নিউজটি শেয়ার করুন

চট্টগ্রামে নারীর জাতীয় পরিচয় পত্র দিয়ে পুরুষের পাসপোর্ট

চট্টগ্রামে নারীর জাতীয় পরিচয় পত্র দিয়ে পুরুষের পাসপোর্ট

সিপ্লাস প্রতিবেদক: বাংলাদেশে একসময় বিদেশ থেকে একজনের নামে ভিসা বা ওয়ার্ক পারমিট এলে পাসপোর্টে ছবি পালটিয়ে একজনের জায়গায় আরেকজনকে বিদেশে পাঠিয়ে দিত আদম ব্যবসায়ীরা। এটাকে ‘কল্লা কাটা’ বা ‘গলা কাটা পাসপোর্ট’ বলা হতো। এই রকম ‘গলা কাটা পাসপোর্ট’ নিয়ে বহু মানুষ ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যে চলে গেছে। এমনকি বাংলাদেশে আশ্রিত হাজার হাজার রোহিঙ্গা মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের জাল পাসপোর্ট ব্যবহার করে বাঙ্গালী পরিচয় নিয়ে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ছে। সম্প্রতি এই ইস্যুতে বাংলাদেশকে নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন সৌদিআরবসহ বেশ কয়েকটি দেশ।

আগের দিনে সবকিছুই এনালগ ছিল তাই জালিয়াতি করা অনেক সহজ কাজ ছিল। কিন্তু এখন প্রায় সবারই জাতীয় পরিচয় পত্রসহ কোন না কোন রকমের আইডি কার্ড আছে। যার কিছুই নাই তার জন্মনিবন্ধন কার্ড আছে। আর এখন পরিচয়পত্রের সমস্ত তথ্য জাতীয় তথ্য সংরক্ষণাগারে সংরক্ষিত আছে। তাই এই সময় পাসপোর্টের মত অতীব স্পর্শকাতর বিষয়ে জালিয়াতি করা কঠিন কাজ।

কিন্তু এমন একটি অভিনব জালিয়াতির তথ্য পাওয়া গেছে চট্টগ্রাম মনসুরাবাদ পাসপোর্ট অফিসে। যেখানে মহিলার জাতীয় পরিচয়পত্র অর্থ্যাৎ ভোটার আইডি নম্বর দিয়ে পুরুষের পাসপোর্ট সংগ্রহের ঘটনা ঘটেছে।

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার সরফভাটা ইউনিয়নের ফাতেমা বেগম নামের এক মহিলার এনআইডি ব্যবহার করে ২০১৩ সালে একই এলাকার নজরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির পাসপোর্ট তৈরি করা হয়। সর্বশেষ ২৭-৭-২০১৮ সালে ওই পাসপোর্ট আবার নাবায়নও করা হয় একই ব্যক্তির নামে। এমনকি সেই পাসপোর্টেও পরিচয়পত্র নম্বর ফাতেমা বেগমেরটাই ব্যবহার করা হয়।

মূলত এ বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি ফাতেমা বেগম তার জন্য পাসপোর্ট বানাতে গেলে এই বিষয়টি  সামনে আসে।পাসপোর্ট ডেলভারি নিতে গেলে তিনি জানতে পারেন তিনি নতুন পাসপোর্ট পাবেন না। কারণ হিসেবে বলা হয়  তার আইডি কার্ডের নাম্বার দিয়ে অন্য এক পুরুষ পাসপোর্ট বানিয়েছেন অনেকদিন আগে। পাসপোর্ট অফিসে ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায় ফাতেমা বেগমের আইডি নম্বর দিয়ে একই গ্রামের নজরুল ইসলাম তার নামে পাসপোর্ট বানিয়েছেন কয়েকবছর আগে। অবিশ্বাস্য হলেও এমনটিই ঘটেছে। নারীর আইডি ব্যবহার করে পুরুষের পাসপোর্ট বানানো হয়েছে।

সিপ্লাস প্রতিবেদক বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখতে পান ফাতেমা বেগমের আইডি নম্বরের শেষ ডিজিট পাঁচ। আর যার বিরুদ্ধে অভিযোগ সেই নজরুল ইসলামের আইডি কার্ডের শেষ ডিজিট তিন। ফাতেমা বেগমকে সিপ্লাস প্রতিবেদক জিজ্ঞেস করেন তিনি কোন কাজে তার আইডি কার্ড কখনো নজরুল ইসলামকে দিয়েছিল কিনা? উত্তরে ফাতেমা বেগম সরাসরি না বলেন। এমনটা হওয়ার কোন সম্ভাবনা নাই বলেই তিনি আত্মবিশ্বাসের সাথে উত্তর দেন।

ফাতেমা বেগমের আইডি ব্যবহার করে পাসপোর্ট বানানোর অভিযোগ যার বিরুদ্ধে সে নজরুল ইসলামের সাথে সিপ্লাস প্রতিবেদক ফোনে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, আমি পাসপোর্টের দালালের মাধ্যমে পাসপোর্ট বানাই। আমি আমার সব তথ্য দালালকে ঠিকঠাক ভাবেই দিয়েছিলাম। এখন দালাল ভুল করেছে নাকি পাসপোর্ট অফিস ভুল করেছে সেটা তো আমার দেখার বিষয় না।

তিনি নিজ পাসপোর্টের এমন গুরুতর ত্রুটি সংশোধন না করে বসে আছেন কেন জিজ্ঞেস করলে উত্তরে বলেন, আমি নিজে ভুল করি নাই তাই সংশোধনের দায়িত্বও আমার না। যার সমস্যা সেই ঠিক করবে। অন্যের তথ্য ব্যবহার করে নিজের নামে পাসপোর্ট বানানো আইনত অপরাধ সেটা জানেন কিনা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন ওসব তার মাথাব্যথা নয়।

এই ব্যাপারে জানতে সিপ্লাস প্রতিবেদক নগরীর মনসুরাবাদে অবস্থিত চট্টগ্রাম বিভাগীয় পাসপোর্ট অফিসের পরিচালক আবু সাইদের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, মূলত উভয়ের এন আইডি নাম্বার প্রায় কাছাকাছি। যেখানে পার্থক্য আছে কেবল শেষের একটি ডিজিট। আর এই কারনেই লেখা বা টাইপ করতে গিয়ে কেউ না কেউ ভুলটি করে বসে আবেদন করার সময়।

পাসপোর্ট আবেদনের পর পুলিশ ভ্যারিফিকেশনসহ নানা প্রকারের তথ্য যাচাইয়ের বিষয়ের দিকে আবু সাইদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন কোন না কোনভাবে ভুলটা হয়েছে। এই ভুলের সংশোধনও আছে। ভুক্তভোগী যদি পাসপোর্ট অফিসে গিয়ে যোগাযোগ করেন তবে এই সমস্যার সমাধান করে দেবেন বলে তিনি সিপ্লাসকে আশ্বস্থ করেন।

তিনি আরও বলেন, ঐ সময়ে পাসপোর্ট অফিসের সব কাজ ম্যানুয়ালিই করা হতো। তাই এরকম ভুল হতে পেরেছে।

এদিকে কোনো ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়ে বা সঠিক তথ্য লুকিয়ে অন্য নামে পাসপোর্ট নিলে তা দণ্ডনীয় অপরাধ বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক অভিবাসন বিশেষজ্ঞ ব্যারিস্টার জিল্লুর রহমান। তিনি সিপ্লাসকে বলেন , একজনের তথ্য ব্যবহার করে আরেকজনের পাসপোর্ট বানানো বড় রকমের অপরাধ। এসব বিষয় বাইরের বিশ্বে প্রকাশিত হলে আমাদের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ণ হবে। যথাযথ কর্তৃপক্ষের এসব স্পর্শকাতর বিষয়ে আরো কঠোর নজরদারি করা উচিৎ বলে সিপ্লাসের কাছে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, যখন কোন সিস্টেম ডেভেলপ করতে হয় তখন ফিজিয়াবিলিটি স্টাডিটা খুব বেশি গুরুত্বপূর্ন। ফলে যেটা হয়, যে কোন সিস্টেম ডেভেলপের শুরুতেই সমস্যা গুলো ধরা পরে এবং তা সমাধান করা সহজ হয়। কিন্তু আমাদের দেশের একটা সীমাবদ্ধতা হচ্ছে কোন ধরণের ফিজিয়াবিলিটি স্টাডি ছাড়াই সফটওয়্যারগুলো ডেভেলপ হয়ে যায়। বিশেষ করে উন্নত দেশ গুলোতে দেখা যায়, এনআইডি বা অন্য কোন আইডি নং দিলে তা দিয়ে করা ড্রাইভিং লাইসেন্স, পাসপোর্ট কিংবা অন্যান্য যে কোন পরিচয় পত্র আছে কিনা তা চলে আসে যেটা করা হয় একটা সেন্ট্রাল ডিস্ট্রিবিউটেড ডাটাবেজের মাধ্যমে। কিন্তু আমাদের দেশে ডাটা সেন্টার থাকলেও তা এখনো কার্যকরে কোন উদ্যোগ নেয়া হয় নি।

গত জুলাইতে যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংস্থা দ্য হেনলি অ্যান্ড পার্টনারসের প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক শক্তিশালী পাসপোর্ট সূচকে বাংলাদেশ ৮ ধাপ পিছিয়েছে।বাংলাদেশের পাসপোর্ট বিশ্বে এখন ১০৬ নম্বর অবস্থানে নেমে এসেছে। তাই বাংলাদেশের পাসপোর্টের সুনাম রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আরো বেশি অটোমেশনের আওতায় আনা এবং সংস্থাগুলোতে উপযুক্ত নজরদারি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments