ষভুক্ত নহে। এই পরিস্থিতিতে ফিলিস্তিনিরা সন্ত্রাসী না হয়ে অন্য কি উপায় বা আছে ? ব্যাপারটা যেন এমন ইসরাইলী রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রয়োজন ফিলিস্তিনের অস্থিত্বকে অস্বীকার করতে হবে। বিভিন্ন ইহুদী রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ইসরাইলের অস্থিত্ব টিকিয়ে রাখতে ফিলিস্তিনিদের বিলুপ্ত করে দেওয়ার কোন বিকল্প নাই।
ইসরাইলের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী বেনগুরিয়াকে যখন প্রশ্ন করা হয়েছিল, ফিলিস্তিনিদের অবস্থা কি হবে ? তিনি বলেছেন ‘বৃদ্ধরা মরে যাবে, তরুণেরা ভুলে যাবে’ তিনি যা ভেবেছিলেন, সে অনুযায়ী বৃদ্ধরা মরেছে ঠিকই তবে তরুণেরা ভুলে যায় নি। মাতৃভূমি ফিলিস্তিনের প্রতি ইঞ্চি মাটির সাথে তাদের আত্মিক সম্পর্ক পরবর্তী প্রজন্মের সাথে আরও দৃঢ়তর হচ্ছে। বর্তমান ইসরাইল শুধু জর্ডান ও ভূমধ্যসাগরের তীরে বসবাসকারী ছয় মিলিয়ন ফিলিস্তিনিদের সাথে লড়লে হবেনা বরং আরও যে ছয় মিলিয়ন ফিলিস্তিনি ফেরার অপেক্ষায় আছে তাদের সাথেও যুদ্ধ করতে হবে। আমেরিকার মোটা বুদ্ধি সম্পন্ন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বুঝতে না পারলেও ইসরাইলিরা প্রতিনিয়ত এই কথা হাঁড়ে হাঁড়ে টের পাচ্ছে।
মেনাচেম বেগিন ছিলেন ইহুদীদের আরেক বরেণ্য নেতা এবং ইসরাইলের প্রাক্তণ প্রধানমন্ত্রী। তিনি প্যালাসটাইনকে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্যে অন্তর্নিহিত বিপদ রয়েছে, তা অকপটে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেছেন প্যালেসটাইনকে স্বীকৃতি দিতে সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে। আপনি যদি প্যালেসটাইনের ধারণাকে স্বীকৃতি দেন তখন নিজের বাঁচার অধিকারকে নিঃশেষ করে দেন। যদি ইহা প্যালেসটাইন হয় তাহলে বলতে হবে এভূমি সে সব লোকের যারা তোমরা (ইহুদী) এখানে আসার আগ থেকে এই জায়গায় বাস করেছিল। যদি এই ভূমি ইসরাইলের হয় কেবল তখনই তোমরা (ইহুদীরা) এখানে বসবাস করার অধিকার রাখবে। এই ভূমি যদি তোমাদের পিতৃভূমি বা তোমাদের পূর্বপুরুষের না হয়ে থাকে তাহলে তোমরা এখানে কি করছ ? বর্তমানে তারা দাবী করছে যে তোমরা তাদের মাতৃভূমি দখল করেছ, সেখানে থেকে তাদেরকে বিতাড়িত করেছ এবং তাদের জমি দখল করে আছ।” উপরোক্ত নীতির উপর এখনও ইসরাইলী নেতৃত্ব ভিত্তি করে আছে। এর ফলে যদি আপনি ইসরাইলকে স্বীকৃতি দেন তাহলে অবশ্যই আপনি প্যালেস্টাইনের অস্থিত্বকে অস্বীকার করতে হবে।
ইসরাইলের বিখ্যাত লেখক ‘এমোস ওঝ’ খুব সুন্দর ভাবে দুই প্রক্ষরই অসহায়ত্বের কথা বর্ণনা করেছেন। ‘ইহা তাদেরও দেশ, আমাদেরও দেশ, ইহা অধিকারে অধিকারে সংঘর্ষ। তিনি এই অবস্থাটাকে অত্যন্ত বিয়োগান্তক দৃশ্য বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেছেন- ‘ইহা দুটি সর্বাত্মক ন্যায় পরায়নতার মধ্যে সংঘর্ষ। আমরা এখানে আছি কেন ? কারণ আমরা জাতি এবং ইহুদী হিসাবে কোথাও ঠিকতে পারবনা। আরবরা এখানে আছে কেন? কারণ প্যালেসটাইন ফিলিস্তিনিদের মাতৃভূমি।”
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নাই যে, ফিলিস্তিনি এবং ইসরাইলের মধ্যে যদি শান্তি স্থাপন করতে হয় তা শুধু যুক্তরাষ্ট্র্রের পক্ষেই সম্ভব ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য প্রেসিডেন্টের আমলে ইহা আশা করা গেলেও বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আমলে বিভিন্ন কারণে ইহা অসম্ভব। বিভিন্ন কারণে তিনি নেতানিহুয়ার থেকে বেশী প্রো-ইসরাইলী। বর্তমানে আরবদেশগুলির পক্ষ থেকে কুয়েত কর্তৃক উত্থাপিত গাজাও পশ্চিমতীরে ফিলিস্তিনিদের রক্ষার আহ্বান জানিয়ে প্রস্তুত করা জাতিসংঘের একটি খসড়া প্রস্তাবে যুক্তরাষ্ট্র কোন প্রশ্ন ছাড়াই ভেটো দেবে বলে জানিয়েছেন মার্কিন রাষ্ট্রদূত নিক্কি হ্যালি।