নিউজটি শেয়ার করুন

রামুতে এক মহা পন্ডিতের বিদায়

বাংলাদেশী বৌদ্ধদের তৃতীয় সর্বোচ্চ ধর্মীয় গুরু ও উপসংঘরাজ,কক্সবাজারের রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহা বিহারের অধ্যক্ষ, একুশে পদকপ্রাপ্ত, উপসংঘরাজ পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথেরো ছিলেন সৎ,নিরহংকার,সদালাপী ও বহুগুনে গুনান্বিত একজন পরিপূর্ন ব্যক্তিত্ব। তিনি বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মানুষ হলেও স্থানীয় মুসলমান সমাজের সাথে ছিল তার আত্মার সম্পর্ক।তিনি কখনও জাতির্ধম ভেদাভেদে বিশ্বাসী ছিলেন না। সকল সম্প্রদায়ের মানুষকে তিনি সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ রাখতেন।

তার মৃত্যুতে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের মাঝে যেমন শোক বিরাজ করছে তেমনি স্থানীয় মুসলান সম্প্রদায়ের মাঝেও সমান শোক প্রতিয়মান। তার ব্যাক্তিত্ব,সরলতা, নীতি ও আদর্শ মানুষকে প্রভাবিত করেছে। তার মৃত্যুর মাধ্যমে রামু তথা কক্সবাজারের মানুষ একজন নির্ভযোগ্য অভিবাককে হারাল। তার মৃত্যুর এ বিশাল ক্ষতি রামুর মানুষের পুষিও উঠা কখন্ও সম্ভব নয়। পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের ছিলেন অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির জীবন্ত কিংবদন্তী। আজীবন তিনি সকল ধর্মের মানুষের হৃদয়ের মনিকৌঠায় চির অম্লান হয়ে থাকবে।

সত্যপ্রিয় মহাথের ১৯৩০ সালের ১০ জুন কক্সবাজার জেলার রামু উপজেলার ফতেখাঁরকুল ইউনিয়নের পশ্চিম মেরংলোয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম হরকুমার বড়ুয়া এবং মাতার নাম প্রেমময়ী বড়ুয়া। তিনি তার বাবা-মায়ের তিন সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠতম। তার পিতৃদত্ত নাম বিধু ভূষণ বড়ুয়া।

১৯৫০ সালে মাত্র ২০ বছর বয়সে তিনি বৌদ্ধ ভিক্ষু হিসাবে উপসম্পদা গ্রহণ করে সত্যপ্রিয় মহাথের নাম ধারণ করেন। এর পর তাঁর গুরু ভান্তে আর্য্যবংশ মহাথেরর সঙ্গে তিনি চলে যান উখিয়ার ভালুকিয়া বৈজয়ন্তি বিবেকারাম বৌদ্ধ বিহারে। ওই বিহারের অধ্যক্ষ হিসাবে দায়িত্বভার গ্রহন করেন পন্ডিত সত্যপ্রিয় ।

সেখানে কয়েক বছর থাকার পর তিনি পড়াশুনার জন্য মির্জাপুর পালি কলেজে চলে যান। এর পর ১৯৫৪ সালে তিনি বৌদ্ধ ধর্ম প্রচারের জন্য মিয়ানমারে চলে যান। প্রায় ১০বছর পর ১৯৬৪ সালে মিয়ানমার থেকে ফিরে সেই থেকে রামু সীমা বিহারে অবস্থান গ্রহন করেন। সেই থেকে দীর্ঘ ৭০ বছরের ভিক্ষু জীবনে তিনি বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার প্রসারে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা সত্যপ্রিয় মহাথের ১৯৫৫ সালে মিয়ানমারের ধর্মদূত পালি কলেজে অগ্রমহাপন্ডিত উ. বিশুদ্ধায়ু মহাথের ও প্রজ্ঞালোক মহাথেরর কাছে পালি ভাষা ও বিনয় শিক্ষা লাভ করেন। এ মহান পূণ্যপুরুষ পৃথিবীর বহু ভাষায় পারদর্শী। বৌদ্ধ ধর্মের পবিত্র ধর্মীয় গ্রন্থ ত্রিপিটকের বিভিন্ন অধ্যায় থেকে বাংলা ভাষায় অনুবাদ করে বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করেন সত্যপ্রিয় মহাথের।

এছাড়া ২০০৬ সালে বাংলাদেশী বৌদ্ধ ভিক্ষুসংঘের সর্বোচ্চ ধর্মীয় সংগঠন বাংলাদেশ সংঘরাজ ভিক্ষু মহাসভার সভাপতির পদ লাভ করেন। তিনি সমাজসেবায় একুশে পদক, ২০১৫, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বৌদ্ধ ছাত্র সংসদ কর্তৃক শান্তি পুরস্কার, ২০১০,সমাজসেবায় অবদানের জন্য মায়ানমার থেকে ‘অগ্গমহাসদ্ধর্মজ্যোতিপতাকা’, ২০০৩ সম্মাননা সহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হন।

এছাড়া তিনি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধেও অসাধারণ সাহসী ভূমিকা রাখেন শ্রীমৎ সত্যপ্রিয় মহাথের। যুদ্ধ-চলাকালীন তিনি এলাকার সহস্রাধিক অসহায় ও নির্যাতিত মানুষকে ২০১২ সালে সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় পুড়িয়ে দেওয়া ঐতিহ্যবাহি পুরাতন সেই কাঠের বিহারে আশ্রয় দেন। এ নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সদস্যদের সঙ্গে তাঁর বাকবিতন্ডাও হয়।

২০১৫ সালে সমাজ সেবায় বিশেষ অবদানের জন্য প্রয়াত এই বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু একুশে পদক লাভ করেন। উল্লেখ্য যে গত (৩ অক্টোবর)বৃহস্পতিবার দিনগত রাত পৌনে একটার দিকে ঢাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ (পিজি) হাসপাতালে পরলোক গমন করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯০ বছর। এরিই মাধ্যমে দীর্ঘ ৭০ বছরের ভিক্ষু জীবনের অবসান হল।

এ মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে সারা দেশের বৌদ্ধ সমাজে শোকের ছায়া নেমে আসে। (৪ অক্টোবর) শুক্রবার বিকাল ৩টায় পন্ডিত সত্যপ্রিয় মহাথের’র মরদেহ রামু কেন্দ্রীয় সীমা মহাবিহারে আনা হয়। ঐদিন সন্ধ্যা ৬টায় পূণ্যদান অনুষ্ঠানের মাধ্যমে প্রয়াত ভিক্ষুকে বিহারে প্রবেশ করানো হয়। আগামী ৯ অক্টোবর সংঘদান ও পেটিকাবদ্ধ অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হবে।

(৪ অক্টোবর) শুক্রবার বেলা পৌনে তিনটার দিকে এই বৌদ্ধ ধর্মীয় গুরু সত্যপ্রিয় মহাথেরর মরদেহ রামুতে পৌঁছলে শোকাহত হাজারো বৌদ্ধ নারী-পুরুষ সহ সর্বস্তরের জনতা ও প্রশাসনিক কর্তকর্তা এবং রাজনীতিবিদরা প্রবীণ এ বৌদ্ধ ভিক্ষুর মরদেহ’র প্রতি সম্মান ও ফুলেল শ্রদ্ধা জানান। তাঁর শিষ্য রামু সীমা বিহারের সহকারী পরিচালক প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু জানান, হঠাৎ করে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে উন্নত চিকিৎসার জন্য গত ১৫ সেপ্টেম্বর তাকে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সেখানে কেবিন ব্লকের ৩২০ নম্বর কক্ষে তিনি চিকিৎসাধীন ছিলেন। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে ২১ সেপ্টেম্বর করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিও) নেওয়া হয়। শারীরিক অবস্থার একটু উন্নতি হওয়ায় গত মঙ্গলবার (১ অক্টোবর) তাকে পুনরায় কেবিনে নিয়ে আসা হয়। সেখানে ৩ অক্টোবর বৃহস্পতিবার রাত পৌনে একটার দিকে তিনি পরলোক গমন করেন।