cplusbd

নিউজটি শেয়ার করুন

রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে বিশ্ব মানবতা আজ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন

2018-05-29 12:08:52
1st Image

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধুরী: জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সকল সদস্য দেশের প্রতিনিধির সমন্বয়ে একটি প্রতিনিধিদল রোহিঙ্গা সমস্যা সামাধানের প্রচেষ্টায় এপ্রিলের (২০১৮) ২৮ তারিখ থেকে ২ দিন বাংলাদেশ এবং ২ দিন মিয়ানমার সফর করে ফিরে গেছেন। ইতিমধ্যে ঢাকায় ও.আই.সির. পররাষ্ট্র মন্ত্রীদের সম্মেলন ও অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেখানেও রোহিঙ্গাদের ইস্যু প্রাধান্য পেয়েছে। এরই মধ্যে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোহিঙ্গা সমস্যার উপর আলোকপাত করে আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ চিঠি লিখেছেন। ইতিমধ্যেই বিশে^র মানবতাবাদী সংস্থাগুলি মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল আদালতে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করার জন্য ব্যাপক বিশ^জনমত গড়ে তুলেছেন। এত সবের পরও মিয়ানমারের সেনাপ্রধান নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিদের সাথে আলোচনায় যে ঔদ্ধত্যপূর্ণ বক্তব্য দিয়েছেন তা হতাশাজনক, অমানবিক এবং দৃষ্টান্তপূর্ণ।
সম্প্রতি আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে একটি চিঠি লেখেন যা বাংলাদেশে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত মার্সিয়া বার্নিকাট নিজেই প্রধানমন্ত্রী হাতে গত ৩ই মে তাঁর কার্যালয়ে পৌছিয়ে দেন। ঐ চিঠিতে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় ফেরৎ নেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকার মিয়ানমারের উপর চাপ অব্যাহত রেখেছেন বলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আশ^স্ত করেছেন। তিনি চিঠিতে আরও বলেছেন এই সংকট সৃষ্টির জন্য মিয়ানমার সরকারের যারাই দায়ী তাদেরকে অবশ্যই জবাবদিহি করতে হবে। তিনি রোহিঙ্গা সমস্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মানবিক সাড়ার ভূয়শী প্রশংসা করেছেন। এক মিলিয়ন রোহিঙ্গা স্মরনার্থীর আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা একটি বিশাল দায়িত্বপূর্ণ কাজ বলে তিনি স্বীকার করেন এবং তাতে যে হাজার হাজার রোহিঙ্গার জীবন রক্ষা পেয়েছে তার প্রশংসা করেন। বাংলাদেশীরা ১৯৭১ সালে যে অমানবিক এবং অসহনীয় দুর্দ্দশা সম্মুখীন হয়েছিল। আজকে রোহিঙ্গাদের প্রতি মানবিক সদাচারণের দীক্ষা সেখান থেকেই পাওয়া।
জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যরা এপ্রিল মাসের ২৮ তারিখ থেকে ৩০ তারিখ পর্যন্ত বাংলাদেশে আশ্রিত ৭০,০০০০ রোহিঙ্গাদের ক্যাম্পগুলি ব্যাপকভাবে পরিদর্শন করেন। রোহিঙ্গা শরনার্থীরা তাদের উপর মিয়ানমার সেনাবাহিনী বর্বর অত্যাচার, ধর্ষণ এবং হত্যা সহ সমস্ত নির্দ্দয় অমানবিক অত্যাচারের কথা সবিস্তারে নিরাপত্তা পরিষদের টিমের সদস্যদেরকে জানিয়েছেন। এই লোহমর্ষক বর্ণনা শুনে তাঁরা স্তম্ভিত হয়ে পড়েন। এর আগেও নোবেল পুরস্কার বিজয়ী কয়েকজন মহিলা রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলি পরিদর্শন করে এবং তাদের উপর নির্মম অত্যাচারের বর্ণনা শুনে প্রায় চিৎকার করে কেঁদেছেন। কাজেই রোহিঙ্গারা বর্তমারে মিয়ানমারের ফিরতে চাইলেও নিরাপদ মনে করছেনা। তাদের ধারণা যে সম্পূর্ণ সত্যতা মিয়ানমারের সেনাপ্রধানের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট হয়েছে।
গত ৩০ এপ্রিল মিয়ানমারের রাজধানী নেপিডোতে সফররত জাতিসংঘ নিরাপত্তা কাউন্সিলের সদস্যদের সাথে এক বৈঠকে মিয়ানমারের সেনা প্রধান মিন অং পরিষ্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশ থেকে ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের শুধু তাদের জন্য তৈরী “আদর্শ গ্রামই” নিরাপদ। আদর্শ গ্রামের বাইরে নিরাপত্তার দায়িত্ব সেনবাহিনী নিতে অক্ষম একথা প্রায় স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। জাতিসংঘের সবোর্চ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন পরিষদের সদস্যদের সামনে যদি এরকম একটি অমানবিক এবং পশুতুল্য প্রস্তাব সমগ্র দেশের সেনাবাহিনীর সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী একজন দায়িত্বপূর্ণ কর্মকর্তা দিতে পারেন তাহলে বুঝতেই হবে এই পথে রোহিঙ্গা সমস্যার সামাধান অত্যন্ত কঠিন হবে। মিয়ানমার সেনাপ্রধানের বক্তব্যের অর্থ দাঁড়ায় রোহিঙ্গাদের তথাকথিত “আদর্শ গ্রামের” বাইরে যেতে দেওয়া হবেনা। অর্থ্যাৎ তাদেরকে আবদ্ধ পরিবেশে সুনির্দিষ্ট স্থানে জীবন কাটাতে হবে। সেক্ষেত্রে তাদের জীবন জীবিকার কি হবে তারও কোন উত্তর নেই। মিয়ানমারের সেনাপ্রধানের এই প্রস্তাব সমগ্র মানবজাতিকে অপমানিত করা হয়েছে। জাতিসংঘের অনুসন্ধানে বার্মিজ সেনাবাহিনী কর্তৃক রোহিঙ্গদের উপর ভয়াবহ যৌন সন্ত্রাসের আলামত পেলেও মিয়ানমারের সেনাপ্রধান তা নাকচ করে দেন। জাতিসংঘের এক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে যে রোহিঙ্গা নারীরা ধারাবাহিকভাবে দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে ধর্ষণের শিকার হয়েছে এবং হচ্ছে। কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে ব্যাপক তদন্তের পর সহিংসতা ও যৌন নিপীড়নের ঘটনা তদন্তে গঠিত জাতিসংঘের অনুসন্ধানী দল এই সিন্ধান্তে উপনীত হয়েছে। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা জানান যে রোহিঙ্গাদের রাখ-খাইন থেকে তাড়ানোর অস্ত্র হিসারে সংঙ্ঘবদ্ধ ধর্ষণকে বার্মার সেনাবাহিনীর ব্যবহার করেছে।
মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মতে রাখাইনের সংগঠিত সমস্ত ঘটনা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীন ব্যাপার, কাজেই জাতিসংঘের উদ্যোগে কোন তদন্ত মিয়ানমারের অভ্যন্তরীন ব্যাপারে হস্তক্ষেপের সামিল। কাজেই জাতিসংঘের কোন তদন্তে তারা সম্মতি দিতে পারেনা। যুক্তরাষ্ট্রের জাতিসংঘের স্থায়ী ডেপুটি প্রতিনিধি কেলী কোরি বলেন যেখানে ৭০,০০,০০০ লক্ষ রোহিঙ্গা অন্যদেশে পালাতে হয়েছে তা মিয়ানমারের আভ্যন্তরীন বিষয় হতে পারেনা। রাখ-খাইনের এই ঘটনা যেহেতু আন্তর্জাতিক শান্তি এবং নিরাপত্তায় আঘাত হেনেছে সেহেতু এই ঘটনা মিয়ানমারের আভ্যন্তরীন ব্যাপার হতে পারেনা। জাতিসংঘের কুয়েতের স্থায়ী প্রতিনিধি মনসুর আল ওতাইবি বলেছেন, “আমরা মিয়ানমার সরকারকে নতুন কিছু করতে বলছিনা দেশটি জাতিসংঘের সদস্য। শরণার্থী প্রত্যাবসনের প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদন্ডের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন। এইভাবে সমস্তদেশের প্রতিনিধিরা মিয়ানমারেরর সেনাপ্রধানকে অনুরোধ করেছেন। এমনকি চীন এবং রাশিয়ার প্রতিনিধিরাও আন্তর্জাতিক মানদন্ডের নিরিখে শরণার্থীদের প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করার জন্য অনুরোধ করেছেন। কিন্তু এতৎসত্ত্বে আদর্শ গ্রামের বাইরে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি আদায় করতে পারা যায় নাই। জাতিসংঘের সবোর্চ্চ সংস্থা নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের সাথে যদি মিয়ানমার সেনাপ্রধানের এরূপ ধৃষ্টান্তপূর্ণ আচরণ হয়, বিভিন্ন মত পার্থক্য সত্ত্বেও বিশ্বের সমস্ত দেশ এক হয়ে এর উপযুক্ত উত্তর দেওয়া উচিত। না হয় মিয়ানমারের সেনাপ্রধানের প্রস্তাব যদি বাস্তবায়িত হয় তাহলে বিশে^ যে খারাপ উদাহরণ সৃষ্টি হবে, এই বিশ্ব মানুষজাতি বাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। এদিকে গত ৫ই মে থেকে দু’দিন ব্যাপি ও.আই.সির. সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সম্মেলনে উদ্ধোধন করেছেন। ৩৫ বৎসর পর এ সম্মেলন আবার ঢাকায় অনুষ্ঠিত হলো। এর আগে ১৯৮৩ সালে মুসলিম দেশগুলোর পর-রাষ্ট্রমন্ত্রী সম্মেলন ঢাকায় অনুষ্ঠিত হয়েছিল। শেখ হাসিনা তার বক্তৃতা বলেছেন বিশ্বে বিপুল মুসলিম জনসংখ্যা এবং তাদের মালিকানায় বিশে^র ৩ ভাগের ১ ভাগ কৌশলগত সম্পদ রয়েছে এবং মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ অনেক দেশই রয়েছে এবং অনেক দেশ সমৃদ্ধির পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। কাজেই মুসলিম বিশ^ পিছনে পড়ে থাকার কোন কারণ থাকতে পারেনা। ও. আই. সি. সেক্রটারী জেনারেল ইউসূপ বিন আহমদ ওথাইমিন সম্মেলনে নির্যাতিত রোহিঙ্গা মুসলিমদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান এবং এজন্যে ইতিহাসে বাংলাদেশের নাম অনন্য হয়ে থাকবে। তিনি রোহিঙ্গা সমস্যার ব্যাপারে সর্বপ্রকার সাহায্য সহযোগিতার জন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সর্বাঙ্গীন সহযোগিতা কামনা করেন। কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রী ক্রিষ্টিয়া ফ্রিল্যান্ডকে বিশেষ অতিথি হিসাবে এই সম্মেলনে আমন্ত্রণ করা হয়। তিনি তাঁর বক্তৃতায় বলেছেন, বর্বরতার ইতিঘটাতে হবে। বিচার কায়েম করতে হবে। ইহা আমাদের উপর নির্ভর করে। রাখ-খাইনের সংগঠিত বর্বরতা, নিষ্ঠুরতা এবং মানব অধিকার লংঘনের জন্য জবাবদিহিতা নির্ধারণের জন্য আমাদেরকে একটা পরিষ্কার পথ বের করতে হবে এবং আমাদের সমস্ত প্রচেষ্টার সমন্বয়ে মিয়ানমারের একটি স্থায়ী শান্তি গড়ে তুলতে হবে।” পরে কানাডার পর-রাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে দেখা করে রোহিঙ্গা সমস্যা সামাধানে কানাডা বাংলাদেশের সাথে থাকবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন। কানাডার প্রেসিডেন্ট জাস্টিন ট্রুডো জুন মাসে কোয়েবেকে অনুষ্ঠিতব্য জি’৭ সামিট সম্মেলনে যোগদান করার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। কানাডার প্রেসিডেন্টের এই মহানুভবতা বাংলাদেশের জনগনের কাছে চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।