cplusbd

নিউজটি শেয়ার করুন

ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো যাঁর বন্ধু আছে, তাঁর শত্রুর কি প্রয়োজন!

2018-06-04 08:10:49
1st Image

শাহাবুদ্দীন খালেদ চেীধুরী: ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের নেতৃবৃন্দ সম্প্রতি বুলগেরিয়ায় ‘সম্মিলিত ইউরোপিয়ান ফ্রন্ট’ গঠন করার জন্য সমবেত হয়েছিল। ট্রাম্পের ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার এবং ইউরোপের উপর শুল্ক নির্ধারণের সিন্ধান্ত মোকাবিলার জন্য ‘সম্মিলিত ইউরোপিয়ান ফ্রন্ট’ গঠন করার সিন্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইউরোপিয়ান নেতৃবৃন্দ একমত যে ট্রাম্পের মতো যাঁদের বন্ধু আছে তাদের শত্রুর কোন প্রয়োজন পড়েনা।
ট্রাম্প ২০১৭ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ গ্রহণের পর পরই প্রথমে দ্রুত যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিলেন, ‘ট্রান্স পেসিফিক পার্টনারশিপ’ চুক্তি থেকে, জাপানের প্রধানমন্ত্রী বহু প্রচেষ্টা ও প্রয়াস চালালেন ট্রাম্প সাহেবকে বুঝাবার, কিন্তু ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো। আমেরিকার তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট ওবামাসহ বিশে^র তদানীন্তন সমস্ত দেশের নেতৃবৃন্দের অক্লান্ত প্রচেষ্টায় ‘প্যারিস জলবায়ু চুক্তি’ স্বাক্ষরিত হলো। এর আগে সারা বিশে^ এরকম ব্যাপক ভিত্তিক সমর্থন নিয়ে কোন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে বলে ইতিহাসে কোন নজির নেই। কিন্তু ট্রাম্প সাহেব এই চুক্তির বিরুদ্ধে বিষোদগার আরম্ভ করলেন নির্বাচনী প্রচারনার সময় থেকে। অবশেষে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে এই চুক্তি থেকেও যুক্তরাষ্ট্রকে প্রত্যাহার করে নিলেন। অবশেষে ২০১৫ সালের জুলাই মাসে ইরানের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তি ‘জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্ল্যান অব অ্যাকশন” (জে. সি. পি ও এ) থেকে সরে গেল যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকার তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দেশের অক্লান্ত পরিশ্রমের পর এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, ইরান এবং পি ৫+১ মধ্যে। অর্থ্যাৎ ইরানের সাথে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী প্রতিনিধি আমেরিকা, চীন, ব্রিটেন, রাশিয়া, ফ্রান্স+জামার্নীর মধ্যে এই চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সে থেকে ইরান সব সময় আন্তর্জাতিক আণবিক কমিশনের নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। কমিশনের মতে ইরান এই পর্যন্ত চুক্তির চুল পরিমাণ শর্তও ভঙ্গ করে নাই। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এক মতামত জরিপে শতকরা ৬৩ ভাগ মানুষ ইরান পারমাণবিক চুক্তির পক্ষেই তাদের মতামত দিয়েছেন। অথচ জনমত জরিপ ও ট্রাম্প সাহেবকে থামাতে পারে নাই। তিনি অনেক ব্যাপারেই সবকিছু ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিহুয়ার দৃষ্টিতেই দেখেন। বিশেষ করে ট্রাম্প সাহেবেরে মেয়ের জামাতা জ্যারেড কুশনার একজন ইহুদী ধর্মাবলম্বী এবং প্রেসিডেন্টের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক জ্যেষ্ট উপদেষ্টা। তাঁর কন্যা ইভাঙ্কা ট্রাম্প ও ইহুদী ধর্ম গ্রহণ করেছেন বলে শুনা যায়। কাজেই তাঁরাও ইসরাইলের নাগরিকত্ব লাভের যোগ্যতা অর্জন করেছেন।
দক্ষিণ এশিয়ার নেতাদের একটি অভ্যাস হলো তাঁদের পূর্বসুরী নেতারা যাই করুক না কেন তা অর্জন হিসাবে পরবর্তী নেতারা স্বীকৃতি দেননা বরং পূর্বসুরীরা যাই করেন তাই বাতিল করে দেন। সে অভ্যাস ট্রাম্প সাহেবকেও পেয়ে বসেছে। তাঁর পূর্বসুরী বারাক ওবামা যাই করেছেন তাই বাতিল করে দেওয়ার জন্য তার মধ্যে ্একটি প্রবল ইচ্ছা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। কিন্তু তিনি ভুলে যাচ্ছেন, যুক্তরাষ্ট্র দক্ষিণ এশিয়ার কোন দেশ নয়, ইহা বিশে^র একটা পরাশক্তি। কোন পরাশক্তি কথায় কথায় কোন চুক্তি বাতিল বা নিজেকে প্রত্যাহার করতে পারেন না। কারণ যুক্তরাষ্ট্রের মতো পরাশক্তির কোন ভুল সিন্ধান্ত সমস্ত মানবজাতির দুঃখ দুর্দ্দশা এবং ভোগান্তির কারণ হতে পারে। আমেরিকার ভুল সিন্ধান্তের ফলে যদি বিশ^ ব্যবস্থায় ধস নামে তাহর্লে আমেরকার জনগণ এ দায়িত্ব এড়াতে পারেনা। যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলির অনুসন্ধান রিপোর্টে বলাহয়েছে যে ইরান পরিপূর্ণভাবে আণবিক চুক্তির শর্তাবলী মেনে চলছে। আসলে ২০০৭ সাল থেকে ইরান আণবিক বোমা তৈয়ার করার ইচ্ছাই ত্যাগ করেছে।
অথচ প্রকৃত সত্য হলো অনেক আগে থেকেই ইসরাইল পরমাণবিক অস্ত্রের মালিক হয়ে বসে আছে। এই কথা বিশে^র প্রায় সবদেশেরই জানা আছে, বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে এই ব্যাপারে সব তথ্যই আছে। কোন কোন দেশ সক্রিয়ভাবে এ ব্যাপারে ইসারাইলকে সাহার্য করেছে। কিন্তু এখন যত দোষ, সব নন্দ ঘোষের। ইরানের ব্যাপারেই শুধু নিষেধাজ্ঞা। শুধু ইসরাইলের আণবিক অস্ত্র থাকবে অথচ টু শব্দ হবে না কিন্তু ইরানকে নিয়ে শুধু হৈ চৈ করা হবে।
এর আগে আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ (জুনিয়র) এবং বৃটেনের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার, গুজব তুললেন ইরাকের স্বৈরশাসক সাদ্দাম হোসেন ইরাকে প্রচুর পরিমাণে মানব বিধ্বংসী অস্ত্রের মজুত গড়ে তুলেছে। ২০০৩ সালের মার্চ মাসের ১৯ তারিখ ইরাককে আক্রমণ করার আদেশ দেওয়া হলো। আদেশ দিলেন জর্জ বুশ (জুনিয়র), আক্রমণ শুরু হলো। সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান নামে বিমান ঘাঁটি থেকে। দীর্ঘযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ লোক প্রাণ হারালো, ইরাকের অর্থনীতিসহ হাজার বৎসেরর পুরানো সব অর্জন ধ্বংস হয়ে গেল। অথচ এই ভয়াবহ ধ্বংসের সাথে জড়িত কারও বিবেকের এক বিন্দু ধ্বংশনও দেখা গেলনা এবং কোন প্রকারের জবাবদিহি করতে হলোনা। সে ইরাক যুদ্ধ থেকে আই. এস. নামে জঙ্গী সৃষ্টি হলো যারা বিশ^কে বিষিয়ে তুল্ল। এভাবে সারা বিশে^ যুদ্ধ, বিগ্রহ ও সন্ত্রাস সৃষ্টি হয়েছে এবং বর্তমানে এমন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে যে, সৃষ্টির নিয়ম অনুযায়ী ¯্রষ্টারই বিহিত ব্যবস্থা গ্রহণের সময় পরিপক্ক হয়েছে। কাজেই সাধু সাবধান।
যাই হউক, যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আমলে ইরানের সাথে স্বাক্ষরিত এই চুক্তিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প ক্ষয়িষ্ণু ও পচনশীল বলে আখ্যায়িত করেছেন। পচঁনশীলতা কমাতে এর বিকল্প কি সে ব্যাপারে ট্রাম্প সাহেব কোন মন্তব্যই করেন নাই। আসলে বিধাতা যাদেরকে ভাঙ্গার অভ্যাস দিয়ে দুনিয়াতে পাঠিয়েছেন তাঁদেরকে গড়ার অভ্যাস দেয়না। এই দিকে জাতিসংঘের মহা-সচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস ট্রাম্পের এই সিন্ধান্তে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন এবং পক্ষগুলোকে গুলোকে এই চুক্তি মেনে চলার উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন যুক্তরাষ্ট্র “জয়েন্ট কমপ্রিহেনসিভ প্লান অব অ্যাকশন (জে সি পি ও এ) থেকে বেরিয়ে যাবে এবং ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করবে, ট্রাম্পের আজকের এই ঘোষানায় আমি গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, ‘আমি জে. সি.পি. ও এর আওতায় অংশীদার সব দেশকে তাদের দেয়া প্রতিশ্রুতি সম্পূর্ণভাবে মেনে চলতে এবং চুক্তিটির সমর্থন অন্য সব সদস্য দেশের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নিজে ওয়াশিংটন গিয়ে ট্রাম্পের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করেছেন। বৃটেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রী ওয়াশিংটনে গিয়ে প্রেসিডেন্টকে বুঝানোর আপ্রাণ চেণ্টা করেছেন। তিনি ও ব্যর্থ হয়েছেন।
চুক্তি থেকে ট্রাম্পের বেরিয়ে আসার সিন্ধান্তে, প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট এবং এই চুক্তির অন্যতম স্টায়েডে বারাক ওবামা ক্ষুদ্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। ফেসবুকে দেওয়া এক বার্তায় উনি বলেছেন, জে.সি.পি.ও. থেকে বেরিয়ে আসার মধ্য দিয়ে ঘনিষ্ট ইউরোপীয় মিত্রদের পৃষ্ট প্রদর্শন করলাম আমরা। তিনি আরও বলেছেন এই চুক্তি এমন এক চুক্তি যাতে দেশের শীর্ষ কূটনৈতিক ব্যক্তিগণ, বিজ্ঞানীরা এবং দক্ষ গোয়েন্দারা এই চুক্তি তৈরীতে পূর্ণ সহযোগীতা করেছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন পররাষ্ট্র্র সেক্রেটারী জন কেরী এবং এই চুক্তিরর অন্যতম রূপকার হিসেবে ইরান চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাহারের ঘোষাণায় অত্যন্ত মর্মাহত হয়েছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিন্ধান্তের ফলে যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্রদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
মুসলিম বিশে^র জন্য সবচাইতে মর্মান্তিক এং উদ্বেগজনক খবর হলো প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ইরান চুক্তি ত্যাগ ঘোষণায় সৌদি আরব, আরব আমিরাত এবং ইসরাইল সমস্বরে অভিন্দন জানিয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের পরবর্তী পদক্ষেপ কি হবে তা বুঝতে একটু সময় লাগবে বলে মনে হয়। কারণ ইতিমধ্যেই ট্রাম্পের নিরাপত্তা উপদেষ্টা জন বোল্টনের দেওয়া সাক্ষৎকার এবং পর-রাষ্ট্রমন্ত্রী শাইক প্রক্ণর এর দেওয়া সাক্ষাৎকারের মধ্যে আকাশচুম্বী পার্থক্য লক্ষ করা গেছে। ট্রাম্পের উপদেষ্টা জন বোল্টন ইরানের বিরুদ্ধে বাণিজ্য যুদ্ধের রূপরেখা দিয়েছেন। বিখ্যাত সি. এন. এন. টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জন বোল্টন বলেছেন, ইউরোপের যে কোম্পানীগুলি ইরানের সাথে বাণিজ্য করছে সেগুলির উপর মার্কিন অবরোধের সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে মার্কিন পররাষ্ট্র মন্ত্রী মাইক পম্মে ও ফক্স নিউজকে বলেছেন, ইরানের সাথে স্বাক্ষরিত চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসার অর্থ কারো উপর অবরোধ আরোপ নয় বরং তেহরানের সাথে নতুন চুক্তির পথ খুঁজে নিতে চেষ্টা করা। সে লক্ষ্যে সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্র কাজ করে যাচ্ছে। এই দুই সাক্ষাৎকারের বক্তব্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য বলা হলেও কম বলা হবে। যাই হউক সময়ে বলে দিবে সব কিছু। তবে সনাতন ইহুদীর বুদ্ধির সামনে নব্য ইহুদী ঠিকে না থাকাই স্বাভাবিক। অবশ্য ইতিমধ্যে আরেক বিবৃতিতে জন বোল্টন ইউরোপিয়ান ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানগুলোকে যারা ইরানের সাথে ব্যবসা করছে, এই মর্মে জানিয়ে দিয়েছেন যে, আগামী ছয় মাসের মধ্যে ইরানের সাথে ব্যবসা গুটিয়ে না দিলে সেক্ষেত্রে আমেরিকা বাধার সৃষ্টি করবে। এরই মধ্যে বৃটেনের পর-রাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসন বলেছেন, তিনি যুক্তরাষ্ট্রের এমন পন্থা গ্রহণ না করেতে অনুরোধ করেছেন যা অন্যপক্ষগুলির জন্য এই চুক্তি বাস্তবায়নে বাধা হয়ে দাঁড়াবে এবং তিনি আরও বলেছেন এই চুক্তি ছেড়ে যাওয়ার কোন ইচ্ছা বৃটেনের নেই।