cplusbd

নিউজটি শেয়ার করুন

ইউএস-বাংলার উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত, নিহত ৪৯

1st Image

সিপ্লাস ডেস্ক (২০১৮-০৩-১৩ ০১:৫৪:৪৭)

নেপালের কাঠমান্ডুতে বাংলাদেশের বিমান পরিবহন সংস্থা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে ৭১ আরোহীর মধ্যে ৪৯ আরোহীর মৃত্যু হয়েছে।
স্থানীয় সময় বেলা ২টা ১৮ মিনিটে কাঠমান্ডুর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে নামার সময় ড্যাশ-৮ কিউ৪০০ মডেলের ওই উড়োজাহাজটি রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ে এবং আগুন ধরে যায়।
ফ্লাইট বিএস ২১১ এর আরোহীদের মধ্যে ৩২ জন বাংলাদেশি যাত্রী ছিলেন; তাদের মধ্যে নয়জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা গেছে। তাদের কাঠমান্ডুর কয়েকটি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে বলে পরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে।
আরোহীদের মধ্যে নেপালের ৩৩ জন, চীনের একজন ও মালদ্বীপের একজন করে যাত্রী ছিলেন। মোট ৬৭ যাত্রীর মধ্যে অন্য ২২ জনকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, বাকিদের মৃত্যু হয়েছে বলে
বেসরকারি বিমান সংস্থাটির উড়োজাহাজটিতে যে চারজন ক্রু ছিলেন তাদের মধ্যে প্রধান বৈমানিক আবিদ সুলতান ও একজন ক্রু প্রাণে বেঁচে গেলেও কো পাইলট পৃথুলা রশিদ ও ক্রু খাজা হোসেনের নাম কাঠমান্ডু মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দেওয়া মৃতদের তালিকায় রয়েছে।
এ দুর্ঘটনার কারণ এখনও স্পষ্ট না হলেও নিয়ন্ত্রণ কক্ষের সঙ্গে পাইলটের শেষ মুহূর্তের কথোপকথনের একটি রেকর্ড প্রকাশ পেয়েছে, যাতে মনে হয় রানওয়েতে নামা নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
ত্রিভুবন কর্তৃপক্ষ বলেছে, যে দিক দিয়ে বিমানটির রানওয়েতে নামার কথা ছিল, পাইলট নেমেছেন তার উল্টো দিক দিয়ে। অন্যদিকে ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ এ দুর্ঘটনার জন্য ত্রিভুবনের নিয়ন্ত্রণ কক্ষের বিরুদ্ধে গাফিলতির অভিযোগ এনেছে।
নেপালি কর্তৃপক্ষ ইতোমধ্যে ১৬ বছরের পুরনো ওই উড়োজাহাজের ব্ল্যাকবক্স উদ্ধার করেছে। দুর্ঘটনার কারণ খতিয়ে দেখতে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী খড়গা প্রসাদ শর্মা অলি।
সিঙ্গাপুর সফররত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইতোমধ্যে তার সফর সংক্ষিপ্ত করে মঙ্গলবারই দেশে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন। নেপালের প্রধানমন্ত্রীকে ফোন করে তিনি বলেছেন,যে কোনো সহযোগিতার জন্য বাংলাদেশকে তারা পাশে পাবে।
কী ঘটেছিল?
পর্যটকদের কাছে আকর্ষণীয় হিমালয়ের দেশ নেপালের ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক বিমানবন্দর হিসেবে পরিচিতি।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী আন্তর্জাতিক ফ্লাইট চলাচল শুরুর পর থেকে এ বিমানবন্দরে এ পর্যন্ত ৭০টির বেশি দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং তাতে নিহত হয়েছে সাড়ে ছয় শতাধিক মানুষ।
২০১৪ সালে বেসরকারি বিমান পরিবহন সংস্থা হিসেবে যাত্রা শুরু করা ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স দুই বছরের মাথায় ঢাকা-কাঠমান্ডু রুটের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আকাশে প্রবেশ করে।
সোমবার ইউএস-বাংলার ফ্লাইট বিএস ২১১ ঢাকার শাহজালাল থেকে রওনা হয় দুপুর ১২টা ৫২ মিনিটে। নেপাল সময় বেলা ২টা ১৮ মিনিটে কাঠমান্ডুতে নামার সময় উড়োজাহাজটি দুর্ঘটনায় পড়ে।
রানওয়ে থেকে ছিটকে পড়ার পর কানাডার বমবার্ডিয়ার তৈরি উড়োজাহাজটি বেড়া ভেঙে পাশের একটি খোলা মাঠে গিয়ে পড়ে। সেখানে বিমানে আগুন ধরে গেলে বহু দূর থেকে সেই ধোঁয়া উড়তে দেখা যায়।
তাৎক্ষণিকভাবে ত্রিভুবনে বিমান ওঠানামা বন্ধ করে দিয়ে বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকর্মী ও নেপাল সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে।
স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম আর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে দুর্ঘটনাস্থলের ছবি ও ভিডিও আসতে শুরু করলে দুর্ঘটনার ভয়াবহতা স্পষ্ট হতে থাকে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে বাড়তে থাকে স্বজনদের উদ্বেগ উৎকণ্ঠ।
মাই রিপাবলিকার এক ছবিতে দেখা যায় ধ্বংসস্তূপের কাছে সারি সারি হলুদ রঙের বডি ব্যাগ, যাতে পোড়া মরদেহ রাখা।
নেপাল পুলিশের ডিআইজি মনোজ নিপেন জানান, তারা ঘটনাস্থল থেকেই ৩১ জনের লাশ উদ্ধার করেছেন। বাকি ১৮ জনকে হাসপাতালে নেওয়ার পর মৃত ঘোষণা করা হয়েছে।
ওই উড়োজাহাজের বেঁচে যাওয়া যাত্রী বসন্ত বোহোরা কাঠমান্ডু পোস্টকে বলেন, ঢাকা থেকে রওনা হওয়ার সময় সব স্বাভাবিকই ছিল, কিন্তু ত্রিভুবনে অবতরণের আগ মুহূর্তে উড়োজাহাজ অস্বাভাবিক আচরণ শুরু করে।
“হঠাৎ প্রচণ্ড ঝাঁকুনি শুরু হয়। এর পরপরই বিকট শব্দ। আমি জানালার ওপর আছড়ে পড়লাম। কীভাবে যেন ভাঙা জানালা দিয়ে বেরিয়ে আসতে পেরেছি।”
এক প্রত্যক্ষদর্শী সিএনএনকে বলেছেন, প্রথমে তার মনে হয়েছিল মেঘের কারণে উড়োজাহাজটি বিমানবন্দরের দক্ষিণ দিক দিয়ে নিচু হয়ে নামছিল। কিন্তু হঠাৎ গতিপথ বদলে উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়।
ওই উড়োজাহাজের আরোহীদের মধ্যে ১৩ নেপালি শিক্ষার্থী ছিলেন, যারা সিলেটের জালালাবাদ রাগীব রাবেয়া মেডিকেল কলেজে পড়ছিলেন। এছাড়া নেপালের বিভিন্ন ট্র্যাভেল এজেন্সির মোট ১৬ জন কর্মী বাংলাদেশে এক প্রশিক্ষণ শেষে নেপালে ফিরছিলেন ওই ফ্লাইটে।
নিহত বাংলাদেশিদের মধ্যে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহকারী প্রধান নাজিয়া আফরিন চৌধুরী ও বেগম উম্মে সালমা একটি কর্মশালায় অংশ নিতে কাঠমান্ডু যাচ্ছিলেন।
আর ছয় বছরের ছেলে অনিরুদ্ধকে নিয়ে নেপালে বেড়াতে যাচ্ছিলেন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কর্মী সানজিদা বিপাশা ও রফিক জামান রিমু।
এছাড়া বৈশাখী টেলিভিশনের স্টাফ রিপোর্টার ফয়সাল আহমেদ, ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সফটওয়্যার প্রকৌশলী রকিবুল হাসান, গোপালগঞ্জের শেখ সায়েরা খাতুন মেডিকেলের শিক্ষার্থী পিয়াস রায় রয়েছেন নিহতদের মধ্যে।
দুর্ঘটনার পর ত্রিভুবন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর প্রায় চার ঘণ্টা-চারেক বন্ধ থাকে। ইউএস-বাংলার ফিরতি ফ্লাইটের ৩৫ জন যাত্রীকে বাংলাদেশে আনতে এর পরপরই কাঠমান্ডু যায় রিজেন্ট এয়ারের একটি ফ্লাইট।
বাংলাদেশের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পরিচালক ইকবাল করিম এবং ইউএস-বাংলার ক্যাপ্টেন লুৎফর রহমানও ওই ফ্লাইটে নেপালে যান।
বিমান দুর্ঘটনায় হতাহতদের পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও দু:খ প্রকাশ করে ইউএস-বাংলা কর্তৃপক্ষ এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, আহতদের ‘সর্বোত্তম’ চিকিৎসার ব্যবস্থা তারা নিয়েছে এবং দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে বিশেষজ্ঞদের তত্ত্বাবধানে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
যাদের স্বজন নেপালে বিধ্বস্ত ইউএস বাংলার ফ্লাইটে ছিলেন, তাদের দ্রুত ইউএস-বাংলার বারিধারার অফিসে যোগাযোগ করার অনুরোধ জানিয়ে এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মঙ্গলবার সকাল ৮ টায় প্রতি পরিবার থেকে ১ জন করে বিনা খরচে নেপাল যেতে পারবেন।
বাংলাদেশের কোনো উড়োজাহাজ বিধ্বস্ত হয়ে হতাহতের সবচেয়ে বড় ঘটনাটি এর আগে ঘটে ১৯৮৪ সালে। ওই বছর ৫ অগাস্ট বাংলাদেশ বিমানের একটি ফকার এফ-২৭ বিরূপ আবহাওয়ার মধ্যে ঢাকা বিমানবন্দরের কাছে বিধ্বস্ত হলে ৪৯ জন নিহত হন।