নিউজটি শেয়ার করুন

অভিজিৎ হত্যার বিচারকে হেফাজতে ইসলাম বলছে তামাশা

সিপ্লাস ডেস্ক: ৬ বছর আগে মুক্তমনা বিজ্ঞান লেখক অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যা মামলায় দণ্ডিতদের সাজা স্থগিত করে তাদের জামিনে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানিয়েছে হেফাজতে ইসলাম। একইসঙ্গে অভিজিৎ হত্যা মামলার রায়কে বিচারের নামে তামাশা হিসেবেও অভিহিত করেছে দেশের কওমি মাদরাসাভিত্তিক এ সংগঠনটি।

শুক্রবার (১৯ ফেব্রুয়ারি) রাতে হেফাজতে ইসলামের ফেসবুক পেজে সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদীর এই ‘বিশ্লেষণমূলক বিবৃতি’ প্রচার হয়েছে। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক নোমান ফয়জী বিবৃতিটি হেফাজতে ইসলাম থেকে দেওয়া হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছেন।

একদশক আগে গঠিত হলেও যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের আন্দোলন শুরুর পর তার বিরোধিতায় নেমে আলোচনায় উঠে আসে হেফাজতে ইসলাম।

রায় ঘোষণার তিনদিনের মাথায় হেফাজতে ইসলামের সাংগঠনিক সম্পাদক আজিজুল হক ইসলামাবাদী বিবৃতিতে অভিজিৎ রায়কে ‘আল্লাহ, রাসূল নিয়ে অব্যাহত কটূক্তিমূলক ও পর্ণোগ্রাফি লেখালেখির আখড়া মুক্তমনা ব্লগের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক পরিচালক’ হিসেবে উদ্ধৃত করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা পূর্বে দেখেছি শাহবাগে উগ্র ইসলামবিদ্বেষী ফ্যাসিস্টদের একতরফা ‘ফাঁসি চাই ফাঁসি চাই’ দাবি কতটা ন্যক্কারজনকভাবে বিচারপ্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করেছিল।’

‘প্রথম আলোর গত বছরের এক রিপোর্টে আমরা জেনেছি, মামলার সর্বমোট সাক্ষী ৩৪ জন। অথচ রায়ের আগে-পরে কোনো গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীর বক্তব্য মিডিয়ায় প্রকাশ হতে দেখা যায়নি। এমনকি কোনো কোনো সাক্ষীর বক্তব্যের ওপর ভিত্তি করে রায় দেওয়া হয়েছে তাও দেশবাসী জানতে পারেনি। এই মামলার প্রধান চাক্ষুষ সাক্ষী অভিজিতের স্ত্রী রাফিদা আহমদ বন্যা, যিনি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী। রায়ের পরপর সোশ্যাল মিডিয়ায় লেখা এক বিবৃতিতে তিনি বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে নানা অসঙ্গতি ও অভিযোগ তুলে ধরেছেন। অভিজিত হত্যার রায় যে বিচারের নামে তামাশা, সেটা তার বক্তব্যেই বোঝা যায়।’

ইসলামাবাদী বিবৃতিতে আরো বলেন, ‘সন্দেহ নেই, প্রধান চাক্ষুষ সাক্ষীকে বাদ দিয়েই অভিজিৎ হত্যার বিচার ও রায় হয়েছে। প্রধান সাক্ষীর জীবদ্দশায় তাকে ছাড়া আদালতে কিভাবে অভিজিত হত্যার সাথে প্রত্যেক অভিযুক্তের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলো-সেটা একটি জরুরি প্রশ্ন। তাছাড়া সাক্ষীদের বক্তব্যসমূহের কোনো বর্ণনা কিংবা অভিযুক্তরা আদৌ অভিজিত হত্যায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে কিনা-সেসব বিষয় এখন পর্যন্ত রহস্যজনকভাবে মিডিয়ায় তুলে ধরা হচ্ছে না। আর এতেই অনুমান করতে কষ্ট হয় না যে, কতটা দুর্বল ও ঠুনকো তথ্যপ্রমাণের ওপর ভিত্তি করে বিচার করা হয়েছে।’

‘তা নাহলে রায় দেওয়ার ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের ইস্যু মুখ্য না হয়ে ‘মতপ্রকাশে সাহস দিতে’ এবং ‘নিহত ব্যক্তির আত্মীয়রা শান্তি পাবেন’-এই ধরনের আবেগসর্বস্ব আলাপ কেন আসবে? এছাড়া অভিজিতের স্ত্রী প্রশ্ন তুলেছেন- তাদেরকে হামলাকারী গ্রুপটির নেতৃত্বে থাকা শরীফুল নামের একজন আসামী পুলিশ কাস্টোডিতে থাকা সত্ত্বেও পরে তাকে ক্রসফায়ারে কেন মেরে ফেলা হয়েছিল? রায় পরবর্তী অভিজিতের স্ত্রীর দেওয়া এই বিবৃতি বিচারপ্রক্রিয়াকে জোরালোভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। সব মিলিয়ে অভিজিৎ হত্যার রায়কে আমরা বিচারের নামে তামাশা ছাড়া আর কীইবা বলতে পারি?’

অভিজিৎ হত্যা মামলায় দণ্ডিতদের বিরুদ্ধে ঘটনার সাথে সরাসরি সংশ্লিষ্টতা প্রমাণ হয়নি দাবি করে তাদের ‘মজলুম আশেকে রাসূল’ উল্লেখ করে ইসলামাবাদীর আরও দাবি- তাদের কারাদণ্ড রহিত করে যেন জামিনে মুক্তি দেওয়া হয়।

বিবৃতিতে আজিজুল হক ইসলামাবাদী আরো বলেন, ‘আইন হাতে তুলে নেওয়া এবং কোনো ধরনের বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আমরা সমর্থন করি না। কিন্তু হেফাজতে ইসলামের আন্দোলনের পরও সরকার উপযুক্ত তথ্যপ্রমাণ থাকা সত্ত্বেও যথাসময়ে রাসূলের অবমাননাকারীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। অভিজিৎ পরিচালিত ইসলামবিরোধী মুক্তমনা ব্লগের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে সব জেনেও সরকার তখন ব্যবস্থা নেয়নি। এর ফলে রাসূল প্রেমিকদের হৃদয় রক্তাক্ত হওয়ায় তারা সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিল। সরকার যথাসময়ে রাসূলের অবমাননাকারীদের ব্যাপারে আইনগত পদক্ষেপ নিলে আর একের পর এক আইন হাতে তুলে নেওয়ার মতো ঘটনা ঘটত না।’

তিনি বলেন, ‘সরকারের সেই ব্যর্থতা এড়িয়ে গিয়ে মতপ্রকাশের প্রসঙ্গ আসতে পারে না। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একবার সংসদে দাঁড়িয়ে রাসূলকে গালি দেওয়াকে নোংরামি বলে মন্তব্য করেছিলেন এবং তথাকথিত মুক্তচিন্তার সমালোচনা করেছিলেন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতার মানে এই নয় যে, কেউ কারো মা-বাপ ধরে গালাগালি করার অধিকার রাখে কিংবা রাসূলের অবমাননা করে মুসলমানের অন্তরে আঘাত দেবে। এই বিষয়গুলো আমলে না এনে নির্বিচারে মতপ্রকাশে সাহস দেওয়া মানে আরো ইসলামবিদ্বেষী লেখালেখি করতে উৎসাহ প্রদান করা।’

পদার্থবিদ অধ্যাপক অজয় রায়ের ছেলে অভিজিৎ থাকতেন যুক্তরাষ্ট্রে। বিজ্ঞানের নানা বিষয় নিয়ে লেখালেখির পাশাপাশি মুক্তমনা ব্লগ সাইট পরিচালনা করতেন তিনি। জঙ্গিদের হুমকির মুখেও তিনি ২০১৫ সালে একুশে বইমেলায় অংশ নিতে দেশে এসেছিলেন। ওই বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি রাতে স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাকে নিয়ে বইমেলা থেকে ফেরার পথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির সামনে জঙ্গি কায়দায় হামলায় ঘটনাস্থলেই নিহত হন অভিজিৎ রায়। চাপাতির আঘাতে আঙুল হারান তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যা। ওই ঘটনা পুরো বাংলাদেশকে নাড়িয়ে দেয়, আন্তর্জাতিক পর্যায়েও আলোড়ন সৃষ্টি করে। এরপর একের পর এক হামলা ও হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে থাকেন মুক্তমনা লেখক, ব্লগার, প্রকাশক ও অধিকারকর্মীরা।

গত ১৬ ফেব্রুয়ারি অভিজিৎ রায়কে কুপিয়ে হত্যার মামলায় সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর জিয়াউল হক ওরফে জিয়াসহ পাঁচ জঙ্গিকে মৃত্যুদণ্ড এবং উগ্রপন্থি ব্লগার শফিউর রহমান ফারাবীকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন ঢাকার একটি আদালত। রায়ে বলা হয়, ‘আসামিরা সাংগঠনিকভাবে অভিন্ন অভিপ্রায়ে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশে বাধা দেওয়ার উদ্দেশ্যে অভিজিৎ রায়কে হত্যা করে।’

২০১৯ সালে পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের (সিটিটিসি) জমা দেওয়া চাঞ্চল্যকর অভিজিৎ হত্যা মামলার অভিযোগপত্রে বলা হয়, নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠন আনসার আল ইসলামের (আগের নাম আনসারুল্লাহ বাংলা টিম) নেতা সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত মেজর জিয়াউল হক ওরফে জিয়ার ‘নির্দেশেই’ সেদিন অভিজিতের ওপর হামলা হয়। জিয়াসহ দুইজনকে পলাতক দেখিয়ে মোট ছয় আসামির বিরুদ্ধে এ মামলার বিচারকাজ চলে। মঙ্গলবার তাদের সবাইকে দোষী সাব্যস্ত করে রায় দেন সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ ট্রাইব্যুনালের বিচারক মজিবুর রহমান।

৫০ পৃষ্ঠার এই রায়ে বলা হয়, “সাক্ষ্য বিশ্লেষণে দেখা যায় যে অভিজিৎ রায় একজন বিজ্ঞান লেখক ও ব্লগার ছিলেন। বাংলা একাডেমির বই মেলায় বিজ্ঞান মনস্ক লেখকদের আড্ডায় অংশগ্রহণ করে ফেরার পথে আক্রমণের শিকার হন। নাস্তিকতার অভিযোগ এনে নিষিদ্ধ সংগঠন আনসার আল ইসলামের সদস্যরা, অর্থাৎ এ মামলার অভিযুক্তরাসহ মূল হামলাকারীরা সাংগঠনিকভাবে অভিজিৎ রায়কে নৃশংসভাবে হত্যা করে । স্বাধীনভাবে লেখালেখি ও মত প্রকাশের জন্য অভিজিৎ রায়কে নিজের জীবন দিয়ে মূল্য দিতে হয়।

বিচারক তার পর্যবেক্ষণে বলেন, অভিজিৎ রায়কে হত্যার উদ্দেশ্য হল জন নিরাপত্তা বিঘ্নিত করে মত প্রকাশের স্বাধীনতাকে বন্ধ ও নিরুৎসাহিত করা, যাতে ভবিষ্যতে কেউ স্বাধীনভাবে লেখালেখি ও মত প্রকাশ না করতে পারে।

আসামিদের সাজার সিদ্ধান্ত জানিয়ে বিচারক তার রায়ে বলেন, বাংলাদেশে জননিরাপত্তা বিপন্ন করার জন্য আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণকে মত প্রকাশ ও স্বাধীন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত রাখার উদ্দেশ্যে অভিযুক্ত আসামিদের কারো ভূমিকা ছোট বড় করে দেখার সুযোগ নেই। যেহেতু অভিযুক্ত পাঁচজন আসামি সৈয়দ মোহাম্মদ জিয়াউল হক ওরফে মেজর জিয়া, আকরাম হোসেন, মো. আবু সিদ্দিক সোহেল, মোজাম্মেল হুসাইন ওরফে সায়মন ও মো. আরাফাত রহমান ওরফে সিয়াম আনসার আল ইসলামের সদস্য হিসাবে সাংগঠনিকভাবে অভিজিত রায় হত্যায় গুরুত্বপূর্ণ প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছেন, সেজন্য ওই ৫ জন আসামির একই সাজা প্রদান করা হবে বাঞ্ছনীয়।

বিচারক বলেন, অভিজিৎ রায় হত্যায় অংশগ্রহণকারী অভিযুক্ত আসামিরা বেঁচে থাকলে আনসার আর ইসলামের বিচারের বাইরে থাকা সদস্যরা একই অপরাধ করতে উৎসাহী হবে এবং বিজ্ঞানমনস্ক ও মুক্তমনা লেখকেরা স্বাধীনভাবে লিখতে এবং মতপ্রকাশ করতে সাহস পাবেন না। কাজেই উক্ত আসামিরা কোনো সহানুভূতি পেতে পারে না।