নিউজটি শেয়ার করুন

দুই লাখ টাকা ঋণ নেয়া আলমের দায় এখন ২৫ লাখ!

ছবি: সংগৃহীত

সিপ্লাস ডেস্ক: নাটোরে রামাইগাছি মহল্লার শাহআলম ও শিরিন বেগম দম্পতি ২০১৮ সালে এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে চড়া সুদে দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন। সেই টাকা পরিশোধ করতে একে একে ঋণ নেন আরও তিনজনের কাছ থেকে। তিন বছরের মাথায় সুদ বাবদ ১৪ লাখ টাকা পরিশোধ করেন। তারপরও ঋণের জাল থেকে মুক্ত হতে পারেননি এই দম্পতি। এখনও তারা ১১ লাখ টাকা ঋণী। ঋণ থেকে মুক্তি পেতে শেষ পর্যন্ত কোনো উপায় না পেয়ে জেলা প্রশাসনের শরণাপন্ন হয়েছেন শাহ আলম।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঋণ পরিশোধ করতে গত তিন বছরে শাহ আলম পৈতৃক দুই বিঘা জমি বিক্রি করেছেন। চার শতক জমির ওপর আধাপাকা বসতবাড়ি ছাড়া এখন আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। বৃহস্পতিবার (২ সেপ্টেম্বর) নাটোরের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের কাছে একটি লিখিত আবেদন করেছেন নিঃস্ব শাহ আলম।

শাহ আলম পেশায় একজন মেডিকেল টেকনিশিয়ান। স্ত্রী শিরিন বেগম গৃহিনী। তাঁদের ঘরে রয়েছে তিন শিশুসন্তান।

ভুক্তভোগীদের লিখিত আবেদন ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সংসারের স্বচ্ছলতা বাড়াতে তিন বছর আগে একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার খোলেন শাহ আলম। এ সময় প্রতিবেশী মাসুম আলীর স্ত্রী লাকি বেগমের কাছ থেকে সুদের ওপর দুই লাখ টাকা নেন। প্রতিষ্ঠানে যা আয় হতো, তার বেশির ভাগ চলে যেত সুদের টাকা পরিশোধে। কিন্তু করোনা মহামারিতে ব্যবসায় টান পড়ে। ঘরভাড়া আর সংসার খরচ জোগানোই মুশকিল হয়ে পড়ে। সুদের বকেয়া টাকা ঋণের মূল টাকার সঙ্গে যুক্ত হতে থাকে। ঋণদাতা সুদ আর বাকি রাখতে চান না। বাধ্য হয়ে আরও দুজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে প্রথম ঋণদাতার সুদ পরিশোধ করতে থাকেন তাঁরা। এতে ঋণ ও সুদের ভার আরও বাড়তে শুরু করে। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া দুই বিঘা জমিও বিক্রি করে দেন। এখন রয়েছে চার শতকের শুধু বসতভিটা ও আধা পাকা একটি ঘর।

ঋণদাতাদের দাবিমতে, বুধবার পর্যন্ত তাঁকে ঋণমুক্ত হতে হলে আরও ১১ লাখ টাকা লাগবে। এ হিসাব শুনে তাঁদের দুঃচিন্তার শেষ নাই। এদিকে ঋণদাতারা তাঁর ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আসেন টাকা আদায়ের জন্য। এমনকি প্রতিষ্ঠানে তালা দেওয়ার হুমকি দেন। এ অবস্থা দেখে ডায়াগনস্টিকের বাড়ির মালিক বাড়ি ছাড়ার নোটিশ দিয়েছেন।

শাহ আলম আরও বলেন, যাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছি তারা আমাদের মানসিক নির্যাতন করছেন। বাধ্য হয়ে ডিসি ও এসপি স্যারের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে শাহ আলমের স্ত্রী শিরিন বেগম বলেন, প্রতিদিনই টাকার জন্য বাড়িতে আসেন সুদ ব্যবসায়ীরা। আমাকে এবং আমার স্বামী-সন্তানদের অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন। এসব ঝামেলা দেখে ভবনের মালিক ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মালামাল বের করে ঘর খালি করে দিয়েছেন। আমাদের আয়ের পথও বন্ধ হয়ে গেছে।

এ বিষয়ে লাকি বেগমের স্বামী মাসুম আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তিনি রংমিস্ত্রির কাজ করেন। তাঁর স্ত্রী বাসায় ছিট কাপড় বিক্রি করেন। সুদের ব্যবসা করেন না। ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অংশীদার হওয়ার জন্য শাহ আলমকে তাঁর স্ত্রী সাত লাখ টাকা দিয়েছিলেন। এক বছর ভালোই লাভ দিয়েছিলেন। কিন্তু অনেক দিন হলো একটি টাকাও লাভ দেননি। অংশীদারত্বের কাগজ আছে বলে তিনি দাবি করেন।

সরেজমিনে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় ব্যক্তিরা জানেন, মাসুম আলীর স্ত্রী লাকি সুদের ব্যবসা করেন। তবে তাঁদের ভয়ে কেউ নাম প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে রাজি হননি।

শাহ আলমের স্ত্রী শিরিন বেগম বলেন, ‘আমাদের মতো ভুল যেন আর কেউ না করে। গ্রামের সুদখোরদের মায়া–মমতা বলে কিছু নাই। তারা শুধু টাকা নিয়েই যাচ্ছে, শোধ হচ্ছে না। তাদের বিরুদ্ধে কেউ দাঁড়ায় না। তাদের রয়েছে পোষা মাস্তান। কিছু বললেই তারা হুঙ্কার দিয়ে ওঠে।’

নাটোরের পুলিশ সুপার লিটন কুমার সাহা বলেন, শাহ আলম-শিরিন দম্পতির দরখাস্ত পেয়েছেন। তাঁরা সুদের ব্যবসায়ীদের খপ্পরে পড়ে নিঃস্ব হয়েছেন। বিষয়টি তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments