cplusbd

নিউজটি শেয়ার করুন

ব্যাংকের ঋণ খেলাপী জনিত বিশৃঙ্খলা রোধে জরুরী ব্যবস্থার প্রয়োজন

1st Image

শাহাবুদ্দীন খালেদ চেীধুরী (২০১৮-০২-১৯ ০৮:৪৪:০৪)

বিশ্বের সর্বমোট ৪৫ টি অনুন্নত দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ২০১৭ সালে পাঁচটি দেশের অন্যতম যাদের জি.ডি.পি. শতকরা ৭ শতাংশের উপরে বেড়েছে। বিশ্বের বেশ কয়েকটি সু-প্রতিষ্ঠিত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতে বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে জি.ডি.পি প্রবৃদ্ধির দিক দিয়ে বিশ্ব অর্থনীতিতে ২৮ তম স্থানে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনা রয়েছে। জাতিসংঘের বাণিজ্য এবং উন্নয়ন সংস্থা ও এই সম্ভাবনার কথা স্বীকার করেছে।
কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনায় সব সরকারের অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপ, সংঘবদ্ধ ঋণ খেলাপীদের দৌরাত্ম্য আমাদের উজ্জ্বল অর্থনৈতিক উন্নয়নের সম্ভাবনাকে ধুলিসাৎ করে দেওয়ার সম্ভাবনাকে বাড়িয়ে দিয়েছে। জানুয়ারির (২০১৮) ২৪ তারিখে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আব্দুল মুহিত সংসদে বলেছেন, গত ১০ বৎসরে ৯১ টি ব্যাংক এবং অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে ৬ লাখ ৬৫ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে ৮ হাজার ৭৯১ ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান। যার মধ্যে ৬৫ হাজার ৬০২ কোটি টাকা খেলাপী ঋণে পরিণত হয়েছে। সংসদের আলোচনায় অর্থমন্ত্রী এবং সংসদের মধ্যে প্রশ্নোত্তরে যে সত্যগুলি বেরিয়ে এসেছে তা হলো, কয়েক বৎসর ধরে বেসিক ব্যাংক এবং সোনালী ব্যাংকে বহু দুর্নীতি ঘটেছে। ফারমার্স ব্যাংকের পরিচালকেরা সাইনবোর্ড সর্বস্ব অস্তিত্বহীন প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়ে সেই অর্থ নিজেরাই ভাগাভাগি করে নিয়েছে। ব্যাংকিং ঋণ গ্রহীতাদের ঋণ খেলাপী হওয়া সত্ত্বেও বার বার ঋণ দেওয়ার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। একইভাবে এন. আর. বি. কর্মাশিয়াল ব্যাংকও সীমাহীন অর্থনৈতিক এবং নিয়ম বহির্ভূত কাজ করেছে। মার্কেন্টাইল ব্যাংক অনুপস্থিত পরিচালকদের স্বাক্ষর জাল করে ঋণ দেওয়ার নজির সৃষ্টি করেছে। আরব বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় প্রায় তিন হাজার কোটি টাকা সিঙ্গাপুরে পাচার হয়েছে। প্রায় ১ হাজার বাংলাদেশী মালয়শিয়ায় সেকেন্ড হোম তৈরি করেছে। একই সময়ে বাংলাদেশীরা সুইজারল্যান্ডে প্রায় ৫০০ নূতন ব্যাংক একাউন্ট খুলেছে। এসবের উত্তরে অর্থমন্ত্রী সাহেব বলেছেন “ব্যাংক ব্যবস্থার এখনো কিছু দুর্বলতা রয়েছে। এই অবস্থা থেকে উত্তরণের চেষ্টা চলছে। তবে এটা সহজে হবেনা, সময় সাপেক্ষ ব্যাপার, এজন্য যথেষ্ট সময় লাগবে।
অতি সম্প্রতি নতুন প্রজন্মের ফারমার্স ব্যাংকের নমুনা হিসাবে মাত্র কয়েকটি ঋণ হিসাব বাংলাদেশ ব্যাংক বাচাই করে। এর বিশেষ প্রতিবেদনে যে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে তাকে হরিলুট ছাড়া অন্য কিছু বলার অবকাশ নেই। এভাবে আমানত কারীদের অর্থ লোপাট হওয়ার ব্যাংকটির অস্তিত্ব সংকটাপন্ন হয়ে পড়েছে। গত ১১ই ফেব্রুয়ারি ২০১৮ সাল রোজ রোববার দৈনিক যুগান্তারে এই ব্যাপারে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিপোর্টের উপর বিস্তৃত প্রতিবেদনে দেওয়া হয়েছে। যা প্রকাশ পেলে দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা উঠে যাবে।
কোটি কোটি শ্রমিক কৃষকের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়া বিপুল সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এভাবে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়ার জন্য যারা দায়ী তাদেরকে আর ছাড় দেওয়া উচিত হবেনা। ফেব্রুয়ারী মাসের ৩ তারিখে সোনালী ব্যাংকের বার্ষিক সম্মেলনে বক্তৃতা করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেছেন ৬টি রাষ্ট্রীয় ব্যাংকেই সরকার হস্তক্ষেপ করেছে যার কারণে এই বিরাট অংকের খেলাপী ঋণের সৃষ্টি হয়েছে। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত সোনালী ব্যাংকে খেলাপী ঋণের পরিমাণ দাড়িয়েছে ১১ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী এই অংক সর্বমোট খেলাপী ঋণের ৩৬ শতাংশ। অর্থমন্ত্রী বলেছেন সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ব্যাংকের সিন্ধান্তে আর হস্তক্ষেপ করবেন না। এখন থেকে ব্যাংক যে প্রকল্পে বিনিয়োগ করতে অনীহা প্রকাশ করবে তাতে আমরা বিনিয়োগ করতে জোর করবনা। অর্থমন্ত্রী উক্ত বক্তব্যে তাঁর আন্তরিকতা, সরলতা এবং হৃদয়ের বিশালতা নিঃসন্দেহে প্রকাশ পেয়েছে। আগের ভুল-ভ্রান্তির জন্য জনগণ ক্ষমা করলেও ভবিষ্যতে এর পুনরাবৃত্তি বন্ধ করার জন্য এই ব্যাপারে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ অবশ্যই প্রয়োজন।
এই অনুষ্ঠানে সোনালী ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ওবায়দুল্লাহ আল মামুদ কিছু তথ্য পেশ করেছেন যা বিশ্লেষণ করলে বুঝতে কষ্ট হয়না যে সোনালী ব্যাংকের বর্তমান দুরাবস্থার জন্য সরকার প্রত্যক্ষভাবে কম দায়ী নয়। সোনালী ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক উক্ত অনুষ্ঠানে বলেছেন ব্যাংক প্রত্যেক বৎসর সরকারের বিভিন্ন সেবামূলক কাজে ২০০ কোটি টাকার মত খরচ করে যে টাকা ফেরত পায়না। ২০০৭ সালে ব্যাংক কে যখন কোম্পানীতে রুপান্তরিত করা হয় তখন অতীতের জমাকৃত লোকসানের ১ হাজার ৫১৭ কোটি টাকা ব্যাংকে সুবিন্যস্ত করতে হয়। এখনো ব্যাংকের মূলধনে ঘাটতি রয়েছে ৫ হাজার ৬৯৩ কোটি টাকা। অবশ্য গত বৎসরে সরকার ৩০০০ কোটি টাকা ব্যাংকে দিয়েছে। তিনি বলেন-ব্যাংক সরকারের কাছে আরও ৬ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক তহবিলে দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। সরকারের পক্ষে সেভিং সার্টিফিকেটর গ্রাহকদেরও সোনালী ব্যাংককে পরিশোধ করতে হয়। এজন্য প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা মজুত রাখতে হয়। অবশ্য সরকার এ টাকা পরিশোধ করে দেয়। কিন্তু অনেক সময় পরিশোধ করতে সরকারের দীর্ঘ সময় লেগে যায়। সোনালী ব্যাংক রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন এবং জুট মিল এসোসিয়েশন ইত্যাদি সংস্থাগুলিকে বিরাট অংকের ঋণ দিতে হয়। সরকার বন্ড এর মাধ্যমে এ ঋণ পরিশোধ করে থাকেন। বন্ড এর সুদের হার হলো ৫% থেকে ৭% পার্সেন্ট এবং এই বন্ড ২০ থেকে ৩০ বৎসর মেয়াদের। এর ফলে বৎসরে ব্যাংক প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার মত লোকসানের সম্মুখীন হয়। সোনালী ব্যাংকের এম ডি এবং চেয়ারম্যান উভয়ই অভিযোগ করেছেন যে সরকারের বিজ্ঞান এবং প্রকৌশল বিভাগ ব্যাংকের ৫ হাজার কোটি টাকা আটকিয়ে রেখেছে যা রাশিয়ার ব্যাংকে ৯৪ হাজার কোটি টাকার এল. সি. খোলার বাবদে পাওনা রয়েছে। সোনালী ব্যাংকের পক্ষের দেওয়া উপরোক্ত অভিযোগ গুলির সারবত্তা রয়েছে। সরকারের এসব বিষয়ে বিবেচনায় এনে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ব্যাপক একটা সংস্কারের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের আসন্ন অর্থনৈতিক উত্থান কিছু অসাধু ঋণ খেলাপী, অল্প সংখ্যক লোকের ব্যাংক এর মতো গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে ছিনিমিনি খেলা আমাদের আর সহ্য করার সময় অতিত্রম হয়েছে। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় অচিরেই একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তনের প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।