নিউজটি শেয়ার করুন

উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী, চলে গেছে অর্ধ যুগ, ফলাফল শূণ্য! চট্টগ্রামের আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগার

নির্মাণের ৬ বছর পরও চরম অনিশ্চয়তায় চট্টগ্রামের খাদ্য পরীক্ষাগার

বিশেষ প্রতিবেদন:  কথা ছিলো- ভেজালে খাদ্যের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান হবে। নিশ্চিত করবে খাদ্যের মান। এই লক্ষ্যে ব্যয় করা হয়েছিলো প্রায় ৩২ কোটি টাকা।বিবির হাটে উঠেছিলো বিল্ডিং। কেনা হয়েছিলো দামী দামী যন্ত্রপাতি। উদ্বোধন করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কিন্তু ছয় বছর পেরিয়ে গেলেও ফলাফল ঘোড়ার ডিম ছাড়া কিছুই নেই। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধন হওয়া প্রকল্প কেন কারা বাস্তবায়ন করতে দিলো না তা খতিয়ে দেখা দরকার বলে মনে করেন সচেতনরা।

আধুনিক এই পরীক্ষাগারে দুধ ও দুধ জাতীয় পণ্য, মিষ্টি ও মিষ্টি জাতীয় পণ্য, কার্বনেটেড বেভারেজ, জুস জাতীয় পণ্য, ড্রিংকিং ওয়াটার, সস জাতীয় পণ্য, মসলা পণ্য, স্ন্যাকস্ , বেকারি পণ্য, আইসক্রিম, ড্রাই স্যুপ, নুডলস, পাস্তা, আটা, ময়দা, সুজি সহ ২০ জাতীয় খাবার পরীক্ষা করা হবে।দুটি পরীক্ষাগারের বারোটি ল্যাবের জন্য কেনা হয়েছে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। চট্টগ্রামে স্থাপিত হয়েছে ছয়টি ফুড সেফটি ল্যাব। খাদ্যের ভেজাল শনাক্ত ও গুণাগুণ নির্ণয়ে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ে ৮২ টি যন্ত্রপাতি স্থাপন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন পণ্যের নমুনা সংগ্রহ করে এসব ল্যাবে পরীক্ষাও করেছে প্রতিষ্ঠানটি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) চট্টগ্রাম অঞ্চলের সম্পাদক এডভোকেট আখতার কবির বলেছেন, এটা হিসাব নিকাশ করে প্রকল্প করেনি,করেছে লুটপাট করার জন্য। খাদ্য নিরাপত্তা প্রকল্প আজ খুব জরুরী কিন্তু লোক দেখানো লুটপাট প্রকল্পের কারণে আজ নাগরিকরা সেবা পাচ্ছে না। প্রধানমন্ত্রীর প্রকল্প দেখাশুণার দায়িত্বে থাকা অফিসাররাও কেন চুপ থাকে তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

প্রায় ৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার ৬ বছর পরও চরম অনিশ্চয়তায় এই খাদ্য পরীক্ষাগারের ভবিষ্যত।

নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত খাবার নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম নগরীর বিবিরহাটে নির্মাণ করা হয়েছে আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগার (মর্ডান ফুড সেফটি ল্যাব)।

২০১৩ সালের ১২ অক্টোবর এই খাদ্য পরীক্ষাগারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রকল্প বাস্তবায়নের মেয়াদ ছিল ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে এ পরীক্ষাগারের অবকাঠামো নির্মাণকাজ শেষ হয়েছে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে।

উদ্বোধনের আগেই ট্রায়ালেই বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়ে পরীক্ষাগারটি।

জনবলের বেতনসহ নানা খরচের বোঝা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে চলছে ঠেলাঠেলি।

আধুনিক এই খাদ্য পরীক্ষাগারে পর্যাপ্ত শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের অভাবে চালু করা যাচ্ছে না অনেক যন্ত্রপাতি। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ করার জন্য ১০টি এসি কিনে রাখলেও তা এখন পর্যন্ত স্থাপন করা হয়নি। তার মধ্যে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিতের জন্য জেনারেটর থাকলেও লোকবল ও ব্যবস্থাপনার অভাবে তাও নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছে। পাশাপাশি বকেয়া বিদ্যুৎ বিলের জন্য কয়েকমাস আগে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা হয়েছে।

নির্মাণের ৬ বছর পরও চরম অনিশ্চয়তায় চট্টগ্রামের খাদ্য পরীক্ষাগার

এমন তথ্য পাওয়া যায় আজ সোমবার (২৩ আগস্ট) দুপুর ২টার দিকে আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগার ঘুরে। শুধু তাই নয়, বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় আর ব্যাকআপ জেনারেটর লাইন চালু না থাকায় নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার যন্ত্রপাতি। এ সুবাধে অফিস সময়ে গার্ড ছাড়া আর কেউ উপস্থিত থাকে না বলে জানায় স্থানীয়রা।

এ দিন সরেজমিনে ফুড সেফটি ল্যাবে এসে দুইজন কর্মচারী ছাড়া আর কাউকে চোখে পড়েনি প্রতিবেদকের। বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় অনেকেই অফিসে আসেন না বলে জানান স্থানীয়রা। এমনকি আরবান পাবলিক অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট হেলথ সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (ইউপিইএইচএসডিপি) মেয়াদ গত বছর জুনে শেষ হওয়ার পরেও এই ল্যাব চসিকের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি বলে জানান স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোবারক আলী। মোটকথা মেয়াদ শেষে পরীক্ষাগারটি পরিচালনা করার কথা ছিল চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের।

নির্মাণের ৬ বছর পরও চরম অনিশ্চয়তায় চট্টগ্রামের খাদ্য পরীক্ষাগার

চসিক সূত্র জানায়, ২০১৩ সালে সেপ্টেম্বরে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগার স্থাপন প্রকল্প নেয় স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন ও চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন এলাকায় দুটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। ইতিমধ্যে দুই শহরেই ৬৩ কোটি ৮৭ লাখ ২৬ হাজার টাকা ব্যয়ে দুটি আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগার স্থাপিত হয়।

 

নির্মাণের ৬ বছর পরও চরম অনিশ্চয়তায় চট্টগ্রামের খাদ্য পরীক্ষাগার

২০১৬ সালের ২৭ এপ্রিল মর্ডান ফুড সেফটি ল্যাব এ খাদ্যের নমুনা পরীক্ষার অনুমতি চেয়ে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের নিকট আবেদন করেছিল চসিক। ওই আবেদনের প্রেক্ষিতে খাদ্য মন্ত্রণালয় ২০১৬ সালের ২৮ নভেম্বর ‘মান রক্ষা করা, প্রশিক্ষিত ও অভিজ্ঞ জনবল নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি স্থাপন ও তার রক্ষণাবেক্ষণের ব্যবস্থা করা’ এই তিন শর্তে পরীক্ষার অনুমোদন দেয়া হয়।

চসিকের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ আলী জানান, চসিকের চাওয়া অর্গানোগ্রাম জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না পেলে কোন কাজে আসবে না ল্যাবটি। তাই অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী জনবল নিয়োগ খুবই জরুরি। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের পর অর্থমন্ত্রণালয় থেকে ছাড় পেলে সিটি কর্পোরেশন এখানে জনবল নিয়োগ করতে পারবে। তাহলে ল্যাবটি নগরীর জনস্বাস্থ্য রক্ষায় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।

সিটি কর্পোরেশনের কাউন্সিলর মো: মোবারক আলী সিপ্লাসকে বলেন, নগরীতে যতগুলো রেস্টুরেন্ট বা খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান আছে, সেগুলোকে সিটি কর্পোরেশন থেকে লাইসেন্স নিতে হয়। কিন্তু কোন ল্যাব না থাকায় তাদের ফুড কোয়ালিটি যাচাই করার সিটি কর্পোরেশনের কোন সুযোগ নেই। ল্যাবটি কাজ শুরু করতে পারলে এবং সিটি কর্পোরেশন চাইলে প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের খাদ্যের নমুনা ও মান পরীক্ষাপূর্বক লাইসেন্স দিতে পারবে।

নির্মাণের ৬ বছর পরও চরম অনিশ্চয়তায় চট্টগ্রামের খাদ্য পরীক্ষাগার

এছাড়া চট্টগ্রাম থেকে বিদেশে অনেক খাদ্য রপ্তানি ও চট্টগ্রামে অনেক খাদ্য আমদানি হয়। সেগুলোর মানও যাচাই করতে পারবে ল্যাবটি। এতে জনস্বাস্থ্য রক্ষা যেমন নিশ্চিত হবে, তেমনি মোটা অংকের রাজস্ব অর্জন করতে পারবে সিটি কর্পোরেশন।

চট্টগ্রামের আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগারের আরবান পাবলিক অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট হেলথ সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের ম্যানেজার কাউসার পাটোয়ারী সিপ্লাসকে বলেন, গত জুনে আমাদের প্রজেক্টের মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু তার আগে থেকেই আমরা উক্ত ল্যাবটি বুঝে নেওয়ার জন্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি  দিয়েছি এবং সিটি কর্পোরেশনকে লিখিতভাবে জানিয়েছি। তারপরও কর্পোরেশন ল্যাবটি বুঝে নিচ্ছেন না। ২০১৩ সালের ১২ অক্টোবর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগারটির ভিত্তিপ্রস্থর উদ্বোধন করেন। নির্মাণ কাজ শেষ হওয়ার পর ৬ বছর ধরে ল্যাবটি পরীক্ষামুলকভাবে চলছে। এ খাদ্য পরীক্ষাগারের প্রজেক্ট প্রকল্প থেকে অভিজ্ঞ ও দক্ষ ১৯ জন জনবল নিয়োগ দেয়া হয়েছে। তা চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন জানে। নির্মাণের ৬ বছর পরও চরম অনিশ্চয়তায় চট্টগ্রামের খাদ্য পরীক্ষাগার

এখন আমাদের মেয়াদ শেষ, সিটি কর্পোরেশন চাইলে আমাদের রাখতে পারে কিংবা বিদায় করতে পারে। তবে আমরা এখানে অনেকগুলো পরীক্ষা করি। খুব শীঘ্রই সিটি কর্পোরেশনের সাথে আমাদেরও সমঝোতা হবে। তারপর নগরবাসীর জন্য ভাল ফলাফল বয়ে আনবে এ ল্যাবটি।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সেলিম আকতার চৌধুরীর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের সচিব খালেদ মাহমুদ সিপ্লাসকে বলেন, আমার চেয়ে নির্বাহী কর্মকর্তা মহোদয় এ ব্যাপারে ভাল বলতে পারবেন।

নির্মাণের ৬ বছর পরও চরম অনিশ্চয়তায় চট্টগ্রামের খাদ্য পরীক্ষাগার
অত্যাধুনিক মেশিন

চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ শহীদুল আলম এ বিষয়ে সিপ্লাসকে বলেন, এই প্রকল্পের মেয়াদ গত জুন মাসে শেষ হয়েছে। তবে এখনও সিটি কর্পোরেশনের কাছে হস্থান্তর করা হয়নি। মন্ত্রণালয়ের একটি চিঠি দেখেছি। তাতে  ল্যাবটির জনবলের বেতন দেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। যেখানে এখনও পর্যন্ত আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগারটি চসিকের কাছে হস্তান্তর হয়নি, সেখানে বেতন দেওয়ার কোন প্রশ্নই আসে না। তার উপর সিটি কর্পোরেশন এত টাকার বোঝা নিতে চায় না। তাই আমরাও স্থানীয় সরকার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে একটি চিটি দিয়েছি। এতে পিপিপির কাছে উক্ত আধুনিক খাদ্য পরীক্ষাগার হস্তান্তরের জন্য বলা হয়েছে। এখনো ৫ লাখ টাকার বিদ্যুৎ বিল বকেয়া আছে। তার জন্য বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেছে পিডিবি।

নির্মাণের ৬ বছর পরও চরম অনিশ্চয়তায় চট্টগ্রামের খাদ্য পরীক্ষাগার
চসিকের ময়লা আবর্জনা ফেলার ভ্যানগাড়ি রাখে ল্যাবের পাশে

স্থানীয়রা জানান, পরিপূর্ণ কার্যক্রম না থাকায় নগরীর আধুনিক এই খাদ্য পরীক্ষাগারের আশপাশের জায়গা সিটি কর্পোরেশনের ময়লা আবর্জনা ফেলার ভ্যানগাড়ি রাখার স্থানে পরিণত হয়েছে।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments