cplusbd

নিউজটি শেয়ার করুন

“শতকরা ৯৯ জনের জন্য অর্থনীতি”

1st Image

শাহাবুদ্দীন খালেদ চেীধুরী (২০১৮-০২-১২ ০৮:৪২:৩৬)

অক্সফাম ইন্টারন্যাশনাল যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি অর্থনৈতিক গবেষণা সংস্থা । ১৯৯৫ সালে ইহা প্রতিষ্ঠিত। বিশ্বের দারিদ্রতা এবং অবিচার ইত্যাদি দূর করার লক্ষ্যে কাজ করে থাকে। বিশ্বের অনুরূপ সংস্থাগুলোর মধ্যে তাঁদের নাম শীর্ষে রয়েছে। সুইজারল্যান্ডের ডেভোস্ এ জানুয়ারির ২৩ থেকে ২৬ তারিখ পর্যন্ত অনুষ্টিত বিশ অর্থনৈতিক ফোরামের পূর্ব মুহুর্তে “শতকরা ৯৯ জনের জন্য অর্থনীতি” বা “An Economy for 99 Percent” শিরোনামে একটি রিপোর্ট “অক্সফাম ইন্টারন্যাশনাল” প্রদান করেছে। সে রিপোর্টে বর্তমান বিশ্বের সম্পদের মালিকানায় যে অকল্পনীয় এবং সীমাহীন বৈষম্যের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তা শুধু অবিশ্বাস্য নয়, কল্পনার পরিধিরও বাইরে । বিশ্বে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে কিছুদিন আগেও যে বৈষম্য ছিল তা বর্তমানে আরও কল্পনাতীত ভাবে বেড়ে গেছে। সংস্থাটি ব্যাপক অনুসন্ধান এবং গবেষণার পর এই পরিস্থিত জন্য তিনটি কারণ চিহ্নিত করেছেন । (ক) প্রশাসনিক সহযোগীতায় শিষ্য ধনীদের রাজস্ব আদায়ে অহরহ বড় আকারের কারচুপি (খ) শ্রমিক কর্মচারিদের অস্বাভাবিক কম মজুরি (খ) দেশের প্রশাসনিক এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের উপর শীর্ষ ধনীদের প্রচন্ড প্রভাব। অক্সফামের হিসাবে নতুন পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বের বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিশ্বের দরিদ্রতম অধিক জনগোষ্ঠীর কাছে যে সম্পদ রয়েছে তা পূর্বের দেওয়া পরিসংখ্যানের চাইতে বর্তমানে অনেক কম। গত বছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্ব জনগোষ্ঠীর দরিদ্রতম অধিকাংশের কাছে যে সম্পদ ছিল তা ছিল বিশ্বের ৬২ জন ধনী ব্যক্তির সম্পদ ।
অক্সফামের বর্তমান হিসাব অনুযায়ী বিশ্বের ৯ জন ধনীর হাতে যে সম্পদ রয়েছে বিশ্ব জনগোষ্ঠীর দরিদ্রতম অধিকাংশের মোট সম্পদের পরিমানের সমান । ভারতের চিত্র আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে ভারতে ১ শতাংশ শীর্ষ ধনীর হাতে যে সম্পদ রয়েছে তা ভারতের মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশ । দেশটির ৬৭ শতাংশ জনগোষ্ঠী হচ্ছে এর সব চেয়ে গরীব অধিকাংশ । এই সময় তাদের সম্পদের পরিমান বেড়েছে মাত্র ২ শতাংশ। চলতি বৎসরে ভারতের শীর্ষ ধনীরা গত বৎসর দেশে যে সম্পদ সৃষ্টি হয়েছিল তার ৭৩ শতাংশ পকেটস্থ করেছে। অক্সফামের রির্পোট অনুযায়ী বিশ্বের সবগুলোদেশের অর্থনীতি দরিদ্র জনগোষ্ঠীর শোষণের বিনিময়ে শীর্ষ ধনীরা সম্পদের পাহাড় গড়ছে। ইহা অব্যাহত থাকলে আগামী ২৫ বৎসরের মধ্যে বিশ্বে ট্রিলিয়নের মালিক সৃষ্টি হবে। ট্রিলিয়ন ডলারের মালিকের বিশেষত্ব বুঝাতে বলা যায় কোন লোক যদি প্রতিদিন ১ মিলিয়ন ডলার খরচ করে তাহলে তার ১ ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করতে ২৭৩৮ বৎসর সময় লাগবে।
অক্সফামের নির্বাহী প্রধান উইনি বিয়ানীনমা বলেছেন, মাত্র গুটি কয়েকজনের হাতে বিশ্বের বিশাল সম্পদের পাহাড় একটি অশ্লীল অবস্থার সৃষ্টি করেছে । বিশেষ করে বর্তমান বিশ্বে প্রতি ১০ জনের মধ্যে ১ জন মাত্র দিনে ২ ডলারের উপর নির্ভর করে জীবন নির্বাহ করতে হচ্ছে। মানুষের মধ্যে আয়ের এই ভয়াবহ পার্থক্য কোটি কোটি মানুষ প্রতিদিন দারিদ্র্যের নিমজ্জিত হচ্ছে এবং সার্বিক অর্থনীতি চুরমার হয়ে যাচ্ছে। তাতে সমাজে ভয়াবহ বিভক্তি আরম্ভ হয়েছে। গণতন্ত্র একটি উপহাসের বস্তুুতে পরিণত হয়েছে। বর্তমান বিশ^ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে সমস্ত মানুষ যে কোন মুহুর্তে বিদ্রোহের আগুন জ্বালাবে। ইতিমধ্যেই মানুষ “বিশ্বায়নের বিরুদ্ধে তাদের ক্ষোভ জানাতে আরম্ভ করেছে। “America First”এই শ্লোগান নিয়ে ট্রাম্পের মতো মানুষ আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হতে সক্ষম হয়েছেন। বৃটেনের মানুষ ইউরোপিয়ান কমন মার্কেট থেকে বিছিন্ন হওয়ার জন্য ভোট দিয়েছে। ২০১৬ সালে ইউরোপে আয় বৈষম্য সবচাইতে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ১০ শতাংশ লোক ইউরোপের ৩৭ শতাংশ সম্পদের মালিক হয়েছে। আর আরব বিশ্বের ১০ শতাংশ লোক মোট সম্পদের ৬১ শতাংশের মালিক। সারা বিশ্ব যেন সম্পদ লুটের মহড়া চলছে।
মহামানব বলে ইতিহাসে খ্যাত- সানইয়েৎ সেন, মাওসেতুং এবং চৌ এন লাই এর দেশ চীনে ও সম্পদ বন্টনে একই প্রক্রিয়ায় বৈষম্যের সৃষ্টি আরম্ভ হয়েছে। তবে চীনের প্রেসিডেন্ট দৃঢ় আশা ব্যক্ত করেছেন যে ২০২০ সালের মধ্যে এই বৈষম্য দূর করে একটি শোষণমুক্ত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত করার জোর প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে যা অবশ্যই সফল হবে।
যাই হোক অক্সফাম বর্তমান বিশ্বে গুটি কতক মানুষের হাতে সম্পদ পুঞ্জীভূত হওয়ার যে সব কারণ গুলো বর্ণনা করেছেন তার সাথে কেউ দ্বিমত পোষণ করার সুযোগ নাই। কিন্তু বিশ্বে প্রতিটি দেশে রাজনীতির এই দুর্দশা সৃষ্টির পিছনে যে মৌলিক কারণটা রয়েছে তা অক্সফামের দীর্ঘ রিপোর্টে উল্লেখ করেছে বলে আমার মনে হয়না। গভীরভাবে সারা বিশ্বের রাজনীতির গতিধারা পর্যালোচনা করলে বুঝতে অসুবিধা হয়না, যে ১৯৭০ দশক থেকে সারা বিশ্বে, প্রায় বেশির ভাগ দেশে কিছু আদর্শহীন রাজনীতিবীদের সহায়তায় এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা নিতে আরম্ভ করেন। তাঁরাই প্রথম রাজনীতিকে ব্যবসার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার আরম্ভ করেন। কিছু তথাকথিত রাজনৈতিক নেতারা দৃষ্টিকটুভাবে ঐসব ব্যবসায়ীদেরকে রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য উঠে-পড়ে লেগে যান। এই পরিস্থিতি দেখে যাঁরা রাজনীতিকে দেশ সেবার ব্রত হিসাবে গ্রহণ করেছিলেন তাঁরা ক্রমশ কোনঠাসা হয়ে রাজনীতিই ত্যাগ করতে শুরু করেন এবং কিছু রাজনীতিবিদ নিজেদের আদর্শ, ত্যাগ ও তিতিক্ষার কথা ভুলে সদ্য রাজনীতিতে আসা নব্য ব্যবসায়ীদের রাজনৈতিক ট্রেনিং দাতা হিসেবে নিজেকে গর্বিত মনে করতে থাকেন এবং তাদের সাথে আপোষ করে রাজনৈতিক কর্মকান্ড চালিয়ে যাওয়ার সিন্ধান্ত নেন।
একথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে রাজনীতিবিদরা স্বাভাবিকভাবে ব্যবসায়ীদের চাইতে বেশী মেধাসম্পন্ন কাজেই তাঁরা যখনই নীতিভ্রষ্ট হন, সে কর্মে তাদের সাথে আর কেউ পেরে-উঠা সম্ভব হয়না। এই অবস্থায় রাজনীতিতে যে ভয়াবহ অর্থনৈতিক অবস্থার সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক, সে অবস্থাটাই বর্তমানে বিশ্ব রাজনীতিকে সৃষ্টি হয়েছে। কিছুদিন আগে দেশের প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ শ্রদ্ধেয় অধ্যাপক রহমান সোবহান এক সেমিনারে একটি মূল্যবান কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন বর্তমানে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যদি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বা তাজুদ্দিন আহমদ প্রমুখ রাজনীতি শুরু করতেন তাহলে তাঁরা রাজনীতিতে যে শীর্ষ স্থান পেতে সক্ষম হয়েছিলেন তা সম্ভব হতোনা। বিভিন্ন বিশ্ব মিডিয়াতে প্রকাশিত খবরে জানা যায় যে রাশিয়ার বর্তমান প্রেসিডেন্ট পুতিন নাকী বিলিয়ন ডলারের মালিক।
জর্জ ওয়াশিংটন ছিলেন আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের স্বাধীনতার প্রধান স্থপতি। আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। তাঁকে তাঁর সেনাবাহিনী থেকে প্রস্তাব করা হয়েছিল আমেরিকার “রাজা” উপাধি গ্রহণ করার জন্য। সাল ছিল ১৭৮২। তিনি মে মাসের ২২ তারিখ (১৭৮২) তাঁর সেনাবাহিনীর কর্ণেল লুই নিকোলার কাছে লিখেছিলেন, “Let me conjure you, then, if you have any regard for your Country, Concern for yourself or posterity or respect for me, to banish these thoughts from your mind and never communicate as from yourself or anyone else, a sentiment of like nature ” অর্থাৎ “আমি তোমাকে সনির্বদ্ধ অনুরোধ করি, দেশের প্রতি যদি তোমার শ্রদ্ধাবোধ থাকে, তোমার এবং আগামী প্রজন্মের জন্য উদ্বেগ থাকে অথবা আমার প্রতি যদি তোমার শ্রদ্ধা থাকে তাহলে তোমার মন থেকে এই সব চিন্তা দূর করে দাও এবং কখনও তোমার পক্ষ থেকে বা অন্যের পক্ষ থেকে এরূপ মত প্রকাশ করবেনা।”
পাঠককে একটি কল্পনা করতে অনুরোধ করবো। বর্তমানে আমেরিকার সেনাবাহিনী যদি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে আমেরিকার রাজা হওয়ার অনুরোধ করেন তখন ট্রাম্পের কি উত্তর হবে কল্পনা করুন। জর্জ ওয়াশিংটনের ইতিহাস সৃষ্টিকারী, আমেরিকান জাতির মহত্ব সৃষ্টিকারী উপরোক্ত মন্তব্য গুলো কোনদিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প থেকে আশা করতে পারেন?
অবশেষে অক্সফাম বিশ্বের অর্থনীতির এই অমঙ্গল জনক পরিস্থিতির মোকাবেলার জন্য একটি ব্লুপ্রিন্ট তৈয়ার করেছেন। যার সারমর্ম হলো, সরকারকে দারিদ্র বিমোচনে সম্পদের প্রতি অতি মনোযোগ দেওয়ার অবসান ঘটাতে হবে। সরকারের উচিত হবে সম্পদ ও উঁচু আয়ের জন্য অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে অধিকতর সমসুযোগ তথা লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করা এবং স্বাস্থ্য সেবা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের আরো তহবিল সৃষ্টি করা।
পরিতাপের বিষয় হলো, অক্সফাম উনাদেরকেই উপদেশ গুলি দিচ্ছেন যাঁরা দীর্ঘ সাধনার পর এবং অজস্ত্র মেধা নিঃশেষ করে নিজেদের স্বার্থেই বর্তমান অবস্থার সৃষ্টি করেছেন। প্রায় দেশে পার্লামেন্ট গুলিতে ব্যবসায়ীরাই বর্তমানে সংখ্যাগরিষ্ট। সমগ্র মানবজাতির মূল্যবোধে একটি বৈপ্লবিক পরিবর্তন ছাড়া মানবজাতির বর্তমান সমস্যাগুলির সমাধান সম্ভব নয়। তবে এ কথা সত্য বিশ্বের গুটিকতক সুপার বুদ্ধিমানেরা ছলে-বলে-কৌশলে বিশাল সম্পদ কুক্ষিগত করে ইচ্ছামতো ভোগ করতে পারবে বলে মনে করেন তাহলে তাঁরা যে বোকার স্বর্গে বাস করছেন, এ বিষয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই।
পরিশেষে বিশ্বের দরিদ্রদের সম্পদ লুন্টণকারীদের প্রতি সনির্বদ্ধ অনুরোধ-স্রষ্টার শাস্তিকে ভয় করুন। কারণ “GOD Who maketh us, Loveth us all.”

shahabuddinkhaled47@gmail.com