নিউজটি শেয়ার করুন

ঈদগাঁও’তে সেচের অভাবে ৮৭ একর জমির চাষ অনিশ্চিত

কক্সবাজার প্রতিনিধি: সেচ সুবিধার অভাবে চলতি বোরো মৌসুমে কক্সবাজার সদরের ঈদগাঁও ইউনিয়নের ৮৭ একর দো-ফসলা জমির বোরোচাষ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। কয়েক বছর আগেও সোনালী ধানের হাসি আর নবান্নের খুশীতে ভরে উঠত কৃষকের বুক। সেচবঞ্চিত আনুমানিক ৩ শতাধিক কৃষক চলতি বোরো মৌসুমে বেকার হয়ে পড়েছে।

জানা গেছে,ঈদগাঁও ইউনিয়নের ঝাইক্কাকাটা বিল(মাইজপাড়ার পূর্বপার্শ্বে), চিঅরি বিল(ঈদগাঁও বাজারে দক্ষিণপার্শ্বে), মাদরাসা (আলমাছিয়া মাদরাসার পূর্বপাশে) বিলের ৮৭ একর দো-ফসলা আবাদি জমি গত ৫ বছর ধরে সেচ সুবিধার অভাবে অনাবাদি থেকে যাচ্ছে।

দীর্ঘদিন ধরে ঈদগাঁও রাবারড্যাম সেচ প্রকল্পের আওতায় বোরো মৌসুমে চাষাবাদ হলেও বঙিমবাজার অংশে সেচের নালাটি ভরাট করে ফেলে স্থানীয় প্রভাবশালীমহল। পরে ওই ভরাট জমিতে করাতকল (স’মিল) নির্মাণ করা হয়। যেকারণে রাবারড্যাম সেচ প্রকল্পের পানি প্রবাহের একমাত্র (নালা)পথটি স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যায়।

সেই থেকে স্থানীয় কৃষক ও সেচপ্রকল্পের ব্যবস্থাপকরা নানা তদবীর, দৌঁড়ঝাঁপ করেও প্রত্যাশিত কোন ফল পায়নি।

ঈদগাঁও রাবারড্যাম সেচ ব্যবস্থাপনা কমিটি সূত্রে জানা গেছে, চিঅরি বিলের ১৫ একর জমির সেচব্যবস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন শাহাবুদ্দিন, মাদরাসা বিলের ২২ একর জমির সেচব্যবস্থাপনার ছিলেন মোহাম্মদ রাশেল এবং ঝাঁইক্কাকাটা বিলের ৫০ একর জমি আব্দুল গণীর তত্ত্বাবধানে সেচকার্য পরিচালিত হত। তারা কখনো ব্যক্তি উদ্যোগে আবার কখনও সমন্বিত উদ্যোগে বোরোচাষ অব্যাহত রাখার চেষ্টা করেছে কিন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষে উদাসীনতা ও অবহেলার কারণেই আবাদী জমির বৃহৎ একটি অংশ অনাবাদি থেকে যাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

চিঅরি বিলের সেচপ্রকল্প ব্যবস্থাপক শাহাব উদ্দীন জানান,গত ৭০ বছর ধরে এই জমিগুলি অনাবাদি থাকেনি। সেচের নালা বন্ধ করে পরিকল্পিতভাবে একটি মহল এই জমিগুলিকে পতিত জমিতে রূপান্তরের চেষ্টা চালাচ্ছে। বছরের পর বছর অনাবাদি থাকলে জমি মালিকেরা জমিগুলি কমমূল্যে বিক্রি করে দেবে এটাই তাদের উদ্দেশ্য। শাহাব উদ্দিন আরো বলেন, ২০১৮ সালে আমি অগভীর নলকূপের মাধ্যমে সেচসেবা দেয়ার উদ্যোগ নিলেও বিদ্যুৎসংযোগ না পাওয়ায় সেই উদ্যোগ সফল হয়নি। পল্লীবিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষের কাছে বারবার ধর্ণা দিয়েও কাজ হয়নি।

ঈদগাঁও রাবারড্যাম সেচ ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি শাহনেওয়াজ মিণ্টু বলেন, আমরা সেচের পানি বন্ধ করিনি। তারা সেচের পানি নিতে না পারলে আমাদের করার কি আছে?

জানা গেছে, ২০১৪ সালে ইসলামাবাদ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও রাবারড্যাম সেচব্যবস্থাপনা কমিটির তৎকালীন সভাপতি জাফর আলমের উদ্যোগে ৫০-৬০ হাজার টাকা ব্যয়ে ভরাট করে ফেলা সেচের নালাটির স্থানে কংক্রিটের পুল প্রতিস্থাপন করে সেচের পানিপ্রবাহ স্বাভাবিক করা হলেও এক বছরের মাথায় সেই সেটিও বন্ধ হয়ে যায়।

সরেজমিন পরিদর্শন করে দেখা গেছে, ঈদগাঁহ বাজারের দক্ষিণে ডিসি রোড়ের পূর্বপার্শ্বস্থ মা-মনি হাসপাতাল ও পশ্চিমপার্শ্বস্থ সিরাজুল হকের করাতকলের (স’মিল) মধ্যবর্তী ৫০ ফুট জায়গার নালাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আজকের এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।

শুধু বোরোচাষ ব্যাহত হচ্ছে তা নয় ওই নালাটি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বর্ষাকালে ঈদগাঁওবাজার,জাগিরপাড়া,বঙিমবাজার,সওদাগরপাড়া’সহ আশপাশের বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন হতে না পারায় সৃষ্টি হয় দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা। অনাবাদী হয়ে পড়া ফসলী জমিগুলিকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই অপরিকল্পিতভাবে নির্মিত হয়েছে শতাধিক বহুতল আবাসিক ও বাণিজ্যক ভবণ। বিশেষ করে ঈদগাঁহ বাজার ও বঙিমবাজারের মধ্যভাগের চিঅরি বিলের চারপাশের জমিগুলো অপরিকল্পিত নগরায়ণের কবলে পড়েছে এবং মাদরাসা বিলেও এই হাওয়া লাগতে শুরু করেছে। ওই সকল বিলের আবাদী জমিগুলি অনেকটা ছিটমহলে পরিণত হয়েছে। চলাচলের পথ নেই,সেচের ব্যবস্থা নেই, পানি নিষ্কাশনের পথ নেই, নেই নির্মিত ভবণগুলির নিজস্ব কোন সুয়ারেজ বা পয়ঃনিস্কাশন প্রণালীও ।

এই পরিস্থিতিতে অনাবাদি জমিগুলির কৃষক ও জমি মালিকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে একটি সংঘবদ্ধচক্র পরিবেশের তোয়াক্কা না করে ইটভাটার জন্য কেটে নিচ্ছে জমির টপসয়েল। ফলে অনাবাদি জমিগুলির সংকট দিন দিন আরো জটিল আকার ধারণ করছে। ওই সকল জমির উপর নির্ভরশীল উৎপাদনমূখী কৃষকপরিবারগুলি বর্তমানে খাদ্যসংকটের আশংকা আর আতংক নিয়ে দিন কাটাচ্ছে।

কৃষক আব্দু শুক্কুর বলেন, চিঅরি বিলে প্রতিবছরে বোরো ও আমন মৌসুমে ধানচাষ করে পরিবারের খোরাক যোগাতাম। কিন্তু চলতি বোরোমৌসুম’সহ চাষাবাদ হচ্ছেনা, পরিবারের মুখে দুবেলা দুমূুঠো ভাত তুলে দিতে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে ।

ঈদগাঁহ ইউপি চেয়ারম্যান আলহাজ্ব ছৈয়দ আলম বলেন, পানি সেচের অভাবে চাষাবাদ ব্যাহত হওয়া অনভিপ্রেত। তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলে যথাযথ পদক্ষেপগ্রহণ করবেন বলে আশ্বস্ত করেন।

ঈদগাঁহ ইউনিয়নের উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাখাওয়াৎ হোসেন বলেন, সেচের অভাবে বোরোচাষ ব্যাহত হচ্ছে এই বিষয়টি তিনি জানতেন না। তাকে কেউ অভিযোগ দেয়নি। তিনি সরেজমিন পরিদর্শন করে কি কারণে সেচ হচ্ছে না তা খতিয়ে দেখে উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সাথে বলে শীঘ্রই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাগ্রহণ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

কৃষিক্ষেত্রে সরকারের উৎপাদননীতি ও কৃষিবান্ধব অগ্রাধিকার কৌশল, কৃষিভূর্তুকি,কৃষিপ্রণোদনা অগ্রগণ্য হলেও স্থানীয় প্রশাসন,স্থানীয় সরকার,কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, কৃষি উন্নয়ন বিভাগ কারো মাথাব্যথা নেই। সময়মত কার্যকর ব্যবস্থাগ্রহণ করা না হলে বোরোচাষ বঞ্চিত কৃষকপরিারগুলির দূর্ভোগ ক্রমশ: দীর্ঘস্থায়ী হতে পাওে বলে আশঙ্কা করছে সচেতনমহল।