নিউজটি শেয়ার করুন

ঘটনার পরে নয়,ঘটনাস্থলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করতে হবে: হাইকোর্ট

ছবি: সংগৃহীত

সিপ্লাস ডেস্ক: এক রিটের পর্যবেক্ষণে হাইকোর্ট বলেছেন, ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনায় আইন প্রয়োগের বিষয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের আরও সতর্ক থাকা দরকার। আইনের প্রয়োগের বিষয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের আরও সাবধান হওয়া উচিত। সবার আরও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন। কার্যালয়ে বা ঘটনার পরে নয়, ঘটনাস্থলে আদালত পরিচালনার মাধ্যমে যেন সাজা দেওয়া হয়—এসব বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে নেত্রকোনায় ভ্রাম্যমাণ আদালতে দুই শিশুর সাজার প্রেক্ষাপটে করা রিট শুনানি শেষে আজ বৃহস্পতিবার বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মো. মোস্তাফিজুর রহমান সমন্বয়ে গঠিত ভার্চ্যুয়াল হাইকোর্ট বেঞ্চ এই পর্যবেক্ষণ দেন। পর্যবেক্ষণসহ রিটটি নিষ্পত্তি করে দিয়েছেন আদালত।

‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনে দুই শিশুকে দণ্ড’ শিরোনামে গত ৪ আগস্ট প্রথম আলোয় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। প্রতিবেদনটি যুক্ত করে দুই শিশুকে তাৎক্ষণিক মুক্তি দিতে স্বতঃপ্রণোদিত আদেশ চেয়ে হাইকোর্টের একই বেঞ্চে ই-মেইলের মাধ্যমে লিখিত আবেদন করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির। এর পরিপ্রেক্ষিতে সেদিন হাইকোর্ট ওই দুই শিশুকে মুক্তির নির্দেশ দেন। আদেশের বিষয়টি নেত্রকোনার জেলা প্রশাসককে (ডিসি) অবহিত করতে সুপ্রিম কোর্টের মুখপাত্র মোহাম্মদ সাইফুর রহমানকে বলা হয়।

অন্যদিকে ৪ আগস্ট সাজার বিরুদ্ধে শিশুদের আপিল শুনানি নিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের আদেশ বাতিল করে দুই শিশুকে খালাস দেন নেত্রকোনার অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। এ ছাড়া ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুলতানা রাজিয়ার ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। সেদিন বিকেলে দুই শিশুকে তাদের মা-বাবার কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

পরদিন ৫ আগস্ট শিশির মনিরের করা আবেদনটি রিট হিসেবে আদালতের কার্যতালিকায় ওঠে। সেদিন আদালত কয়েকটি ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমে অসংগতি দেখিয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারীদের প্রশিক্ষণের ওপর গুরুত্ব দেন। একই সঙ্গে ওই ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারী সংশ্লিষ্ট নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট সুলতানা রাজিয়ার (সহকারী কমিশনার, ভূমি) জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে দেওয়া ব্যাখ্যা ২৬ আগস্টের মধ্যে আদালতে দাখিল করতে নির্দেশ দেওয়া হয়।

এরপর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুলতানা রাজিয়া জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা জমা দেন, যেখানে তিনি নিঃশর্ত ক্ষমা চান। এই ব্যাখ্যা গত মাসে হাইকোর্টে এসে পৌঁছায়। এর ধারাবাহিকতায় বৃহস্পতিবার (২ সেপ্টেম্বর) শুনানি নিয়ে রিট নিষ্পত্তি করে আদেশ দেওয়া হয়। আদালতে রিটের পক্ষে আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির ও রাষ্ট্রপক্ষে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার শুনানি করেন।

জবাব বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট

শুনানি নিয়ে আদালত বলেন, ‘নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের জবাবের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত দিচ্ছি না। যেহেতু জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে বিষয়টি বিচারাধীন আছে। তিনি এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন।’

এর আগে সহকারী কমিশনার (ভূমি) সুলতানা রাজিয়ার লিখিত ব্যাখ্যার অংশবিশেষ তুলে ধরে আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ‘বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন, ২০১৭-এর ১৭ ধারায় আছে, আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইনে যাহা কিছুই থাকুক না কেন, এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে মোবাইল কোর্ট দণ্ড আরোপ করিতে পারিবেন। এমতাবস্থায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের দণ্ড প্রদানের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য আমি খুব অনুতপ্ত। সরল বিশ্বাসে কৃতকর্মের জন্য নিঃশর্ত ক্ষমাপ্রার্থী। ভবিষ্যতে এহেন ঘটনার যেন পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সে বিষয়ে আমি (সুলতানা রাজিয়া) সর্বদা সচেষ্ট থাকব মর্মে অঙ্গীকার ব্যক্ত করছি।’

আইনজীবী শিশির মনির বলেন, ২০১৭ সালের বাল্যবিবাহ নিরোধ আইনের ৭ (২) ধারায় সাজা দেওয়া হয়েছে। অথচ ৭ (৩) ধারায় আছে, শিশুদের ক্ষেত্রে শিশু আইনের বিধান প্রযোজ্য হবে।

আদালত বলেন, সরল বিশ্বাসে ভুল বলছেন উনি (সুলতানা রাজিয়া)।

আদালত বলেন, এ বিষয়ে হাইকোর্টের রায় আছে।

শিশির মনির বলেন, মাদকের মামলায় বলা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালত আইনের তফসিল সংশোধন হয়েছে। সেদিন আদালত আইনের বিধান প্রয়োগে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনাকারীদের যথাযথ প্রশিক্ষণের কথা বলেছিলেন।

আদালত বলেন, প্রশিক্ষণ তো সবারই দরকার। পত্রিকায় সম্ভবত দেখেছি সাজা দেওয়ার পর শিশুদের থানায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।

শিশির মনির বলেন, এরপর দুইজনকে তার কার্যালয়ে এনে রাত আটটার দিকে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসান। এক মাসের জন্য আটকাদেশ দেওয়া হয়। ওনার (সুলতানা রাজিয়া) কার্যালয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়েছিলেন। কার্যালয়ে নিয়ে এসে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা হয়েছে বলে ১০-১২টি ঘটনা এসেছে পত্রিকায়। সিরাজগঞ্জে এক ঘটনা কার্যালয়ে নিয়ে এসেছে। ভ্রান্ত ধারণা, নাকি না বোঝার কারণে হচ্ছে?

এ সময় ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল বিপুল বাগমার বলেন, ‘জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মাধ্যমে জেনেছি, দুই শিশুর ক্ষেত্রে কার্যালয়ে করেননি, ঘটনাস্থলে করেছেন।’

আদালত বলেন, তাহলে সবাই ভুল লিখল পত্রিকায়! উনি তো প্রতিবাদ বা সংশোধনীও দেননি।

বিপুল বাগমার বলেন, ঘটনার পরপরই জেলা ম্যাজিস্ট্রেট কারণ দর্শাতে বলেছেন। উনি (সুলতানা রাজিয়া) জবাব দিয়েছেন।

আদালত বলেন, ‘আমরা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের জবাব দেখতে চেয়েছিলাম। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন। উনি ব্যাখ্যা দিয়েছেন, যা দেখলাম। উনি নিজে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছেন। আইনি দিক নিয়ে ভুল হতে পারে। কিন্তু এগুলো সম্পর্কে আরও সতর্ক থাকা দরকার।’

 

0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Inline Feedbacks
View all comments