নিউজটি শেয়ার করুন

চট্টগ্রামে ভরা মৌসুমে বেড়েছে সারের দাম, ধান উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা

মো: মহিন উদ্দীন: বৈরী আবহাওয়া ও দীর্ঘ লকডাউনের মধ্যেও আমনের এই ভরা মৌসুমে সারের দাম বাড়ার অভিযোগ প্রান্তিক কৃষকদের। এ নিয়ে কৃষকদের মাঝে হতাশা বাড়ছে। এমন অবস্থা চলতে থাকলে এবার আমন ধান উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকরা।

ডিলারেরা সার সংকটের অযুহাত দেখিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে বেশি মুনাফা লাভের আশায় সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি করছে বলে অভিযোগ উঠেছে। অতি প্রয়োজনীয় ইউরিয়া সার সংকটের প্রভাব পড়েছে মাঠ পর্যায়ের প্রান্তিক কৃষকদের উপর।

প্রান্তিক কৃষকদের অভিযোগ, আমন মৌসুমে চাষাবাদের জন্য প্রয়োজনীয় সার কিনতে গেলে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সারের সংকটের কথা বলে আমাদের থেকে দাম বেশি নিচ্ছে। অথচ সরকারি বিধি মোতাবেক প্রতিটি ডিলারের দোকানগুলোতে নির্ধারিত সারের মূল্য তালিকা টাঙিয়ে রাখলেও মানা হচ্ছে না বিক্রয় বিধিমালা। প্রতি বস্তা ইউরিয়া সরকার নির্ধারিত মূল্য ৮০০ টাকার স্থলে বিক্রি হচ্ছে ৯০০ থেকে ৯৫০ টাকা, ১১০০ টাকার টিএসপি ১২০০ থেকে ১২৫০ টাকা, ৭৫০ টাকার এমওপি ৯০০ টাকা ও ৮০০ টাকার ডিএপি বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার টাকায়।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং অধিশাখা সুত্রে জানা যায়, চট্টগ্রামে গত জুলাই, আগস্ট এবং আগামী সেপ্টম্বর মাস পর্যন্ত নন ইউরিয়া সার ( টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি) চাহিদা মোতাবেক বরাদ্দ প্রদান করে ১৪ হাজার ২৭ মেট্রিক টন। যার মধ্যে টিএসপি ৫ হাজার ৮শ ৩৬ মে. টন, ডিএপি ৫ হাজার ৪শ ৪৪ মে. টন এবং এমওপি সার ২ হাজার ৭শ ৪৭ মে. টন।

শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সংস্থা বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) অধীনে একসময় আটটি সার কারখানায় সার উৎপাদন হতো। এর মধ্যে পলাশ ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি লিমিটেড (পিইউএফএফএল) ও ঘোড়াশালে অবস্থিত ইউরিয়া ফার্টিলাইজার ফ্যাক্টরি লিমিটেড (ইউএফএফএল) আধুনিকীকরণের জন্য বন্ধ রাখা হয়েছে।

২০১৯ সালের ২০ মার্চ যান্ত্রিক ত্রুটি ও গ্যাস–সংকটের কারণে সার উৎপাদন বন্ধ করে দেয় সিইউএফএল কর্তৃপক্ষ। রি-টিউবিং (যান্ত্রিক ত্রুটি) শেষে গত ২৬ মার্চ কারখানা খোলা হয়। পরে গত ১ এপ্রিল সন্ধ্যা ৭ টা ২০ মিনিট থেকে এ্যমোনিয়া উৎপাদন শুরু হয়। গত রাত ১১টা ৪০ মিনিটে ইউরিয়া সার উৎপাদন শুরু হয়েছে। বর্তমান গতিতে ঘন্টায় ৩১ থেকে ৩২ মেট্রিকটন সার উৎপাদন হচ্ছে। পূর্ণসক্ষমতায় উৎপাদন শুরু হলে ঘন্টায় ৬০ থেকে ৬৫ মেট্রিক টন সার উৎপাদন হবে বলে সিইউএফএল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন।

দেশে যে ৮টি সার কারখানা রয়েছে তার ছয়টি ইউরিয়া কারখানা। বাকি দুটি টিএসপি ও ডিএপি কমপ্লেক্স।

সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, চলতি অর্থবছরে (২০২০-২১) দেশে ২৫ লাখ ৫০ হাজার মেট্রিক টন সারের চাহিদা ছিল। এর মধ্যে ১০ লাখ ২০ হাজার টন দেশের কারখানায় উৎপাদন হয়েছে। বাকি ১৫ লাখ ৩০ হাজার টন আমদানির মাধ্যমে সংগ্রহ করা হচ্ছে। আগামী অর্থবছরে (২০২১-২২) চাহিদার ২৬ লাখ টনের মধ্যে ৯ লাখ টন দেশের সার কারখানাগুলো থেকে এবং বাকি ১৭ লাখ টন আমদানি করার পরিকল্পনা করা হয়েছে। আমদানি হওয়া সারের বেশির ভাগই ইউরিয়া।

সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে সার কেনা হয়। সম্প্রতি এই কমিটি ৪৪৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বেলারুশ থেকে এক লাখ ৮০ হাজার টন এবং ৭২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে তিউনিশিয়া থেকে এক লাখ ৫০ হাজার টন সার আমদানির অনুমতি দিয়েছে। বেলারুশ থেকে কিনতে প্রতি টনের দাম পড়েছে ২৪ হাজার ৮৮৮ টাকা এবং তিউনিশিয়া থেকে কিনতে ৪৮ হাজার ২৬৬ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে সারের দাম ওঠানামা করে। গড়ে প্রতি টন সারের দাম ৩০ হাজার টাকা করে কেনা হলে চলতি এবং আগামী অর্থবছরে কিনতে ব্যয় হবে গড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকা।

কৃষকরা অভিযোগ করে বলেন, জমিতে সার দেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। তবে সার কেনার জন্য একাধিক দোকানে গেলে খুচরা ব্যবসায়ীরা নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি বস্তায় ১০০-২০০ টাকা করে চাইতেছে। অতিরিক্ত টাকা দিলেই সার পাওয়া যাচ্ছে, নইলে পাওয়া যাচ্ছে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার সাথে সিপ্লাস প্রতিবেদক যোগাযোগ করলে তারা  জানান, কিছু কতিপয় ডিলার-ব্যবসায়ী ও খুচরা সার বিক্রেতাদের সমন্বয়ে একটি সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। মূলত তারাই সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপিসহ সব ধরনের সারের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। প্রতি বস্তা সারে ইচ্ছে মাফিক দাম নিয়ে কৃষকদের কাছে বিক্রি করছে। এভাবে প্রভাবশালী ওই সিন্ডিকেটটি মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার মিশন নিয়ে মাঠে রয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন তারা।

ডিলাররা অভিযোগ করেছেন, আমরা সরকারের নির্ধারিত মূল্যের চাইতে বেশি টাকা নিচ্ছি না। তবে কোন কোন ডিলারকে হয়তো বাফার থেকে সার কিনতে গিয়ে ক্যারিং কন্ট্রাকটর সিন্ডিকেটের কারনে উচ্চ মুল্যে ট্রাক ভাড়া দিয়ে সার কিনতে হয়। আবার অনেকে বাফার ইনচার্জের সাথে সখ্যতা গড়ে বাফার গুদামে না রেখে ডিসপাচ করে নেন। যার কারনে গুদামে পড়ে থাকা সারের গুনগত মান নষ্ঠ হচ্ছে। তাই অনেক খুচরা ব্যবসায়ীরা এ সব নস্ট সার নিতে চায় না। এ কারণে হয়তো তারা বাড়তি টাকা আদায় করতে পারে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন ডিলার  সিপ্লাসকে বলেন, লকডাউনের পাশাপাশি বৈরী আবহাওয়ার  কারণে সার পরিবহনে অসুবিধা হচ্ছে। সে কারণে সাময়িক এই সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। তার মধ্যে কিছু সার পানিতে ভিজে নস্ট হওয়ায় সামান্য টাকা বেশি নেওয়া হচ্ছে।

চট্টগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক কৃষিবিদ মো: মঞ্জুরুল হুদা সিপ্লাস প্রতিবেদক কে বলেন,কোন ডিলার কৃষকদের কাছ থেকে সারের বাড়তি মূল্য নিচ্ছে এরকমের কোন অভিযোগ আমাদের কাছে নেই।  তবুও  এ বিষয়ে আমরা তদারকি করব। সার বিতরণে সরকারি নির্ধারিত মূল্য ছাড়া বেশি দাম নেওয়ার কোন সুযোগ নেই। যদিও চট্টগ্রামে যে পরিমাণের সারের চাহিদা আছে তা থেকে মাঝে মধ্যে বরাদ্দ কম আসে। তার জন্য ডিলারদের মাঝেমধ্যে বাইরে থেকে সার কিনে নিয়ে আসতে হয়।

সুলভে সার প্রাপ্তি নিশ্চিতে প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্তাদের খুচরো বাজারে নজরদারি না থাকায় মুনাফা লোভী সিন্ডিকেটটি মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাঁয়তারা করছে বলে দাবী ভুক্তভোগী প্রান্তিক কৃষকদের।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments