নিউজটি শেয়ার করুন

নতুন দুশ্চিন্তার কারণ ভয়ংকর মাদক ‘আইস’

মিয়ানমার থেকে কক্সবাজার হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে

সিপ্লাস প্রতিবেদক: নতুন মাদক মিথাইল অ্যামফিটামিনযুক্ত ক্রিস্টাল। দেখতে কাচ কিংবা বরফের টুকরার মতো। তাই একে ডাকা হয় আইস বলে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ‘সেবু’ ও ‘ডি ম্যাথ’ নামেও পরিচিত এটি। দুই বছর আগে বাংলাদেশে প্রথম ধরা পড়া মাদকটি এখন নতুন দুশ্চিন্তার কারণ।

সংশ্লিষ্টদের অভিমত, ইয়াবার চেয়ে শতগুণ ক্ষতিকারক মাদকটির কারবার শুরু হয়েছে ইয়াবার মতোই। থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া থেকে এই মাদকের কিছু চালান ভিন্ন পথে এলেও মূলত মিয়ানমার থেকে আসছে ইয়াবার রুটেই। এরই মধ্যে টেকনাফে দুই কেজি ওজনের দুটি বড় চালানসহ চট্টগ্রাম ও ঢাকায় অন্তত ১৫টি আইসের চালান ধরা পড়েছে। কারবারিদের কাছ থেকে উদ্ধার হচ্ছে ইয়াবার সঙ্গে আইসও ।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কপালে তাই দুশ্চিন্তার ভাঁজ পড়েছে ।

এতদিন পর্যন্ত ঢাকাকেন্দ্রিক বিচরণ বলে ধারণা করা হলেও গত ২৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম নগরীতে ঘটে ভয়ংকর মাদক আইস পাওয়ার ঘটনা।যে কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ভাবছে এর আমদানির উৎস নিয়ে। অধিক দামের এই মাদক সেবনের ফলে ধ্বংস হচ্ছে অভিজাত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তানেরা।

র‌্যাবের এক অভিযানে চট্টগ্রামে প্রথমবারের মতো ক্রিস্টাল মেথ পাওয়া যায়। র‌্যাব কর্মকর্তাদের ধারণা, আফ্রিকা অথবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো দেশ থেকে ‘আইস’ হিসেবে পরিচিত ভয়ংকর এই মাদক বাংলাদেশে ঢুকেছে। ২৪ ফেব্রুয়ারি রাতে চট্টগ্রাম নগরীর খুলশী থানার মোজাফফর নগর বাই লেইন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ১৪০ গ্রাম আইসসহ গ্রেপ্তার করা হয় দুজনকে।

র‌্যাব চট্টগ্রাম জোনের উপপরিচালক মেজর মুশফিকুর রহমান গণমাধ্যমে জানান, গ্রেপ্তারকৃত দুজন ক্রিস্টাল মেথগুলো ক্রেতার কাছে হস্তান্তরের জন্য অপেক্ষা করছিল। গ্রেপ্তার হওয়া শফিউল আলম করোনার লকডাউন শুরুর আগে দীর্ঘদিন পর আফ্রিকার মোজাম্বিক থেকে দেশে ফেরেন। সাধারণত আফ্রিকা কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ মিয়ানমার, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডে এসব মাদক পাওয়া যায়। যেহেতু শফিউল আফ্রিকার দেশে ছিলেন, সেই সূত্র ধরেই তদন্ত করা হচ্ছে।

এরপর ১৩ জুলাই চট্টগ্রাম নগরীর ফিশারিঘাটে কোটি টাকা মূল্যের ৯৭৫ গ্রাম আইসের চালান ধরা পড়ে।

১৫ জুলাই নগরীর কোতোয়ালী থানাধীন ব্রিজঘাটে নেভাল আবাসিক হোটেলের সামনে থেকে তিনজন মাদক কারবারীকে আটক করা হয়। এই তিনজনের মধ্যে একজনের কাছে পাওয়া যায় ৮০ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ তথা আইস। গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের দাবি, নতুন এই ভয়ংকর মাদক আইস মিয়ানমার থেকে কক্সবাজার হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য মতে, ২০১৯ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো ঢাকার মোহাম্মদপুর থেকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ৮ গ্রাম আইসসহ তিনজনকে আটক করে । এরপর ওই বছরের ২৭ জুন ঢাকার বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা থেকে আইসসহ আটক করা হয় নাইজেরীয় একজন নাগরিককে। তার কাছে পাওয়া যায় ৫২২ গ্রাম এ ধরনের মাদক। মাদকদ্রব্য অধিদফতরের কর্মকর্তাদের ভাষ্য- সেই মাদক আফ্রিকা থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়েছিল।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, নব্বই দশকের শেষ দিকে দেশে মাদক হিসেবে ইয়াবা সেবন চললেও তা ধরা পড়ে ২০০২ সালের দিকে। যদিও শুরুর দিকে এ নিয়ে প্রশাসনের মাথাব্যথা ছিল না। সেই ইয়াবা এখন মাথাব্যথার বিশাল কারণ।

২০১৯ সালের শুরুর দিকে দেশে আইস মিললেও তা এখনো বন্ধ করা যায়নি। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের গোয়েন্দা টিম জানতে পেরেছে, নতুন মাদক আইস বাংলাদেশের বাজার ধরার জন্য বিভিন্ন আফ্রিকান মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর সূত্রে জানা যায়, ইয়াবা তৈরির মূল উপাদান অ্যামফেটামিন। ইয়াবায় থাকে ২০-২৫ শতাংশ অ্যামফেটামিন। আইসে অ্যামফেটামিন ব্যবহার হয় শতভাগ। যে কারণে ইয়াবায় যে ক্ষতি তার চেয়ে বেশি ক্ষতি আইস সেবনে। কাচের টোব্যাকো পাইপের তলায় আগুনের তাপ দিয়ে ধোঁয়া আকারে এটি গ্রহণ করে মাদক সেবনকারীরা। ধোঁয়ার মাধ্যমের চেয়ে ইনজেকশনের মাধ্যমে এ মাদক নিলে মাত্র ১৫ থেকে ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে এর কার্যক্রম শুরু হয়। এমন পরিস্থিতিতে যে কোনো কর্মকাণ্ড ঘটাতে দ্বিধা করে না এই মাদক গ্রহণকারীরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইস লবণের মতো দানাদারজাতীয় মাদক। দেখতে কখনও চিনির মতো, কখনো মিছরির মতো। আইস উচ্চ মাত্রার মাদক, যা সেবনের পর মানবদেহে উত্তেজনার সৃষ্টি করে। আইসের দাম ইয়াবার চেয়ে অনেক বেশি। ক্ষতি বা প্রভাবও বেশি। এটি সেবনে মস্তিষ্ক বিকৃতিতে মৃত্যুও হতে পারে। তাছাড়া অনিদ্রা, অতিরিক্ত উত্তেজনা, স্মৃতিভ্রম, হৃদরোগকে বেগবান করে।

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments