নিউজটি শেয়ার করুন

জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী : প্রাথমিক শিক্ষা পরিবারের করণীয়

১৯৭১ সালে রক্তস্নাত এক মুক্তিসংগ্রামের মধ্য দিয়ে স্বাধীনতা লাভ করে বাংলাদেশ। ‘এক জাতি এক দেশ, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ’- মুক্তিযুদ্ধের জনপ্রিয় এ শ্লোগান থেকেই প্রতীয়মান হয়, একটি জাতি গঠন করতে গিয়ে বাঙ্গালী জাতির অবিসংবাদিত নেতাকে কত কষ্টের স্রোত পার হতে হয়েছিল।

দূরদর্শী রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছিলো বলেই যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশে প্রথম গুরুত্ব পায় শিক্ষাখাত। এ শিক্ষার সূচনাতেই রয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষার স্তর। ১৯৭৩ সালে দেশের প্রায় ৩৭ হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জাতীয়করণ করেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯৭৩ সালের এ পদক্ষেপকে যদি ‘চারাগাছ রোপন’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয় তাহলে এ চারাগাছটি মহীরুহে পরিণত হয়েছে বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য ও দক্ষ প্রশাসনিক দক্ষতায়।

২০১৩ সাল পরবর্তী সৃষ্ট হওয়া প্রায় ২৬ হাজার বেসরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করণ করা হয় বঙ্গবন্ধুর গৃহীত শিক্ষা সম্প্রসারণ নীতির ধারাবাহিকতায়। বর্তমান সরকার প্রাথমিক শিক্ষাখাতে সর্বাপেক্ষা গুরুত্ব আরোপ করেছে। এ প্রেক্ষিতে ৫৮ হাজার কোটি টাকার প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচী (PEDP 3- Primary Education Development Project-3) এর মাধ্যমে গ্রহণ করা হয়েছে ব্যাপক উন্নয়ন কার্যক্রম।

শিক্ষাবছরের প্রথম দিনেই স্কুলগামী সব শিশুর জন্য সরবরাহ করা বিনামূল্যে সম্পূর্ণ নতুন বই। প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের নতুন পদ সৃষ্টির মাধ্যমে চালু হয়েছে প্রাক্-প্রাথমিক শ্রেণি। এতে করে প্রাথমিক স্তরে ভর্তিচ্ছু শতভাগ শিশুর ভর্তি নিশ্চিতের পথ সুগম হয়েছে, হ্রাস করা হয়েছে ঝরে পড়ার হার।

জাতিসংঘের আয়োজনে ২০০০ সালের সেপ্টেম্বর মাসে অনুষ্ঠিত হয়েছিল সহস্রাব্দ উন্নয়ন সম্মেলন। এ সম্মেলনের ৮টি লক্ষ্যের অন্যতম ছিল সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা, যা ২০১৫ সালের মধ্যে বাস্তবায়নের অঙ্গীকার করা হয়। জাতিসংঘ ঘোষিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (Millennium Development Goals- MDG) অর্জনের মেয়াদ শেষ হয়েছে। এ ধারাবাহিকতায় জাতিসংঘ ঘোষণা করে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট Sustainable Development Goals- SDG। ২০১৬ সালের জানুয়ারী থেকে এ বিশ্বের পরিবর্তনে SDG অর্জনের কাজ শুরু হয়েছে যা শেষ হবে ২০৩০ সালের ৩১শে ডিসেম্বর। ১৭টি টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের অন্যতম হলো- সকলের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ ও জীবনব্যাপী শিক্ষা লাভের সুযোগ সৃষ্টি।

জাতির জনকের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে জাতীয় পর্যায়ে গৃহীত কর্মসূচির সাথে সংগতি রেখে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। গত ১৫মে ২০১৯ তারিখে যে ১৬টি কর্মপরিকল্পনা গৃহীত হয়, তার ধারাবাহিকতায় দেশের প্রত্যেকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় সম্পৃত্ত হবে। তারই প্রেক্ষিতে প্রাথমিক স্কুলগামী প্রত্যেক শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মাঝে কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হবে। ১৬টি কর্মপরিকল্পনার মধ্যে অধিকাংশেই সম্পৃত্ত থাকবে প্রান্তিকস্কুলও।

এরমধ্যে নিম্নোক্ত  প্রণিধানযোগ্য পরিকল্পনাগুলো শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মাঝে বিশাল উদ্দীপনা সৃষ্টি করবে।

১। পূর্বের ধারাবাহিকতায় জন্মশতবার্ষিকীকে সামনে রেখে ১ই জানুয়ারী ২০২০ ও ১ই জানুয়ারী ২০১০ বই বিতরণ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হবে যা বই উৎসব হিসেবে বর্ণাঢ্য হয়ে থাকবে।
২। সম্ভাব্য ১৯ই মার্চ ২০২০ তারিখ ঢাকায় ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠানের লক্ষে জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে বঙ্গবন্ধু গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল ও বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন্নেসা মুজিব গোল্ডকাপ প্রাথমিক বিদ্যালয় ফুটবল টুর্ণামেন্ট হবে দেশের প্রত্যেক প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে।
৩। এপ্রিল ২০২০ সালে বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনার মাধ্যমে ‘জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ’ পালন করা হবে।
৪। জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপন উপলক্ষে ৮ই সেপ্টেম্বর ২০২০ ‘আর্ন্তজাতিক সাক্ষরতা দিবস’ যথাযোগ্য মর্যাদায় পালিত হবে।
৫। ‘মুজিব বর্ষ’ ব্যাপী প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে বিভিন্ন কর্মসূচি ও অর্জন সমূহের আলোকে উপজেলা থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে সেমিনার/সিম্পোজিয়াম আয়োজন করা হবে।
৬। ‘মুজিব বর্ষ’ ব্যাপী জেলা, উপজেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে মা-সমাবেশ আয়োজন করা হবে। এমনকি একজন প্রাথমিক শিক্ষার্থী বা তার মা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ে সংযুক্ত হতে পারবে।
৭। পুরো ‘মুজিব বর্ষেই’ প্রাথমিক বিদ্যালয় সমূহে ‘বঙ্গবন্ধু বুক কর্ণার’ কার্যকর করা হবে এবং এ কর্ণারে জাতির জনকের জীবনাদর্শের উপর প্রকাশিত বইসমূহ ঠাঁই পাবে।
৮। ‘মুজিব বর্ষ’ উপলক্ষে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে শহীদ মিনার স্থাপিত হবে।
৯। মুজিব বর্ষ উপলক্ষে সকল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ইত্যাদি আয়োজন করা হবে যাতে সম্পৃত্ত করা হবে স্টুডেন্টস কাউন্সিলকে।
১০। জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে ৩য় ও ৫ম শ্রেণির সকল শিক্ষার্থীর বাংলা পঠন দক্ষতা শতভাগে উন্নীত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
১১। জন্মশতবার্ষিকী উদ্যাপনের জন্য স্থানীয় প্রশাসনের সার্বিক সমন্বয়ে র‌্যালীর আয়োজন করা হবে।
১২। ‘মুজিব বর্ষ’ উপলক্ষে ২১ লক্ষ নিরক্ষরকে সাক্ষরতা দান করা হবে।

উপরোক্ত কর্মপরিকল্পনায় প্রত্যেকটি প্রাথমিক বিদ্যালয় সংশ্লিষ্ট থাকবে বলে বিশাল কর্মচাঞ্চল্য সৃষ্টি হবে। শিক্ষাকে আনন্দদায়ক করার পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রম জোরদার হবে। তাই সার্বিকভাবে বলা যায় যে, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী পালন জাতিসংঘ ঘোষিত ঝউএ অর্জনের পথকে সুগম করার বিশাল সুযোগ এনে দেবে।

 

লেখক: সহকারী শিক্ষক, কদলপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাউজান।