নিউজটি শেয়ার করুন

সংসদে বিল পাস: ‘ধর্ষিতা’ নয়, ধর্ষণের শিকার

সিপ্লাস ডেস্ক: ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে সংসদে ‘নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) বিল- ২০০০’ বিল পাস হয়েছে। আইনে ‘ধর্ষিতা’ শব্দটি বদলে ‘ধর্ষণের শিকার’ শব্দবন্ধ ব্যবহার করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (১৭ নভেম্বর) রাতে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে বিলটি পাসের প্রস্তাব উত্থাপন করেন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বেগম ফজিলাতুন নেসা। অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।

বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ সম্বলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, নারী ও শিশু ধর্ষণ একটি জঘন্য অপরাধ। নারী ও শিশু নির্যাতনমূলক অপরাধসমূহ কঠোরভাবে দমনের উদ্দেশ্যে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন- ২০০০ প্রণয়ন করা হয়। কিন্তু বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উন্নয়নের মধ্যে দেশে নারী ও শিশু ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটন সামাজিক গতিশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ও সার্বিক সামাজিক উন্নয়নের ধারাকে বিশেষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই এমন অপরাধ দমনে অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এমতাবস্থায় আইনে সর্বোচ্চ দণ্ডের বিধান যুক্ত করতে এই বিল আনা হয়েছে।

স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে বিলটি পাসের সময় জনমত যাচাই ও বাছাই কমিটিতে পাঠানোর প্রস্তাব দেন বিএনপির মো. হারুনুর রশিদ ও ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা এবং জাতীয় পার্টির মো. ফখরুল ইমাম ও শামীম হায়দার পাটোয়ারী। তারা বলেন, শুধু কঠোর আইন করলেই ধর্ষণ বন্ধ হবে না, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে। একইসঙ্গে আইনের কঠোর প্রয়োগ করতে হবে। আইনটি অধ্যাদেশের মাধ্যমে ইতোমধ্যে কার্যকর হলেও ধর্ষণ ও নারী নির্যাতন এখনো বন্ধ হয়নি।

বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের সংশোধীতে ‘ধর্ষিতা’ শব্দটির বদলে ‘ধর্ষণের শিকার’ শব্দবন্দ বসানোর সুপারিশ করে। সোমবার সংসদে এ সংক্রান্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়। প্রতিবেদনে ধর্ষিতা শব্দটি লিঙ্গ বৈষম্যের পরিচায়ক বলে বিভিন্ন সময় মত আসার প্রেক্ষাপটে মূল আইনের ৯ (২) ধারাসহ কয়েক জায়গায় ‘ধর্ষিতা’ শব্দটি বাদ দিয়ে ‘ধর্ষণের শিকার’ শব্দবন্দ বসানোর সুপারিশ করা হয়।

২০০০ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের ৯(১) উপধারায় বলা হয়, যদি কোনো পুরুষ কোনো নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করেন, তাহলে তিনি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হবেন এবং এর অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হবেন। সংশোধিত আইনের খসড়ায় ৯ (১) উপধারায় ‘যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড’ শব্দগুলো ‘মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড’ শব্দগুলো দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে।

আইনের ৯ (৪) (ক) উপধারায় ছিল- যদি কোনো ব্যক্তি কোন নারী বা শিশুকে ধর্ষণ করিয়া মৃত্যু ঘটানোর বা আহত করার চেষ্টা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তি যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন এবং ইহার অতিরিক্ত অর্থদণ্ডেও দণ্ডনীয় হইবেন। এই উপধারা সংশোধন করে খসড়ায় ‘যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড’ এর পরিবর্তে ‘মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড’ শব্দগুলো যোগ করা হয়েছে। অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ধর্ষণ ছাড়া সাধারণ জখমের ক্ষেত্রে অপরাধ আপসযোগ্য হবে। এছাড়া আগের আইনে ১৯৭৪ সালের শিশু আইনের রেফারেন্স ছিল। এখন সেখানে হবে ‘শিশু আইন- ২০১৩’।

২০০০ সালের আইনের ৩২ ধারায় বলা ছিল, ‘এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধের শিকার ব্যক্তির সর্বাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করিয় মেডিকেল পরীক্ষা সরকারি হাসপাতালে কিংবা সরকার কর্তৃক এতদুদ্দেশ্যে স্বীকৃত কোন বেসরকারি হাসপাতালে সম্পন্ন করা যাইবে। ’

বিলে অপরাধের শিকার ব্যক্তির পাশাপাশি ‘অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তির’ মেডিকেল পরীক্ষা করার বিষয়টি যুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া ৩২ ধারার সঙ্গে ৩২(ক) শিরোনামে নতুন একটি ধারা যুক্ত করা হয়েছে বিলে। সেখানে বলা হয়, এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তি এবং অপরাধের শিকার ব্যক্তির ধারা ৩২ এর অধীন মেডিকেল পরীক্ষা ছাড়াও, উক্ত ব্যক্তির সম্মতি থাকুক বা না থাকুক, ২০১৪ সালের ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক এসিড (ডিএনএ) আইনের বিধান অনুযায়ী তার ডিএনএ পরীক্ষা করতে হবে।

এর আগে ৮ নভেম্বর বিলটি সংসদে উত্থাপন করেন প্রতিমন্ত্রী। এরপর বিলটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে এক সপ্তাহের মধ্যে সংসদে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার জন্য মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। সংসদীয় কমিটি বিলটি চূড়ান্ত করে সোমবার (১৬ নভেম্বর) সংসদে উত্থাপন করে।