cplusbd

নিউজটি শেয়ার করুন

ভ্লাদিমির পুতিন-রাশিয়ার সম্রাট জারের নুতন সংস্করণ

2018-05-21 11:22:30
1st Image

শাহাবুদ্দীন খালেদ চৌধুরী: গত মার্চের প্রেসিডেন্ট নিবার্চনে বিপুল ভোটে ভ্লাদিমির পুতিন রশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসাবে চতুর্থবারের জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। ৭ই মে সোমবার (২০১৮ সাল) তিনি রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসাবে শপথ নিয়েছেন। এই শপথ নেওয়ার পর তিনি আগামী অর্ধযুগ বা ৬ বৎসরের জন্য রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসাবে দেশ চালাতে পারবেন। পুতিন গত ১৮ বৎসর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসাবে এবং প্রধানমন্ত্রী হিসাবে রাশিয়া শাসন করছেন। অনেকেই তাকে রাশিয়ার সম্রাট জারের সাথেই তুলনা করে থাকেন। সব চাইতে পরিচিত এবং রাশিয়ার মানুষের কাছে যার সবচাইতে বেশী গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে সে বিরোধী দলীয় নেতা আলেক্সি নাভালিনকে তথাকথিত দুর্নীতির দায়ে সাজা দিয়ে অযোগ্য বলে ঘোষনা করা হয়। নাভালিনের এই সাজা যে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যমূলক একবিংশ শতাব্দীর বিশ্বে সে কথা না বুঝার মতো লোক যে খুব বেশী নেই এই সত্যটা বুঝার শক্তি বর্তমান বিশ্বে পুতিনের মতো স্বৈরশাসকদের কাছে আছে বলে মনে হচ্ছেনা। ২০২৪ সালে প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শেষ করতে পারলে ২৪ বৎসর রাশিয়ার ক্ষমতার শীর্ষে থাকার গৌরব পুতিন অর্জন করতে সক্ষম হবেন। যা হবে সোভিয়েট ইউনিয়নের অত্যন্ত শক্তিশালী নেতা জোসেপ স্ট্যালিনের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সময় রাশিয়ার ক্ষমতার শীর্ষে থাকার রেকর্ড। অবশ্য ইতিমধ্যেই ভ্লাদিমির পুতিন রাশিয়ার সম্রাট জারের নুতন সংস্করণ বলে বিশ্বে আখ্যায়িত হচ্ছেন। যাই হোক, অপ্রত্যাশিত কোন দুর্যোগ না ঘটলে আশা করা যায়, উনি ২০২৪ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন।

ইতিমধ্যে তেলের দাম বাড়তে শুরু করেছে। ২০১৭ সাল থেকে রাশিয়ার অর্থনীতিও ১.২% হারে বাড়তে আরম্ভ করেছে। ২০০০ সালে পুতিন যখন প্রথম বারের মতো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নিবার্চিত হন তখন সোভিয়েট ইউনিয়নের ভরাডুবি হয়েছে, তখন রাশিয়ার অর্থনীতিসহ সব দিক থেকে বিধ্বস্ত অবস্থা বিরাজ করছিল। তার আগে প্রেসিডেন্ট ছিলেন ইয়েল্যাৎসীন। সরকারী সমস্ত দফতরের হ য ব র ল অবস্থা। হাজার হাজার প্রাক্তন সরকারী কর্মচারী মাসের পর মাস পেনসনের টাকা পায়না। যেহেতু পুতিন বহু বৎসর ধরে সোভিয়েট রাশিয়ার শক্তিশালী গোয়েন্দা সংস্থা কে, জে, বির, প্রধান ছিলেন, কাজেই তিনি অল্প সময়ে শাসনে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হন। তখন বিশ্ব বাজারে ও তেলের দাম উল্লেখযোগ্য ভাবে বেড়ে যাওয়াতে তিনি সফলভাবে প্রসাশন চালাতে সক্ষম হন এবং ২০০৪ সালে দ্বিতীয় মেয়াদে আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। কিন্তু ইউক্রেনে ২০০৪-৫ সালের বৈপ্লবিক পরিবর্তন পুতিনের নেতৃত্বের জন্য ছিল আঘাতস্বরূপ। ইহা ছিল ইউরোপিয়ান ইউনিয়েনের এবং নাটোরের পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোর উপর প্রভাব বিস্তার করার পরিকল্পনারই অংশ। কারণ সে সব দেশগুলো ছিল প্রাক্তন সোভিয়েট ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত।

২০০৮ সালে প্রেসিডেন্ট নিবার্চনে শাসনতান্ত্রিক বাঁধার কারণে (একাক্রমে তিনবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার উপর শাসনতান্ত্রিক বিধিনিষেধ) তিনি প্রধানমন্ত্রীত্বের দায়িত্বগ্রহণ করেন। সে দফায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হয় মেদভেদেভকে। তিনি প্রধানমন্ত্রী হলেও সত্যিকারের ক্ষমতা ছিল পুতিনের হাতে। ২০০৮ সালের আগষ্ট মাসে রাশিয়া কর্তৃক জর্জিয়া আক্রান্ত হওয়ার পর থেকে পশ্চিমাদের সাথে রাশিয়ার সম্পর্কের অবনতি ঘটে। তখন যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়া আক্রমণের হুমকি দেয়। ২০১১ সালে পুতিন যখন আবার পেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হন তখন শহরভিত্তিক যুব শক্তির তীব্র বিরোধীতার সম্মুখীন হন এবং তাঁকে নির্বাচনে বলপ্রয়োগ এবং সহিংসতার আশ্রয় নিতে হয়। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দা এবং তেলের দরপতনের ফলে তেল রপ্তানির ত্রিশঙ্কু অবস্থায় রাজস্ব আয়ে রাশিয়া বিরাট ঘাটতির সম্মুখীন হয়। ২০১৪ সাল থেকে রাশিয়া অর্থনৈতিক মন্দা চরমে পৌঁছে। এতে পুতিনের ভাবমূর্তি এবং কর্তৃত্ব হ্রাস পাওয়ার পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। তখন তিনি জাতীয়তাবাদ এবং বিভিন্ন গোড়ামির আশ্রয় নিতে আরম্ভ করেন। ২০১৪ সালে ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার একীভূত করার উদ্যোগ রাশিয়ান জাতীয়তাবাদকে উজ্জীবীত করার একটি প্রয়াস।

প্রেসিডেন্ট পুতিন বিশ্ব এবং দেশীয় রাজনীতিতে অনেক জটিল বিষয় আগামী দিনগুলিতে মোকাবিলা করতে হবে। সম্প্রতি প্রায় ৪০ টি দেশ রাশিয়ার দূতাবাস থেকে গুপ্তচর বৃত্তির অভিযোগ অনেক কর্মকর্তাকে বহিস্কার করেছেন। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন রাশিয়ার গ্যাসের উপর তাদের নির্ভরতা কমানোর জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এখনও রাশিয়ার কাছে ভয়ানক পরমাণু অস্ত্রের মজুদ রয়েছে। রাশিয়া জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্র এবং তার ভেটো প্রয়োগ করার ক্ষমতা রয়েছে। তার অর্থনীতির ও মজবুত ভিত্তি আছে এবং দেশের কেন্দ্রীয় সরকারের ভিত্তিও অনেকটা মজবুত। দেশের নুতন প্রজন্ম অতি দ্রুত দেশের শাসন ক্ষমতার বিভিন্ন স্তরে দায়িত্ব নেওয়া শুরু করেছে। তারপরও আসল সত্য হলো রাশিয়া বিশ্ব শক্তি থেকে আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। যে সোভিয়েট রাশিয়ার আক্রমণ ঠেকাতে ১৯৭২ সালে চীন, সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আমেরিকার সাথে কূটনৈতিক সর্ম্পক গড়তে হয়েছিল, আজ সে চীনের প্রভাব বলয়ের কাছে রাশিয়ার আত্মসমর্পণ স্পষ্টতর হচ্ছে। এখন রাশিয়ার জনসংখ্যা মাত্র ১৪০ মিলিয়ন। এখনও অর্থনীতি তেল ও গ্যাস রপ্তানীর উপর নির্ভরতা কাটিয়ে উঠতে পারে নাই। এখনও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের দেশগুলি রাশিয়ার শতকরা ৩৫ ভাগ গ্যাস আমদানী করে। অবশ্য চীনের কাছে গ্যাস সরবরাহের জন্য নুতন পাইপ লাইন স্থাপন করা হচ্ছে। ২০১৯ সাল নাগাদ চীনে রাশিয়ার গ্যাস রপ্তানী আরম্ভ হবে। অবশ্য এই পর্যন্ত রাশিয়ার অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য কোন ব্যাপকভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয় নাই। সোভিয়েট ইউনিয়নের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট ব্রেজনেভের সময় থেকে সোভিয়েট অর্থনীতি যে স্থবিরতা বিরাজ করছিল, পুতিনের সময় সে অবস্থার খুব একটা পরিবর্তন হয় নাই। গত কয়েক বৎসর পুতিন পররাষ্ট্র নীতির উপর জোর দিয়েছে। ইউক্রেনের সাথে ছোট ছোট যুদ্ধ এখনও চলছে। সিরিয়ার যুদ্ধে সিরিয়ার পক্ষে বিমান হামলায় প্রত্যক্ষভাবে রাশিয়া অংশগ্রহণ করেছে। একমাত্র রাশিয়ার হস্তক্ষেপের কারণে সিরিয়ার আসাদ সরকারের ঠিকে যাওয়ার জোর সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। সিরিয়ায় অচিরেই যদি যুদ্ধ বন্ধ হয়ে যায় এবং শান্তি কায়েম হয়, যুদ্ধ বিধ্বস্ত সিরিয়ার পুনঃ নিমার্ণে যে কর্মযজ্ঞের প্রয়োজন হবে তাতে চীনের অংশগ্রহণ অনিবার্য হবে।