cplusbd

নিউজটি শেয়ার করুন

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখন বোল্টনের ফাঁদে

2018-06-10 08:28:21
1st Image

শাহাবুদ্দীন খালেদ চেীধুরী: ইরানের কট্টর বিরোধী এবং ইসরাইল ঘেঁষা মাইক পম্পেও যুক্তরাষ্ট্রের সদ্য পদত্যাগকারী পররাষ্ট্র সেক্রটারী টিলারসনের স্থলে পররাষ্ট্র সেক্রেটারি হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। নিয়োগের পর পরই বিভিন্ন দেশে সফর শুরু করেন। প্রথমে তিনি ইসরাইল, সৌদি আরব ও জর্ডান সফর করেন। সে সব দেশে তিনি প্রায় একই বক্তব্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন বিশ্বে সন্ত্রাসীদের সব চাইতে বড় পৃষ্টপোষক হলো ইরান। তিনি আরও বলেছেন, কোন অবস্থাতেই ইরানকে পারমাণু অস্ত্র তৈয়ার করতে দেওয়া হবেনা। লক্ষ্যনীয় বিষয় হলো, মাইক পম্পেও কে পররাষ্ট্র সেক্রেটারী হিসাবে মনোনয়ন দেওয়ার সাথে সাথেই, ৯ই মে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সাথে স্বাক্ষরিত পরমাণবিক নিষেধাজ্ঞা চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নেয় এবং ইরানের উপর কঠোর নিষেধাজ্ঞা আরোপের ঘোষণা দেন। ট্রাম্পের এই ঘোষণায় শুধু ইসরাইল ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় বন্ধু রাষ্ট্র এই সিন্ধান্তের বিরুদ্ধে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র সহ যারা ইরানের সাথে পারমাণবিক নিষেধাজ্ঞা চুক্তি সই করেছিলেন তাদের মধ্যে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানী, চীন এবং রাশিয়া অন্তর্ভুক্ত ছিল। চুক্তিভুক্ত প্রায় দেশ ইতিমধ্যে ইরানে যথেষ্ট পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করেছে এবং চুক্তির বাহিরের অনেক দেশও উল্লেযোগ্য পরিমাণ পুঁজি বিনিয়োগ করেছে। ট্রাম্পের এই ঘোষণার পর এসব দেশের বিনিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়েছে। কাজেই এসব দেশগুলি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সত্ত্বেও বর্তমানে ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানাচ্ছে। নুতন পররাষ্ট্র সেক্রেটারী মাইক পম্পেও ইরানকে ১২টি শর্ত দিয়েছেন। তিনি বলেছেন ইরানকে তার আভ্যন্তরীণ এবং পর-রাষ্ট্র নীতি পাল্টাতে হবে। এবং ইরানের সাথে নুতুন পারমাণবিক নিষেধাজ্ঞা চুক্তির জন্য ১২টি শর্ত মানতে হবে। অন্যথায় ইতিহাসের সবচাইতে কঠিন অবরোধের সম্মুখীন হবে বলে ইরানকে হুশিয়ার করা হয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য শর্ত হলো ইরানকে সিরিয়া থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করতে হবে। ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচী বন্ধ করতে হবে। পরমাণু সমৃদ্ধ সমরাস্ত্র বন্ধ করতে হবে। এছাড়াও হামাস এবং হিজবুল্লার প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার করতে হবে ইত্যাদি। বিশ্বের বিশিষ্ট কূটনৈতিকদের মতে যে সব শর্তাবলী ইরানকে দেওয়া হয়েছে তা ইরানকে মানার জন্য দেওয়া হয় নাই তা প্রত্যাখান করার জন্যই দেওয়া হয়েছে। যাতে আমেরিকার আসল এজেন্ডা সম্ভবত যুদ্ধ বাস্তবায়িত করতে পারে। ইউরোপিয়ান রাষ্ট্রগুলো যুক্তরাষ্ট্রের এই এজেন্ডাকে কিছুতেই সমর্থন দিতে পারেনা। কারণ ইতিমধ্যেই সিরিয়ার যুদ্ধ এবং ইয়েমেনের যুদ্ধের কারণে লক্ষ লক্ষ শরণার্র্থী ইউরোপে প্রবেশ করেছে এবং অনেকটা বাধ্য হয়ে মানবতার কারণে ইহাদেরকে আশ্রয় দিতে হয়েছে। এসবের উত্তরে ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেছেন, “যে ব্যক্তি বহু বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তি করেছেন তিনি এখন পর-রাষ্ট্রমন্ত্রীর পদে বসে ইরানের কর্তব্য নিধারণ করবেন তা মেনে নেওয়া যায় না।”
এদিকে ইরানের সাথে চুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পর-রাষ্ট্র সেক্রেটারী যে সব শর্ত দিয়েছেন তার বাস্তবায়নে প্রশ্ন তুলেছেন বৃটিশ পর-রাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন সম্প্রতি বুয়েন্স আয়ার্সে জি২০ ভুক্ত দেশগুলির পর-রাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের অবকাশে তিনি বলেন পম্পেও দেয়া শর্তাবলী একটি চুক্তির মাধ্যমে আসা অসম্ভব ব্যাপার বলে তিনি মন্তব্য করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সেক্রেটারীর কথা শুনে তদানীন্তন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারের তৎকালীন ইরাকের প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনকে দেওয়া হুশিয়ারীর কথা মনে করিয়ে দেয়। তখন তিনি বলেছিলেন, আমরা আপনাকে ধাওয়া করতে আসছি। কোন যদি, কোন কিন্তু, কোন সম্ভাবনার কথা বলবেনা। পরিবর্তন হও বা পরিবর্তন করা হবে।” শক্তিশালী দেশগুলির এরূপ ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ যুগে যুগে বিশ্বে অশান্তি, যুদ্ধ ও বিগ্রহের সৃষ্টি করেছে এবং এখনও তাই সমানে চলছে।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, অনেক কুর্কীতির রূপকার মি: বোল্টনকে তাঁর নুতন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসাবে নিয়োগ দান করেছেন। তিনি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট সিনিয়ার বুশ, রিগন এবং জুনিয়ার বুশের সাথে ঘনিষ্টভাবে কাজ করেছেন এবং আমেরিকার তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ এবং তদানীন্তন বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ারকে ইরাকে গণ বিধ্বংসী অস্ত্রের অস্থিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত করার ব্যাপারে তার যথেষ্ট প্রয়াস ছিল। অথচ মার্কিন, বৃটিশ এবং অন্যান্য মিত্র দেশের হাজার হাজার সৈন্য নিহত হয়েছে। এই যদ্ধে ইরাকের হাজার বছরের পুরানো সভ্যতা আজ ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে। যুক্তরাষ্ট্র বা তার মিত্রদেশগুলোরই বা কি লাভ হয়েছে ? অর্থনীতির ছাত্র হিসাবে আমি অনেক চিন্তা করেছি কিন্তু আমেরিকা বা তার মিত্র দেশগুলোর কোন উপকার হয়েছে বলে আমার মনে হয় নাই। স্ত্রী বিধবা হয়েছে, লক্ষ লক্ষ সন্তানেরা পিতৃহারা এতিম হয়েছে, কোটি কোটি ডলারের সম্পদ নষ্ট হয়েছে। সবচাইতে মানবজাতির ক্ষতি হয়েছে কেননা এই যুদ্ধের ফলে “মানবতার চরম অবক্ষয়” ঘটেছে। গণবিধ্বংসী অস্ত্রের কোন অস্থিত্ব ইরাকে নাই এ ব্যাপারে যখন সবমহল একমত হলো তখন জুনিয়ার বুশ যে অনুশোচনা করেছিলেন তা হলো, “ যখন কথিত মারণাস্ত্র পাওয়া যায় নাই তখন আমার মত কেহ রাগান্বিত বা আঘাত প্রাপ্ত হয় নাই। এখনও যখন এই বিষয়ে চিন্তা করি তখন আমি পীড়াগ্রস্থ হয়ে যাই। এখনও আমার সে অবস্থাই চলছে।” প্রেসিডেন্ট বুশের (জুনিয়র) এই দুর্দ্দশার কথা কষ্ট করে যদি ট্রাম্প সাহেব একটু তাঁর লেখা "Decision Points" নামক বই থেকে পড়ে নেন আমার মেন হয় বিশ্ববাসী অশেষ উপকৃত হবে। যখন একসময় সত্যিকারের ইতিহাস লেখা হবে তখন বোল্টনের মত উপদেষ্টারা মানবতার শত্রু হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। বোল্টনের অনেক দিনের প্রয়াস যেন যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে আক্রমণ করে। ইসরাইলের সাবেক প্রতিরক্ষা মন্ত্রী শাউল মোফাজ স্বীকার করেছেন যে বোল্টন তাঁকে ইরানে হামলা চালানোর কথা বলেছিলেন। কিন্তু ইসরাইল তা চায় নাই। ইসরাইল চায় আমেরিকা সরাসরি ইরানকে আক্রমণ করুক। “সেকেন্ড ডিফেন্স লাইন” হিসাবে কাজ করতে রাজী আছে ইসরাইল। তাহলে এখন কি দাঁড়ালো ? বোল্টন চরম ইসরাইল পন্থী, মাইক পম্পেও এবং উভয়ই মুসলিম বিদ্বেষী এবং ইসরাইল পন্থী “গিনা হাসপেলকে” সি.আই.এর প্রধান হিসাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এই মহিলা থাইল্যান্ডে আমেরিকার নির্যাতন সেলে মুসলিম নেতাদের উপর অমানবিক নির্যাতন চালাতেন। ট্রাম্প সাহেব নিজেও বহু আগে থেকেই “ইসলাম ফোবিয়া” রোগে আক্রান্ত, চরম ইরান বিদ্বেষী এবং ইসরাইল পনন্থী। এভাবে ইসরাইল পনন্থী একটি শক্তিশালী টিম একই সময়ে হোয়াট হাউসে পাওয়া দুষ্কর। শত বৎসরেও এই রাহুর সাহায্য পাওয়া সম্ভব নয়। কাজেই বিশ্বে যাঁরাই ইরানের অস্তিত্বের বিলোপ কায়মনোবাক্যে কামনা করে তাদের জন্য এই সুযোগ পরবর্তী এক শতাব্দীতেও আশা কারা যায় না।
২০০২ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশের বোল্টন ইরান বিষয়ক উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছিলেন। তখন থেকেই তিনি ইরানকে আক্রমণ করার বিভিন্ন অজুহাত সৃষ্টি করার প্রয়াস চালিয়ে ছিলেন এবং এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় সহযোগীতা ইসরাইল দিয়েছিলেন। বর্তমানে সৌদি আরব ও আরব আমিরাত সহ কয়েকটি দেশ ইয়েমেনে সামরিক হামলা চালাচ্ছে। আমেরিকা এই যুদ্ধে অস্ত্র দিয়ে তাদেরকে সাহায্য করছে। ইরান ইয়েমেনের বিরুদ্ধে সৌদি আরবের এই যুদ্ধ রুখতে আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ফলে ইরানের বিরুদ্ধে এবং আমেরিকার পক্ষে ইসরাইল ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ কয়েকটি দেশ জোটবদ্ধ হয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যে আমেরিকার বিভিন্ন স্থাপনার উপর ইরানের আক্রেমণের সক্ষমতা রয়েছে এবং হরমুজ প্রণালীও অচল করে দেওয়ার সক্ষমতা আছে।
যাই হউক, বর্তমানে ইরানের সাথে নতুন আণবিক অস্ত্র নিষেধাজ্ঞার জন্য যুক্তরাষ্ট্র যে সব কঠিন শর্তাবলী পেশ করেছেন তা ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানী প্রত্যাখ্যান করেছেন এবং তিনি বলেছেন সার বিশ্বের পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের দাবী দাওয়া পেশের সময় শেষ হয়েছে। ইরানের বিপক্ষে বিশ্বের পক্ষ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোন সিদ্ধান্ত নেওয়ার নৈতিক অধিকার ইতিমধ্যেই হারিয়েছে। এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নুতন পররাষ্ট্র সেক্রেটারী মাইক পম্পেও ইরানের উদ্দেশ্যে ঘোষিত ১২ দফা দাবী মেনে নেওয়ার জন্য ইরানকে বলেছেন, অন্যথায় ইরানের উপর অভাবনীয় অর্থনৈতিক চাপের সৃষ্টি করবেন বলে তিনি হুশিয়ারী উচ্চারণ করেছেন।
বর্তমানে একটা আশার বিষয় হলো ইরাক আক্রমণের সময় যেভাবে ইউরোপিয়ান দেশগুলোর সমর্থন এবং বৃটেন, ফ্রান্স ইত্যাদি দেশগুলোর প্রত্যক্ষভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিল সে অবস্থা এখন আর নেই। কূটনীতির দিক দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আজ প্রায় একঘরে। প্রত্যক্ষ যুদ্ধে না জড়ালেও কূটনৈতিকভাবে ইউরোপের সমস্তদেশগুলি এবং রাশিয়া ও চীন আমেরিকার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবে। এমনও হতে পারে বিশ্বে পরাশক্তি হিসাবে হয়ত এটাই হবে তার শেষ নাট্যাভিনয়।