নিউজটি শেয়ার করুন

চট্টগ্রাম সাইবার ট্রাইব্যুনাল,বিচারিক কার্যক্রম কেমন চলছে?

চট্টগ্রাম সাইবার ট্রাইব্যুনাল,বিচারিক কার্যক্রম কেমন চলছে?
ছবি: সংগৃহীত

মোঃ নেজাম উদ্দীন,আদালত প্রতিবেদক: চলতি বছরের শুরুতে চট্টগ্রাম আদালতে সাইবার ট্রাইব্যুনাল প্রতিষ্ঠার পর থেকে এখন পর্যন্ত ধীরে ধীরে মামলা সংখ্যা বাড়লেও, কমছে না খারিজের সংখ্যা। ট্রাইব্যুনালের বিচারের যথাযথ প্রমাণ না পেলে মামলা ফাইলিং এর সময় অনেক মামলা খারিজ করা হয় এবং কথেক মামলা প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বা গ্রহণ যোগ্য শুনানীর জন্য রাখা হয়।

বুধবার (৮ সেপ্টেম্বর) সাইবার ট্রাইব্যুনালের পেশকারের অনুমতিক্রমে ফাইলিং রেজিষ্ট্রার, মামলার কার্য তালিকা পর্যালোচনা করে এবং ট্রাইব্যুনাল পিপি এড মন্জুরুল ইসলাম থেকে এমন তথ্য পাওয়া যায়।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে সাইবার ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এড. মনজুরুল ইসলাম সিপ্লাসকে বলেন, চট্টগ্রাম সাইবার ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর থেকে এখন পর্যন্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারায় মামলা হচ্ছে। তার মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারা উল্লেখ করে বেশী মামলা হতে দেখা যাচ্ছে, মুলত উক্ত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারার অপরাধ সৃষ্টি হচ্ছে সোস্যাল মিডিয়া  বিশেষ করে ফেইসবুকে  বিভিন্ন ব্যক্তির নামে মানহানিকর উক্তি প্রদর্শন করে প্রচার করার কারণে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে অন্য একজন সিনিয়র  আইনজীবী এড. মো: মুজিবুল হক সিপ্লাসকে বলেন, চট্টগ্রামে সাইবার ট্রাইবুনাল গঠনের পর থেকে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে বিভিন্ন ধারায় মামলা হচ্ছে, তবে প্রাথমিক পর্যায়ে মামলা ফাইলিং এর সময় মামলার যথাযথ প্রমান না পেলে মামলা প্রথমেই খারিজ করা হয়। অন্যদিকে আদালত মামলার বিষয়াদি যথাযথ অধিকতর প্রমাণের প্রয়োজন মনে করলে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন নতুবা প্রয়োজনে মামলার তথ্যাদি নিয়ে অধিকতর গ্রহণযোগ্য শুনানীর জন্য রাখা হয়।

বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের  আদেশে প্রথমে একমাত্র ঢাকায় ২০১৩ সালে সাইবার ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। পরে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট থেকে দেশের প্রত্যেক বিভাগে একটি করে সাইবার ট্রাইবুনাল গঠন করার নিদের্শ দেওয়া হয়। তৎ প্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম বিভাগেও চট্টগ্রাম জজ আদালতে ২০২১ সালে জুডিসিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত ভবনের ৬ষ্ঠ তলায় একটি সাইবার ট্রাইবুনাল গঠন করা। উক্ত ট্রাইবুনাল গঠনের পর থেকে মামলা সংখ্যা বাড়লেও খারিজের সংখ্যাও তেমন কম নয়।

চট্টগ্রামে সাইবার ট্রাইব্যুনাল গঠনের পর থেকে আজ (৮ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত চট্টগ্রাম বিভাগের মোট ১৩১ টি ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের বিভিন্ন ধারায় মামলা হয়েছে, তার মধ্যে ১০২ টি মামলা চট্টগ্রাম জেলার, ১২ টি মামলা কক্সবাজার জেলার, আর বাকি ২৭ টি মামলা নোয়াখালী, কুমিল্লা, বি-বাড়িয়াসহ বিভিন্ন জেলার।এতে ৪২ টি মামলা যথাযথ প্রমান না পাওয়ায় মামলা ফাইলিং এর সময় খারিজ করা হয়েছে। ২৯ টি মামলা প্রতিবেদন দাখিলের জন্য রাখা হয়েছে।আর বাদ বাকি মামলাগুলো গ্রহণযোগ্য শুনানীর আদেশক্রমে চলমান রয়েছে। অনেক মামলার গ্রহণযোগ্যতা শুনানী অন্তে ৩০২ ধারায় খারিজ করা হয়। অধিকাংশ মামলা ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারায় দায়ের করতে দেখা যায়। তবে আদালত গঠনের পর থেকে আজ (৮ সেপ্টেম্বর) পর্যন্ত কোন মামলার চূড়ান্ত রায় প্রচার/নিস্পত্তি করা হয়নি।

আদালত সুত্রে জানা যায়, চট্টগ্রাম সাইবার ট্রাইবুনালে গত ০১ এপ্রিলে দায়রা জজ এসকে এম তোফায়েল হাসান যোগদান করেন। এককভাবে উক্ত সাইবার ট্রাইব্যুনালের বিচার কার্য পরিচালনার জন্য তাকে নিযুক্ত করা হয়। তিনি নিযুক্ত হওয়ার পর ১ এপ্রিল থেকে ৪ এপ্রিল পর্যন্ত করোনা মহামরির কারণে হাইকোর্টের নির্দেশে ৮/২১নং বিজ্ঞপ্তি মোতাবেক মামলা ফাইলিং বন্ধ ছিল। এরপর গত ২ মে থেকে হাইকোর্ট এর নির্দেশে ১৯/২১ নং বিজ্ঞপ্তি মোতাবেক বিচারককে  স্বশরীরে উপস্থিত থেকে বাদীর জবানবন্দী ক্রমে মামলা গ্রহণের আদেশ হয়। পরে ২৯ জুলাই থেকে ৫ আগষ্ট পর্যন্ত মামলা ফাইলিং বন্ধ ছিল। এরপর ৬ আগস্ট থেকে হাইকোর্টের ৩৪/২১ নং আদেশ মুলে সীমিত পরিসরে মামলা ফাইলিং চালু হয়ে এখনো পর্যন্ত চালু আছে।

মুলত: ডিজিটাল নিরাপত্তার আইন সারমর্ম অনুযায়ী ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং ডিজিটাল মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধ শনাক্তকরণ, প্রতিরোধ, দমন, বিচার ও আনুষঙ্গিক বিষয়াদি সম্পর্কে বিধান প্রণয়ন করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয়তায় উক্ত আইন বাস্তবায়নে উক্ত ট্রাইব্যুনাল গঠন করার নির্দেশ দেন বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৫ ধারা সারমর্ম হলো:

(১) যদি কোনো ব্যক্তি ওয়েবসাইট বা অন্য কোনো ডিজিটাল মাধ্যমে,(ক) ইচ্ছাকৃতভাবে বা জ্ঞাতসারে, এমন কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ করেন, যাহা আক্রমণাত্মক বা ভীতি প্রদর্শক অথবা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো ব্যক্তিকে বিরক্ত, অপমান, অপদস্থ বা হেয় প্রতিপন্ন করিবার অভিপ্রায়ে কোনো তথ্য-উপাত্ত প্রেরণ, প্রকাশ বা প্রচার করেন, বা(খ) রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি বা সুনাম ক্ষুণ্ণ করিবার, বা বিভ্রান্তি ছড়াইবার, বা তদুদ্দেশ্যে, অপপ্রচার বা মিথ্যা বলিয়া জ্ঞাত থাকা সত্ত্বেও, কোনো তথ্য সম্পূর্ণ বা আংশিক বিকৃত আকারে প্রকাশ, বা প্রচার করেন বা করিতে সহায়তা করেন, তাহা হইলে উক্ত ব্যক্তির অনুরূপ কার্য হইবে একটি অপরাধ।(২) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এর অধীন কোনো অপরাধ সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৩ (তিন) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ৩ (তিন) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।(৩) যদি কোনো ব্যক্তি উপ-ধারা (১) এ উল্লিখিত অপরাধ দ্বিতীয় বার বা পুনঃপুন সংঘটন করেন, তাহা হইলে তিনি অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কারাদণ্ডে, বা অনধিক ১০ (দশ) লক্ষ টাকা অর্থদণ্ডে, বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হইবেন।

ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে সেসব ধারায় মামলা হয় তার মধ্যে কিছু ধারা অআমলযোগ্য/জামিনযোগ্য, আর কিছু ধারা আমলযোগ্য/অজামিনযোগ্য :  

(ক) ধারা ১৭, ১৯, ২১, ২২, ২৩, ২৪, ২৬, ২৭, ২৮, ৩০, ৩১, ৩২, ৩৩ ও ৩৪ এ উল্লিখিত অপরাধসমূহ আমলযোগ্য ও অ-জামিনযোগ্য হইবে; এবং(খ) ধারা ১৮ এর উপ-ধারা (১) এর দফা (খ), ২০, ২৫, ২৯ ও ৪৭ এর উপ-ধারা (৩) এ উল্লিখিত অপরাধসমূহ অ-আমলযোগ্য ও জামিনযোগ্য হইবে;(গ) ধারা ১৮ এর উপ-ধারা (১) এর দফা (ক) তে উল্লিখিত অপরাধসমূহ অ-আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আদালতের সম্মতি সাপেক্ষে আপোষযোগ্য হইবে;(ঘ) অধীন কোনো অপরাধ কোনো ব্যক্তি কর্তৃক দ্বিতীয় বা ততোধিকবার সংঘটনের ক্ষেত্রে উক্ত অপরাধ আমলযোগ্য ও অ-জামিনযোগ্য হইবে।

তবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে দায়ের হওয়া মামলার বিচার পুলিশের তদন্ত সাপেক্ষে:

অপরাধ বিচারার্থ গ্রহণ, ইত্যাদি ৪৮। (১) ফৌজদারি কার্যবিধিতে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, পুলিশ অফিসার লিখিত রিপোর্ট ব্যতীত ট্রাইব্যুনাল কোনো অপরাধ বিচারার্থ গ্রহণ (cognizance) করিবে না।(২) ট্রাইব্যুনাল এই আইনের অধীন অপরাধের বিচারকালে দায়রা আদালতে বিচারের জন্য ফৌজদারি কার্যবিধির অধ্যায় ২৩ এ বর্ণিত পদ্ধতি, এই আইনের বিধানাবলির সহিত সঙ্গতিপূর্ণ হওয়া সাপেক্ষে অনুসরণ করিবে।

তবে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলার নিষ্পত্তির সময়সীমা রয়েছে:

মামলা নিষ্পত্তির জন্য নির্ধারিত সময়সীমা ৫২। (১) ট্রাইব্যুনালের বিচারক এই আইনের অধীন কোনো মামলার অভিযোগ গঠনের তারিখ হইতে ১৮০ (একশত আশি) কার্য দিবসের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করিবেন।

(২) ট্রাইব্যুনালের বিচারক উপ-ধারা (১) এর অধীন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো মামলা নিষ্পত্তি করিতে ব্যর্থ হইলে, তিনি উহার কারণ লিপিবদ্ধ করিয়া উক্ত সময়সীমা সর্বোচ্চ ৯০ (নব্বই) কার্য দিবস বৃদ্ধি করিতে পারিবেন।

(৩) উপ-ধারা (২) এর অধীন নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের বিচারক কোনো মামলা নিষ্পত্তি করিতে ব্যর্থ হইলে, তিনি উহার কারণ লিপিবদ্ধ করিয়া বিষয়টি প্রতিবেদন আকারে হাইকোর্ট বিভাগকে অবহিত করিয়া মামলার কার্যক্রম পরিচালনা অব্যাহত রাখিতে পারিবেন।

একই সাথে মামলা আপীলের সুযোগ রয়েছে :

অপরাধের বিচার ও আপিল ৪৯। (১) আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধসমূহ কেবল ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক বিচার্য হইবে।(২) কোনো ব্যক্তি ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক প্রদত্ত রায়ে সংক্ষুব্ধ হইলে তিনি আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল দায়ের করিতে পারিবেন।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments