নিউজটি শেয়ার করুন

দীর্ঘ ৯ বছর ধরে লাইনম্যান দিয়ে চলছে হাটহাজারী পৌরসভার বিদ্যুৎ বিভাগ

দীর্ঘ ৯ বছর ধরে লাইনম্যান দিয়ে চলছে হাটহাজারী পৌরসভার বিদ্যুৎ বিভাগ

সিপ্লাস প্রতিবেদক: দীর্ঘ ৯ বছর ধরে অষ্টম শ্রেণি পাশ বিদ্যুৎ লাইনম্যান মনোয়ারকে দিয়ে চলছে হাটহাজারী পৌরসভার বিদ্যুৎ বিভাগ। ডিজিটাল যুগে মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী হল বিদ্যুৎ। প্রতিটি পৌরসভায় বিদ্যুৎ বিভাগে ২ জন  উপ সহকারী প্রকৌশলী থাকলেও হাটহাজারী পৌরসভায় কোন প্রকৌশলী নাই। আছে শুধুমাত্র একজন লাইনম্যান। এই একজন লাইনম্যানকে দিয়েই চলছে হাটহাজারী পৌরসভার বিদ্যুৎ বিভাগ। এতদিন ধরে কেন কোন প্রকৌশলী নিয়োগ দেয়া হচ্ছেনা এই প্রশ্ন সব পৌরবাসীর। লোকবল সংকটের কারণে পৌরবাসীর বিদ্যুৎ সেবায় ব্যাঘাত ঘটছে বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।

হাটহাজারী পৌরসভার বিদ্যুতের লাইনম্যান মনোয়ারের বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর অভিযোগের অন্ত নেই। বিগত ২০১৮ সালে ২৫ নভেম্বর পৌর প্রশাসকের নিকট একজন প্রকৌশলীসহ মনোয়ারের বিরুদ্ধে স্মারকলিপি দেওয়া হলেও বহাল তবিয়তে থেকে যায় মনোয়ার এমনটাই দাবী স্থানীয়দের।

দীর্ঘ ৯ বছর ধরে লাইনম্যান দিয়ে চলছে হাটহাজারী পৌরসভার বিদ্যুৎ বিভাগ

পৌরসভার বিদ্যুৎ বিভাগের মোটর সাইকেল ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে মনোয়ারের বিরুদ্ধে। নিজ কর্মক্ষেত্র পৌরসভা হলেও তাকে অন্যান্য জায়গায়ও কাজ করতে দেখা যায়। সবাইকে সে পৌরসভার কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দেয়। তার চাল-চলন দেখে কেউ বুঝতে পারবেনা তার শিক্ষাগত যোগ্যতা কী বা সে পৌরসভার কর্মকর্তা নাকি কর্মচারী।

দীর্ঘ ৯ বছর ধরে লাইনম্যান দিয়ে চলছে হাটহাজারী পৌরসভার বিদ্যুৎ বিভাগ
মুহিব নামে একব্যক্তি পৌর সহায়ক কমিটির সদস্যকে রিপ্লেই করে এ মন্তব্যটি করেন

একাধিক সুত্রে জানা যায়, পৌরসভার পশ্চিমে ফায়ার সেন্টারের সাথে লাগোয়া জমি কিনেছে মনোয়ার, সহকারী প্রকৌশলী এবং সাবেক উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সহ আরো কয়েকজনে এমন অভিযোগ করেন স্থানীয় অনেকেই। এই জায়গায় যাতায়াতের জন্য করেছেন মজবুত রাস্তা ও ব্রীজ। এদের সাথে মিলেই মূলত মনোয়ার গড়ে তুলেন অনিয়মের পাহাড়। পৌরসভা আর উপজেলা বলতে গেলে মনোয়ারদের হাতে জিম্মি। তাদের যৌথ মেলবন্ধনে গড়ে উঠেছে আধিপত্য আর অনিয়মের সিন্ডিকেট।

পৌরসভার নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মচারী জানান,  ১৬তম গ্রেডে অষ্টম শ্রেণি পাশ একজন বিদ্যুৎ লাইনম্যান ৯৩০০ মূল বেতন সহ সব মিলিয়ে ১৫ থেকে ১৬ হাজার টাকা বেতন পান প্রতি মাসে।কিন্তু মনোয়ার এই অল্প বেতন পেয়েও থাকেন বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে যার আনুমানিক ভাড়া ৯ হাজার টাকা। এরপর আনুষাঙ্গিক সব খরচ মিলে তার মাসিক ব্যয় দাঁড়ায় ২৫/৩০ হাজার টাকার ও বেশি। আমরাও তো একই গ্রেডে চাকরি করি কিন্তু এই দুর্মুল্যের বাজারে এই স্বল্প বেতনে সাধারনভাবে চলতেও আমাদের কষ্ট হয়।

হাটহাজারী পৌরসভা এলাকায় মনোয়ার সুপারভাইজার হিসেবে পরিচিত। তার দাপটে পৌরবাসীরা তটস্থ। মনোয়ারের কারণে পৌরসভার নাগরিকেরা ইমার্জেন্সি বিদ্যুৎ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ করেন অনেক সেবা প্রার্থী।

মনোয়ার মোটরসাইকেল নিয়ে সারাদিন পৌরসভার এ প্রান্ত থেকে প্রান্ত দাঁপিয়ে বেড়ান। কর্মরত অন্যান্য  কর্মচারীরা তাকে স্যার বলেও সম্বোধন করতে বাধ্য হন এমন অভিযোগ করেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কর্মচারী।
পৌরসভার বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের ঠিকাদার হিসেবে মনোয়ার মাঠে নানা প্রকল্পের সাইটে ব্যস্থ থাকেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন। সরকারি চাকরি করেও মনোয়ার কীভাবে ঠিকাদারী কাজ করেন এ প্রশ্ন অভিযোগকারীদের। দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছে পৌরসভা এ নিয়ে জনমনে অনেক ক্ষোভ। এলাকাবাসী সরকারি কর্মচারিদের এসব অনিয়ম তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

পৌরসভায় কর্মরত একজন জানান, পৌরসভার সব কাজের বেশির ভাগ বিল মনোয়ারের নামে হয়। বিল কিংবা ক্যাশ বই দেখলেই দেখবেন প্রায় সব বিলে রয়েছে তার স্বাক্ষর। যদি মনোয়ার কে ম্যানেজ করা যায় তাহলে অন্যায় করলেও ছাড় পাওয়া যাবে। ধরতে গেলে মনোয়ারই এ পৌরসভার সব কিছু। গ্রামের বাড়ীতে তৈরী করেছেন দালানকোটাও। আমরা এটাও শুনেছি তার নাকি কক্সবাজারে জায়গা আছে।

দীর্ঘ ৯ বছর ধরে লাইনম্যান দিয়ে চলছে হাটহাজারী পৌরসভার বিদ্যুৎ বিভাগ
হাটহাজারী জাতীয় শ্রমিক লীগরে সভাপতি উদয় সেন ফেসবুকে এ কমেন্টসটি করেন

পৌরসভার বাসিন্দা ও আওয়ামী লীগের নেতা উদয় সেন হাটহাজারী উপজেলা আওয়ামী লীগের ফেসবুক পেইজে একটি কমেন্টস করে লিখেছেন “হাটহাজারীর মানুষকে বোকা বানিয়ে কিছু দালাল সৃষ্টি করেছে, তার মধ্যে পৌরসভার লাইনম্যান মনোয়ারের মাধ্যমে অনেক টাকার ধান্দাবাজি করেছে। তার একটি প্রমাণ হল আনোয়ার কোম্পানি থেকে মনোয়ার ৫ লাখ টাকা নেন ইউএনওকে ম্যানেজ করতে। কাজ না করেই মনোয়ার সে টাকা আত্মসাৎ করে। সে ৫ লাখ টাকা থেকে আড়াই লাখ টাকা আনোয়ার কোম্পানিকে দিলেও বাকি টাকা সে এখনও দেয়নি”।

স্থানীয় সংবাদকর্মী নাজিম উদ্দীন ফেসবুকে এ কমেন্টসটি করেন

গোপন সূত্রে জানা যায়, পৌর এলাকার বিভিন্ন উৎস থেকে সদ্য বিদায়ী ইউএনও’র কথা বলে টাকা তোলেন এ মনোয়ার। এ সুযোগে মনোয়ার হয়ে উঠে সবার কাছে স্যার।

পৌর সহায়ক কমিটির কয়েকজন সদস্য জানান, আমরা নামমাত্র সদস্য। কারণ বিভিন্ন অনিয়ম আর দূর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলি তার জন্য আমাদের কে তেমন ডাকেন না এবং ডাকলেও যাই না। পৌরসভার শুরুতে সহকারী প্রকৌশলী বেলাল আর মনোয়ারসহ যারা চাকরিতে যোগদান করেছেন অদ্যবধি পর্যন্ত তারা কর্মরত রয়েছেন। তো তারা দূর্নীতি না করে কে করবে। শুধু তা নয় হাটহাজারীতে কোন সরকারী কর্মকর্তা আর কর্মচারী আসলে সহজে যেতে চান না। কারণ এখানে অনিয়ম আর দূর্নীতি করা খুবই সহজ।

পৌরসভার বিদ্যুৎ লাইনম্যান মনোয়ার হোসেন এর কাছে জানতে চাইলে এ প্রতিবেদককে জানান, এখানে আসলে কেবলমাত্র সিভিল বিভাগে প্রকৌশলী আছেন। বিদ্যুৎ বিভাগে কোন প্রকৌশলী নেই। শুধু আমি একজন লাইনম্যান আছি এবং মাস্টার রুলে ৩ জন হেল্পার আছেন। আমার ব্যাপারে কে কি বলে তা বলতে পারবনা। এ বিষয়ে পৌর কর্তৃপক্ষই ভাল জানেন। তবে আমি সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করি।

ফেসবুকে পৌরসভার বিদ্যুৎ লাইনম্যান মনোয়ারকে নিয়ে করা কমেন্টস এর বিষয়ে জানতে চাইলে হাটহাজারী জাতীয় শ্রমিক লীগের সভাপতি উদয় সেন সিপ্লাসকে বলেন, যেটা লিখেছি সেটা খুবই সামান্যটা লিখেছি। আনোয়ার কোম্পানি থেকে ৫ লাখ টাকা নিয়েছে তা নয়। এ মনোয়ার পৌরসভার সব কাজেরই ঠিকাদারী করে। আপনি আরও শুনলে অবাক হবেন। পৌরসভার হিসাব সহকারী সাহাব,একরাম ও মনোয়ারসহ মিলে ফয়েস লেকে ফ্ল্যাটের ব্যবসা করে। তারা এখানে চাকরি করে কিভাবে আবার ফ্ল্যাটের ব্যবসা করে। আরেকটি কথা বলি পৌরসভার যতগুলো পাবলিক টয়লেট আছে। সবগুলোর কাজ ও পরিচালনা করে এই মনোয়ার।

হাটহাজারী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সোহরাব হোসেন নোমান সিপ্লাসকে বলেন, মনোয়ার কেন সবাই তো পৌরসভাকে চুষে খেয়ে ফেলছে। এখানে অনেক সাংবাদিক আছে কেউ এ সব বিষয় নিয়ে কোন কথাই বলে না কিংবা লেখে না। কেন লিখে না তা শুধু আমরা নয় সকল পৌরবাসীরাই জানেন। আমাদের পরে গঠিত হওয়া সব পৌরসভায় নির্বাচন হয়েছে। কিন্তু আমাদের পৌরসভায় নির্বাচন না হওয়ার কারণে নাগরিকরা কাংঙ্খিত সেবা পাচ্ছে না। এ সুযোগে মনোয়ার গংরা লুটেপুটে খেয়ে যাচ্ছে। তারপরও পৌরসভায় যারা সহায়ক কমিটিতে আছে, তাদেরকে আর্থিক সহায়তা দিয়ে বিদায় করে দেয়। তাই প্রতিবাদ করার কেউ নেই। কেবল আমিই সব কিছুতেই প্রতিবাদ করেই যাচ্ছি।

পৌর সচিব বিপ্লব চন্দ্র মুহরী বলেন, জনবল সংকট থাকায় মনোয়ার হোসেন সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করে। এখন পর্যন্ত পৌরসভার বিদ্যুৎ বিভাগে কোন প্রকৌশলী নিয়োগ দেয়া হয়নি। তবে একজন বিদ্যুৎ লাইনম্যান আছে। এছাড়াও মাস্টার রুলে ৩ জনকে নেওয়া হয়েছে। এর বাইরে মনোয়ার কি করে তা আমার জানা নেই।

এ বিষয়ে জানতে পৌর প্রশাসক মো: শাহীদুল আলম সিপ্লাসকে বলেন, আমি আসার পর থেকে আশাকরি পৌরসভায় বিদ্যুৎ বিভাগের তেমন সমস্যা হয়নি। এর আগে কি হয়েছে সেটা আমার জানা নেই। পৌরসভার যেখানে লাইটের সমস্যা সেটা তাৎক্ষনিকভাবে সমাধান করা হয়েছে। যদি পৌরসভার বিদ্যুৎ বিভাগে কোন সহকারী প্রকৌশলী নিয়োগের সুযোগ থাকে, তাহলেই সেটাই আমি দেখব। আমি দ্বায়িত্ব নেওয়ার আগে কে কি করেছে তা আমার জানা নেই।

 

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments