cplusbd

নিউজটি শেয়ার করুন

ধর্ম নিরপেক্ষতা ছাড়া ঐক্যবদ্ধ ভারত অসম্ভব

1st Image

শাহাবুদ্দীন খালেদ চেীধুরী (২০১৮-০২-০৩ ০৬:০৫:৫০)

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গত ১৮ই জানুয়ারী, ২০১৭ সালের মানবাধিকার বিষয়ক একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। ভারতের ক্ষমতাসীন দলের নেতারা উগ্র হিন্দুত্ব বাদে সমর্থন দিচ্ছে। অহরহ ভারতের বিভিন্ন জায়গায় সংখ্যালঘুদের উপর দৈহিক নির্যাতন চলছে কিন্ত সরকার এসব হামলা বন্ধ বা তদন্ত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। বি জে পি নেতারা প্রকাশ্যে হিন্দু জাতীয়তাবাদী ও উগ্র জাতীয়বাদকে উসকে দিচ্ছে। উক্ত সংগঠনের দক্ষিন এশিয়া বিষয়ক পরিচালক মিনাক্ষী গাঙ্গুলী এক বিবৃতিতে বলেছেন” ভারত সরকার প্রমাণ করেছে তারা ধর্মীয় সংখ্যালঘু ঝুঁকিতে থাকা অন্যান্য গোষ্ঠী গুলোকে হামলা থেকে রক্ষা করতে আগ্রহী নয়। সংস্থাটি জানিয়েছে ২০১৭ সালে গরু জবাই কিংবা গোস্ত বিক্রির কারণে অন্তত: ৩৮ টি হামলা হয়েছে মুসলিমদের উপর। এতে নিহত হয়েছেন ১০ জন। মানবাধিকার সংস্থাটি বলেছে এসব ঘটনায় দোষীদের শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে পুুলিশ উল্টো গো হত্যার নামে ভুক্ত ভোগীদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে।
১৮৫৮ ইংরেজীর জুন মাসের ৪ তারিখে বৃটিশ পার্লামেন্টের তদানীন্তন তুখোড় সদস্য জন ব্রাইট বৃটিশ পার্লমেন্টে দেওয়া এক বক্তৃতায় বলেছিলেন,
“How long does England propose to govern India? Nobody can answer this question. But be it 50 or 100 or 500 years, does any man with the smallest glimmering of commonsense believe that so great a country, with its 20 different nationalities and its 20 different languages, can ever be bounded up and consolidated into one compact and enduring empire confine? I believe such a thing to be utterly impossible.” অর্থাৎ “ইংল্যান্ড ভারতকে কত সময় ধরে শাসন করতে চায়? কেউ এ প্রশ্নের উত্তর দিতে পারবেনা। ৫০ বৎসর, অর্থবা ১০০ বৎসর বা ৫০০ বৎসর। অস্পষ্ট সাধারন জ্ঞান নিয়ে এত বড় একটি দেশ যেখানে ২০টির মত জাতি এবং ২০টি মত বিভিন্ন ভাষা নিয়ে গঠিত এক বিরাট মানব গোষ্ঠীকে একটি সুগঠিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত সাম্রাজ্যে পরিণত করা যাবে? আমি মনে করি ইহা সম্পূর্ণ অসম্ভব।” যাই হউক ১৯৪৭ সালে মোহাম্মদ আলী জিন্নার নেতৃত্বে ধর্মের ভিত্তিতে ভারত কে বিভক্ত করে পাকিস্তান নামে মুসলিম রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়। ভারত বর্ষের বাকী অংশ নিয়ে ভারত প্রজাতন্ত্রের সৃষ্টি। ২৬ই জানুয়ারি ১৯৫০ সনে ভারতীয় পার্লামেন্টে সে দেশের শাসনতন্ত্র গৃহীত হয়। কিন্তু সে শাসনতন্ত্রে সুনির্দিষ্ট ভাবে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা উল্লেখ ছিলনা। ১৯৭৬ সালেই ভারতীয় শাসনতন্ত্রে ভারতকে “সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ এবং গণতান্ত্রিক রিপাবলিক “হিসাবে ঘোষণা করা হয়, তখন থেকেই প্রকৃত পক্ষে ধর্মনিরপেক্ষতা ভারতীয় শসনতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক নীতি হিসাবে গৃহীত হয়। কিন্তু পন্ডিত জত্তহর লাল নেহেরু ১৯৬১ ইংরেজীতে সম্ভবত তারও আগে বলতেন “ Our constitution lays down that we are secular state” এই নীতি গ্রহনের ফলে যে কোন ধর্মের মৌলিক নীতিমালা ভিওিতে কোন আইন প্রণয়ন করা বন্ধ হয়ে যায়।

ভারত ধর্মনিরপেক্ষতা রাষ্ট্রীয় নীতি হিসাবে গ্রহণ করার আগে বিশ্বে আরেকটি দেশে ধর্মনিরেপক্ষতা অতি সাফেল্যের সহিত প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল সে ছিল ফ্রান্স। ১৭৮৯-৯৪ সালে ফরাসী বিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল। এর ফল স্বরূপ, ফ্রান্স ধর্মের প্রভাব ম্্ুক্ত একটি রাষ্ট্র হিসেবে বড় সাফল্যের সহিত সংগঠিত হতে সক্ষম হয়েছিল। ঐ দিকে কিন্তু ১৯২৫ সালে রাষ্ট্রীয় সেবক সংঘের (R.S.S) সৃষ্টি হয় তখন থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত শুধু হিন্দুত্ববাদ কায়েমের পিছনে তাদের সমস্ত সাংগঠনিক শক্তি নিয়োগ করা হয়। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামে এমন কি একটি দিনও তারা ব্যয় করার প্রয়োজন মনে করেন নাই তখন তাদের রাজনৈতিক দল ছিল জনসংঘ এখন হয়েছে বি.জে.পি।

কিন্তু যদি বলা হয় হিন্দু মহাসভা ভারতে সাম্প্রদায়িকতার জন্য এক মাত্র দায়ী তাহলে তা হবে মিথ্যাচার। ১৯৪৭ সালের পরেও পাকিস্তানে ও অনেক সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, হাঙ্গামা হয়েছিল এবং বহু হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক আহত, নিহত হয়েছিল ফলে অনেক হিন্দু বাধ্য হয়ে নিজ মাতৃভূমি পাকিস্তান ছেড়ে ভারতে আশ্রয় নিতে হয়েছিল । এর ফল স্বরুপ ভারতে কংগ্রেস দলের একটি অংশ ধর্ম নিরেপক্ষতা বজায় রাখতে পারেন নাই তাঁরা ভারতে ইসলামের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামায় অংশগ্রহণ করে। এমন কি ভারতে সরকারী চাকরীতে মুসলমানদের নিয়োগ প্রায় বন্ধ করে দেওয়া হয়। যুক্ত প্রদেশের তদানীন্তন মুখ্যমন্ত্রী পন্ডিত বল্লভ পান্তকে ১৯৫০সালের এপ্রিল মাসে ভারতের তদানীন্তন প্রধান মন্ত্রী জওহর লাল নেহেরু চাকরীতে মুসলমানদের বৈষম্যের ব্যাপারে একটি কড়া চিটি লিখিছিলেন। নেহেরুর শত চেষ্টা পরও পরিস্তিতি সামাল দিতে তিনি সক্ষম হন নাই ।

যাই ইউক, ইন্দিরা গান্ধীর ক্ষমতা লাভের পর তিনি ভারতে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির প্রচলন করার প্রয়াস আরম্ভ করেন । এই লক্ষ্যে তিনি ব্যাংক এবং বীমা জাতীয়করণ করেন এবং ভারতীয় অর্থনীতির অন্যান্য সেক্টরেও জাতীয়করণের প্রয়াস অব্যাহত রাখেন কিন্তুু ১৯৯০ দশক থেকে পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে সমাজতন্ত্রের দ্রুত বিলুপ্তি আরম্ভ হয়। এমন কি ১৯৯১ সালে সোভিয়েট ইউনিয়ন বিলুপ্ত হয়ে সেখানে সমাজতান্ত্রিক ব্যব¯থার প্রায় অবলুপ্তি ঘটে। সোভিয়েট ব্লকের সাথে ভারতের হ্ঠাৎ অর্থনৈতিক সম্পর্কের বিচ্ছিন্নতায় একটা হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি হয়। কাজেই ভারতের অর্থনীতির সমাজতান্ত্রিক কাঠামোর দ্রুত পরিবর্তন এবং উদার অর্থনেতিক নীতির প্রচলন শুরু হয়। এই পরিস্থিতির পূর্ণ সুযোগ আর,এস এস গ্রহণ করে এবং উগ্রজাতীয়বাদ বিস্তারে তারা সর্বশক্তি নিয়োগ করে।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে দ্রুত পট পরির্বতনের সাথে সাথে ভারতে আদর্শ ভিওিক কোন অর্থনৈতিক কর্মসূচী বা মানবতাবাদী কোন কর্মসূচী ছাড়া শুধু সাম্প্রদায়িকতা স্থায়ী ভাবে নির্বাচনে ভোট সংগ্রহের হাতিয়াওে পরিণত হয়। আর,এস,এস এর পূর্ণ সুযোগ গ্রহণ করে তাঁদের সাম্প্রদায়িক আদর্শকে উগ্র জাতীয়তাবাদ হিসাবে ভোট সংগ্রহের অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করতে থাকেন। ১৯৯২ সালের বাবরী মসজিদ ধ্বংসকে একটি জাতীয় সাফল্য হিসাবে প্রচার করতে কোন বাধার সম্মুখীন হতে হয় নাই। বিশ্ব ডান পন্থার দিকে ধাবিত হওয়া এবং বাবরী মসজিদ ধ্বংস--ইহা ছিল এক বিস্ময়কর “সমকালীনতা” (Synchronism)| । এই ঘটনা আরও প্রমাণ করেছে, নির্বাচনে সাম্প্রদায়িকতা বিরাট প্রভাব ফেলতে পারে।

উল্লেখযোগ্য কোন অর্থনৈতিক কর্মসূচী ছাড়া শুধু পাবলিক সেক্টরের পরিবর্তে বৃহৎ পুঁজির অবাধ স্বাধীনতার কর্মসূচী দিয়ে বি.জে.পি ১৯৯৯ সাল থেকে ২০০৪ সাল পর্যন্ত ভারতের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকতে সক্ষম হয়েছে। নরেন্দ্র মোদী গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী থাকাকালীন সময়ে গুজরাটে দাঙ্গা সংঘটিত হয়েছিল। সে দাঙ্গা, ১২ বৎসর পর উনাকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হতে সহায়ক হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন প্রায় নিস্তেজ হয়ে যাওয়ায় বি. জে. পির পক্ষে বিনা বাঁধায় বড় ব্যবসায়ীদের র্সব প্রকার সুযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। সে জন্য নরেন্দ্র মোদী ২০১৪ সালে ভারতের পরিকল্পনা কমিশনকে প্রথমেই স্তব্দ করে দেওয়ার কাজটা সেরেছেন। পাকিস্তান যে নীতির উপর চলছে, সে নীতির উপর ভারত চলতে পারেনা। কারন ভারত বিশে^ দ্বিতীয় বৃহত্তম জনবহুল দেশ।পাকিস্তান ধর্মভিত্তিতে সৃিষ্ট হলেও ভারতের স্বাধীনতার স্থপতিরা এত জ্ঞানি, ত্যাগী এবং দুরদৃষ্টি সম্পন্ন ছিলেন যে বিশাল ভারত কোন একক ধর্মের ভিত্তিতে চলতে পারেনা তা বুঝতে পেরেছিলেন বলে ধর্মকে রাষ্টের ভিত্তি না করে ধর্মনিরপেক্ষতাকে ভিত্তি করেছিলেন। কারণ কোন সম্প্রদায় যদি সমভাবে রাষ্টীয় সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে না পারে সেক্ষেত্রে সে সম্প্রদায় রাষ্ট্রকে নিজের মাতৃভূমি হিসাবে মনে প্রাণে মানতে পারে না। যখন বিরাট একটা সম্প্রদায় ঐ অব¯থায় পতিত হয় তখন রাষ্টের ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়ে। গান্ধীজী ছিলেন সমাজতন্ত্র বিরোধী এবং নিতান্ত ধার্মিক, কিন্তু নেহেরু প্রমুখের সাথে ধর্মনিরপেক্ষতার ব্যাপারে একমত হয়েছিলেন ভারতের ঐক্যের স্বার্থেই। পাকিস্তান বিশ্বের সেরা রাষ্ট্র বিজ্ঞানীদের মতে একটি rogue স্টেট। ভারত পাকিস্তানকে অনুকরন করতে পারে না।


shahabuddinkhaled47@gmail.com