cplusbd

নিউজটি শেয়ার করুন

উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়ার ঐতিহাসিক শীর্ষ বৈঠক

1st Image

শাহাবুদ্দীন খালেদ চেীধুরী (২০১৮-০৫-১৪ ০৮:৫৭:৪৪)

১৯০৫ সালে জাপান ও রাশিয়ার যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর থেকে সমগ্র কোরিয়া ছিল জাপানের আশ্রিত রাজ্য। ১৯৪৫ ইংরেজীতে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে জাপানের শোচনীয় পরাজয়ের পর, জাপানের আত্মসমর্পণের সুবিধার্থে সমান্তরাল ভাবে কোরিয়াকে উত্তর ও দক্ষিণ কোরিয়া হিসাবে ভাগ করা হয়। রাশিয়ার দখলে যায় উত্তর কোরিয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের দখলে দক্ষিণ কোরিয়া। উভয় কোরিয়ার জনগণের ইচ্ছা সত্ত্বেও আমেরিকা এবং রাশিয়ার ইচ্ছা না থাকায় তখন কোরিয়াকে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব হয় নাই। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ উভয় কোরিয়ার জন্য একটি একক পার্লামেন্ট নির্বাচিত করার জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা গ্রহণ করলে রাশিয়া তাতে সমর্থন দেয় নাই। তাই জাতিসংঘ ১৯৪৮ সালে শুধু দক্ষিণ কোরিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠান করে। এর তিন মাস পর রাশিয়াও তাদের প্রথা অনুযায়ী উত্তর কোরিয়ায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। নির্বাচনের ফলে কমিউনিষ্ট পার্টি সম্পূর্ণভাবে উত্তর কোরিয়ার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। ১৯৪৯ সালের জানুয়ারী মাসে সোভিয়েট রাশিয়া উত্তর কোরিয়া থেকে তার সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করে নেয় এতে দক্ষিণ কোরিয়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী প্রত্যাহারের জন্য নৈতিক চাপের সৃষ্টি হয়। কাজেই ১৯৪৯ সালের জুন মাসেই আমেরিকাও দক্ষিণ কোরিয়া থেকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করে নেয়। ১৯৫০ সালের জুন মাসের ২৫ তারিখে হঠাৎ করে উত্তর কোরিয়া দক্ষিণ কোরিয়ার উপর ব্যাপক সামরিক আক্রমণ চালিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার ব্যাপক অংশ দখলে নিয়ে নেয়। ১৯৫০ সালের ১৫ই সেপ্টেম্বের যুক্তরাষ্ট্রের জেনারেল মেক্স আর্থারের নেতৃত্বে আমেরিকার সেনাবাহিনী উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই উত্তর কোরিয়ার সেনাবাহিনী প্রায় পর্যুদস্ত হয়ে পড়ে।
নভেম্বর মাসের ২৬ তারিখে ২ লক্ষ ৪০ হাজার সৈন্য নিয়ে চীন উত্তর কোরিয়ার পক্ষে যুদ্ধ অংশগ্রহণ করে। চীনের সৈন্য সংখ্যা ছিল আমেরিকার প্রায় তিন গুণের বেশী। ফলে আমেরিকার সৈন্য বাহিনীর পক্ষে সম্পূর্ণ উত্তর কোরিয়া দখল করা সম্ভব হয় নাই এবং দক্ষিণ কোরিয়ার ভূমি ও চীন দখল করতে সক্ষম হয় নাই। ১৯৫১ সালে উভয় কোরিয়ার মধ্যে যুদ্ধ বিরতি এবং আলোচনা আরম্ভ হয় এবং ১৯৫০ সাল থেকে যুদ্ধ বিরতি কার্যকর হয়। সে থেকে দুই কোরিয়ার মধ্যে আজ পর্যন্ত কোন শান্তি চুক্তি হয় নাই। কিন্তু নতুন করে কোন যুদ্ধও হয় নাই। এভাবে আজ ৬৫ বৎসর ধরে চলছে।
এপ্রিলের ২৭ তারিখ (২০১৮) দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্ট মুন এবং উত্তর কোরিয়ার চেয়ারম্যান কিমের সাথে সীমান্ত সংলগ্ন দক্ষিণ কোরিয়ার “পনমনজুম” নামে একটি গ্রামে শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই ঐতিহাসিক বৈঠক ছিল একটি মাইল ফলক। দুই নেতার মধ্যে দীর্ঘ বৈঠকের পর কোরীয় উপদ্বীপকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্তসহ শান্তি, উন্নয়ন এবং অন্যান্য মৌলিক বিষয়ে যে ঘোষনা দিয়েছেন তা একটি বিষ্ময়কর উদাহরণ হিসাবে বিশ^ ইতিহাসে স্থান করে নিবে। এত অল্পসময়ে বিশে^ এরকম একটা বিষ্ময়কর ঘটনা ঘটে যাবে তা কেহ কল্পনাও করেন নার্ই। কয়েক মাস আগেও উত্তর কোরিয়া এবং দক্ষিণ কোরিয়ার শীর্ষ নেতৃত্বে মধ্যে কেটি গুরুত্বপূর্ণ এবং সাথে সাথে হৃদ্যতাপূর্ণ শীর্ষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে এবং আলোচিত সব বিষয়ে দুই নেতা একমত হয়ে ইসতেহার হিসাবে প্রকাশ করবে তা কেহ কল্পনাও করতে পারেন নাই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে আঘাত করার ক্ষমতাসম্পন্ন দূর পাল্লার মিসাইলের অনবরত পরীক্ষা, উত্তর কোরিয়ার নেতা কিম এবং আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মধ্যে অনবরত অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ সারা বিশে^র রাজনৈতিক পরিবেশ হাস্যসম্পদ, অসহনীয় এবং অমর্যদাকর হয়ে উঠেছিল। দুই কোরিয়ার শীর্ষ নেতারা এক বৈঠকেই যে সমঝোতার ইতিহাস সৃষ্টি করলেন তা কূটনৈতিক জগতে অনেকদিন বিষ্ময়ের ব্যাপার হয়ে থাকবে। যাই হউক “পানমুনজমের” শীর্ষ সম্মেলনে দুই নেতা কোরীয় উপদ্বীপকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত রাখার জন্য একত্রে কাজ করার দৃঢ় ঘোষণা দিয়েছেন। সিউল ও পিয়ংইয়ংয়ের মধ্যে ঐক্য, সমঝোতা এবং শান্তিপূর্ণ সহ-অবসস্থান যে উভয় দেশের জনগণের এবং নেতাদের দীর্ঘ দিনের প্রত্যাশা তা এই শীর্ষ সম্মেলনে দুই নেতার করমর্দন, আন্তরিক কোলাকুলি, আন্তরিক মেলামেশা দেখলেই বোঝা যায়, আসলে এই উপদ্বীপের দীর্ঘ দিনের কালো অধ্যায়ের কারণ ছিল চীন, জাপান, সোভিয়েট ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্র ইত্যাদির ক্ষমতা এবং স্বার্থের লড়াই। মাত্র কিছুদিন আগেও পিয়ংইয়ং এর সিউলের প্রতি যুদ্ধংদেহী হুমকি অব্যাহত ছিল। দক্ষিণ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত অলিম্পিকে আমন্ত্রিত কিমের বোন ইয়োজং দক্ষিণ কোরিয়ার প্রেসিডেন্টর সাথে এক বৈঠক করেন। সে থেকে দ্রুত বরফ গলতে শুরু হয়। এরপর দক্ষিণ কোরিয়ার একটি প্রতিনিধি দল কিমের একটি আমন্ত্রণপত্র মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কাছে পৌঁছিয়ে দেন। সে থেকে দ্রুত পট পরিবর্তন আরম্ভ হয়।
আসলে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প উত্তর কোরিয়ার বিরুদ্ধে পারমাণবিক আক্রমণে পুঁিড়য়ে ছাঁই করে দেওয়ার যে হুমকি দিয়েছিলেন তাতে উভয় কোরিয়াই আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে। কারণ আণবিকযুদ্ধে সোভিয়েট ইউনিয়নের বিশ^ব্যাপী সাড়া-জাগানো প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী নিকিতা ক্রুশ্চেভের একটি উদ্ধৃতি দেওয়ার লোভ সামলাতে পারলামনা। তিনি বলেছিলেন- "There are those who don't seem able to get it into their heads that in the next war, victor will be barely distinguishable from the vanquished. A war between Soviet Union and the United States would almost certainly end in mutual defeat." অর্থ্যাৎ কিছু লোকের মাথায় ঢোকেনা যে আগামী যুদ্ধে বিজিত ও পরাজিতের মধ্যে কোন পার্থক্যই থাকবেনা। সোভিয়েট ইউনিয়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যে কোন যুদ্ধ উভয়ের পরাজয়ের মধ্যে দিয়ে শেষ হবে। কাজেই যে যাই বলুক, আমার ভাবনায় উত্তর এবং দক্ষিণ কোরিয়ার এই সফল শীর্ষ সম্মেলনের বেশীর ভাগ কৃতিত্বের দাবীদার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরমাণবিক আক্রমণের হুমকি। যাই হউক শুক্রবারের বৈঠকের পর উভয় নেতা যে ঘোষণা দিয়েছেন তাতে কোরিয়ার উপদ্বীপকে সম্পূর্ণ পরমাণু অস্ত্রমুক্ত রাখার কথা দৃঢ়ভাবে বলা হয়েছে। উভয় দেশ একে অন্যের বিরুদ্ধে স্থল, নৌ ও সমুদ্রপথে সব শত্রুতা মূলক আচরণ বন্ধ রাখবে এবং পারষ্পরিক আস্থা বৃদ্ধির জন্য ধারাবাহিক আলোচনা চালিয়ে যাবে। এই ঘোষণা উভয়ের মধ্যে শান্তি চুক্তির কথাও আলোচিত হয়েছে।
এই প্রসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র এবং চীনের সহযোগীতার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এখন সারা বিশ্ব প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং উত্তর কোরিয়ার নেতা কিমের আসন্ন শীর্ষ বৈঠকের দিকে তাকিয়ে আছে। দক্ষিণ কোরিয়ার মুন উত্তর কোরিয়ার সাথে অনুষ্ঠিত শীর্ষ সম্মেলনের বিষয় বিস্তারিতভাবে অবহিত করার জন্য প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সাথে যে কোন মুহুর্তে সাক্ষাৎকারের অপেক্ষায় রয়েছেন। ইহা প্রায় সুনিশ্চিত যে দক্ষিণ কোরিয়ার নেতা ট্রাম্পের সাথে কিমের আলোচনা সফল হউক সে কামনা তাঁর চাইতে এই বিশ্বে আর কেউ বেশী করেন না। উত্তর কোরিয়ার সাথে ট্রাম্পের আলোচনায় সফলতার ব্যাপারে ট্রাম্পের উপরই বেশী দায়িত্ব বর্তাবে। নিশ্চয় বিশে^র রাজনৈতিক সচেতন মানুষ বিশ্ব শান্তি কায়েমের প্রচেষ্টায় এই বৈঠকের সাফল্য একটি মাইল ফলক হিসাবে গণ্য করবে। কাজেই এই ক্ষেত্রে আমেরিকার প্রেসেডেন্টের কাছ থেকে কেহ এই গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারে বাল্যসুলভ আচরণ আশা করেনা। বিশ্ব রাজনীতিতে একটি রূঢ় সত্য হলো, ল্যাটিন ভাষায় একটি প্রবাদ আছে "SI VIS, pacem para bellum" ইংরেজী করলে দাঁড়ায় "If You want Peace, Prepare for War" অর্থ্যাৎ “শান্তি চাইলে যুদ্ধের জন্য তৈয়ার হও।” উত্তর কোরিয়ার মিসাইল পরীক্ষা কোরীয় উপদ্বীপে শান্তি স্থাপনে সহায়ক হয়েছে বলে মনে হয়।