নিউজটি শেয়ার করুন

ফের লকডাউনে কি প্রভাব পড়বে অর্থনীতিতে?

শাহরুখ সায়েল: বৈশ্বিক মহামারি করোনার দ্বিতীয় ঢেউ শুরু হয়েছে। করোনার প্রথম ধাক্কার ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার আগেই নতুন করে করোনার সংক্রমণের হার অতি মাত্রায় বেড়ে যাওয়ায় পরিস্থিতি সামাল দিতে আগামীকাল থেকে ৭ দিনের লকডাউন দিয়েছে সরকার।

করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের নেতিবাচক প্রভাব নিঃসন্দেহে অর্থনীতিতে পড়বে। নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের কর্মসংস্থানে।

ফের লকডাউনের ঘোষণায়, পহেলা বৈশাখ, রমজান ও ঈদকে কেন্দ্র করে ব্যাপক প্রস্তুতি নেওয়া ব্যবসায়ীদের মাথায় হাত। আজ রবিবার সারাদিন বিভিন্ন ব্যবসায়ী সংগঠন ও বিভিন্ন মার্কেটের মালিক সমিতি মানববন্ধন করেছে এবং লকডাউন প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি এ করোনার কারণে শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা এখনও অনুমান করা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ, করোনার শেষ সম্পর্কে এখনও ধারণা করা যাচ্ছে না। ক্ষতির পরিমাণ, জিডিপির ক্ষতি হচ্ছে তা বলা হচ্ছে কিন্তু কি পরিমান ক্ষতি হচ্ছে তা এখন বলা যাচ্ছে না তবে বাস্তবতা হতে পারে ভয়াবহ।

ফের লকডাউনে দেশের অর্থনীতিতে কি ধরনের প্রভাব পড়তে পারে এমন এক প্রশ্নের উত্তরে অর্থনীতিবিদ ও বঙ্গবন্ধু গবেষনা কেন্দ্রের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ সিপ্লাসকে বলেন, মহামারি করোনায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ক্ষতি কম হয়েছে।

পৃথিবীর যে কোনো দেশের চেয়ে ভালো অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। করোনায় বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে নিম্নমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মানুষ। তাদের অর্থনৈতিক কোমর ভেঙে গেছে। ক্ষুদ্র অনেক ব্যবসায়ী ব্যবসা বানিজ্য হারিয়ে নিঃস্ব হয়েছে।

ব্যক্তিগত ভাবে আমি লকডাউন বিরোধী। কারণ লকডাউনে শুধু গরিবের পেটে লাথি পড়ে। লকডাউনে লোকাল উৎপাদন হ্রাস পাবে। জিডিপির উপর প্রভাব পরে।

তারপরও সরকারের কিছু করার নেই। সরকারকে পরিস্থিতি মোকাবেলায় বাধ্য হয়েই লকডাউন দিতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগেই ‘করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের ব্যপারে হুশিয়ারি দিয়েছিলেন।

আমরা সে সময় থেকেই করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউয়ের ব্যাপারে গবেষনা করেছি, গরিবের অর্থনীতি কি রকম হবে তা নিয়ে ভেবেছি। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, করোনার প্রথম ধাক্কার পর যখন লকডাউন তুলে দেওয়া হলো তখন সারাদেশের লক্ষ লক্ষ মানুষ একসাথে পর্যটন কেন্দ্র গুলোতে ভীর জমিয়েছে।

মেজবান, বিয়ে, সামাজিক, রাজনৈতিক বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে নিজের অজান্তেই করোনার চাষাবাদ করেছে। বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বেচে থাকতে হলে লকডাউনের বিকল্প নাই।

মহামারি করোনা নিয়ে আমাদের উদাসীনতা প্রাণ দিয়ে শোধ করতে হবে। এখনই সচেতন না হলে আগামী ঈদের দিন খাবার টেবিলে অনেকেই অনুপস্থিত থাকবে। সরকার এবং আমলাদের দোষ দিয়ে লাভ নেই। লকডাউন এখন বাধ্যতামূলক হয়ে দাড়িয়েছে।

সরকারের অর্থনৈতিক পলিসি মেকার হয়ে দায়িত্ব নিয়েই বলছি, এখনই কঠোর লকডাউন না মানলে অনেক পরিবার তাদের সদস্য হারাবে। প্রাণঘাতী করোনায় গত এক বছরে সরকারের মন্ত্রী, এমপি, সচিব, অতিরিক্ত সচিব, ডিসি, এসপি, ব্যবসায়ীসহ সমাজের অনেক প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তির প্রাণ কেড়ে নিয়েছে।

সরকারি প্রজ্ঞাপনে সবকিছু লেখা যায় না অথবা থাকে না। বেচে থাকার প্রয়োজনে আমাদের নিয়মনীতি মেনে চলতে হবে। কঠোর হতে হবে। জরুরী খাতের পাশাপাশি সামষ্টিক অর্থনীতি, মানুষের কর্মসংস্থান, খাদ্য নিরাপত্তা এবং সামাজিক সুরক্ষার কথা চিন্তা করে অন্যন্য খাত গুলো খোলা রাখতে হবে। তবে অবশ্যই সর্বোচ্চ সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে।

জিডিপি ক্ষতিগ্রস্থ হলেও গ্যাপ দিয়ে হলেও লকডাউন অব্যাহত রাখতে হবে নতুবা করোনা অনেক প্রাণ কেড়ে নিবে, কঠোর আঘাত হানবে।

গবেষনা সংস্থা সানামের পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১৯ সালে দারিদ্রতার হার ছিলো ২০ শতাংশ যা এক বছরের ব্যবধানে বেড়ে দাড়িয়েছে ৪০ শতাংশে। নতুন করে ২০ শতাংশের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে চলে এসেছে। এ বিষয়ে তিনি বলেন,দারিদ্রতা কমাতে পরিকল্পনা নেই। পরিকল্পনামন্ত্রীকে অনুরোধ করবো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করুন। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা তৈরি করতে হবে। কৃষিজাত পণ্য উৎপাদনে গুরুত্ব দিতে হবে। কৃষিই বাংলাদেশের অর্থনীতির মূলচালিকা শক্তি। কৃষিজাত পণ্য দিয়েই বাংলাদেশ বেচে থাকবে।

তিনি বলেন, দেশে প্রায় এক কোটি পরিবার প্রত্যক্ষভাবে রেমিটেন্সের আওতায় রয়েছে। যাদের মধ্যে প্রায় ৭-৮ লাখ মানুষ কর্মহীন হয়ে দেশে ফিরেছেন। বিদেশ ফেরতদের পূর্নবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। অর্থনীতির মৌলিক সূচক রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে ২ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ২.২৫ বা ২.৫০ করলে অর্থনীতি আরো লাভবান হবে।

বেকারত্ব সমস্যা আগে থেকেই চলছিল। অতিমারি তাকে আরও যন্ত্রণাদায়ক করে তুলেছে। এ প্রসংগে অধ্যাপক ড. সৈয়দ আহসানুল আলম পারভেজ বলেন, করোনার কারণে বেকারত্ব, বিষয়টা এরকম নয়। বাংলাদেশে বেকারত্বের হার অশিক্ষিত ও গরীবদের মধ্যে বেশি। উচ্চ শিক্ষিত বেকারের সংখ্যাও কম নয় গবেষনা বলছে ৪০ লক্ষ। বেকারত্ব কমাতে ক্ষুদ্র ঋণ দিয়ে উদ্যোক্তা বাড়াতে হবে।বাংলাদেশের অর্থনীতির ভিত্তি কাঠামো কৃষি খাতকে, গুরুত্ব দিতে হবে।

যা পরিস্থিতি দেখছি, করোনার সংক্রমন পুরো বছর জুড়েই থাকবে। স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় খোলা যাবে না। করোনার প্রভাব দীর্ঘায়িত হলে পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা বলা কঠিন। এই মুহূর্তে লকডাউনের সিদ্ধান্তটি সঠিক। লকডাউন পুরোপুরি ভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকারকে এক্ষেত্রে দক্ষতার পরিচয় দিয়ে লকডাউন নিশ্চিত করতে হবে। এর পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি মেনে লোকাল উৎপাদনও চালু রাখা উচিত। আবারও প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে। লকডাউনের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে অর্থনৈতিক পরিকল্পনা হাতে নিতে হবে।

করোনায় কোটি কোটি মানুষ মারা যাচ্ছে। মৃত্যের মধ্যে গ্রামের তুলনায় শহরের মানুষ বেশি। শেষ কথা হলো লকডাউন ছাড়া কোন পথ নেই।

মানুষের ফের কর্মস্থলে ফেরার পথও রুদ্ধ হবে৷ প্রভাব পড়বে জিডিপিতে। তাই হোটেল/রেস্টুরেন্ট, মার্কেট ইত্যাদি খোলা থাকা জরুরি। তবে যেখানে মানুষ জমায়েত হচ্ছেন সেখানেই বাড়ছে সামাজিক দূরত্ব না মানার প্রবণতা। ফলে এখন দু’মুখো সমস্যায় দেশ। একদিকে ব্যাবসা বাণিজ্য সচল রাখা দরকার। অন্যদিকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ঠেকানোও জরুরি। যেভাবে দেশে সংক্রমণ বাড়ছে তাতে যদি আরও একবার মারণ ভাইরাসের ঢেউ আছড়ে পড়ে তা সামাল দেওয়া কার্যত অসম্ভব।

তাই ৪ ফেব্রুয়ারি (রবিবার) দুপুরে একাদশ সংসদের দ্বাদশ অধিবেশনের সমাপনী ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বলেন, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের দ্বিতীয় ঢেউ সামলাতে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। একটু কষ্ট হবে। তারপরও।

লকডাউনে সমস্যার কথা উল্লেখ তিনি বলেন, ‘মানুষের সমস্যা হবে। তারপরও জীবনটা আগে। জীবন বাঁচানো সবার করণীয়।’ প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘পর্যটন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে। বিদেশ থেকে যাত্রী এলে তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখতে হবে। এক সপ্তাহ অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল বন্ধ থাকবে। শপিং মল বন্ধ থাকবে। তবে অনলাইনে কেনাকাটা করা যাবে। সব নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে। এক সপ্তাহের জন্য লকডাউন ঘোষণা দিয়েছি।’ এগুলো মানলে পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আসবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘করোনা ভাইরাস এখন বিশ্বব্যাপী মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। বাংলাদেশে ২৯, ৩০ ও ৩১ মার্চ করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ খুব বেশি বেড়ে গিয়েছিল। এখনো বাড়ছে। সে কারণে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি সবাইকে মানতে হবে। বিয়েশাদিসহ সব অনুষ্ঠান বন্ধ রাখতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বাইরে থেকে ঘরে ফিরে সবাইকে গরম পানির ভাপ নিতে পরামর্শ দেন।

তিনি বলেন, ‘এবারের ভাইরাসটি কতটুকু খারাপ করল, চট করে তা বোঝা যায় না। পরে দেখা যায়, পরিস্থিতি হঠাৎ খারাপ হয়েছে। তাই সবাইকে সাবধানে থাকতে হবে। স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে। এখন দেখা যাচ্ছে, তরুণ ও শিশুরাও সংক্রমিত হচ্ছে। তাদের সুরক্ষিত রাখতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি। আমরা টিকার দ্বিতীয় ডোজ শুরু করবো। আরও টিকা আনা হবে। টিকা আনার ব্যবস্থা করবো।’

উল্লেখ্য, করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে আগামীকাল সোমবার থেকে সাত দিন লকডাউন ঘোষণা করে গণপরিবহন চলাচল বন্ধের পাশাপাশি বাজার-মার্কেট, হোটেল-রোস্তোরাঁসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ আরোপ করে প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার।